আলোর গতিকেও হার মানাচ্ছে; ছুটতে পারে অন্ধকারেও
নিজস্ব প্রতিবেদক: মহাবিশ্বে আলোর গতির চেয়ে দ্রুত আর কিছু চলতে পারে না, এমন ধারণাই এতদিন ছিল বিজ্ঞানের সবচেয়ে প্রতিষ্ঠিত সত্যগুলোর একটি। ১৯০৫ সালে আলবার্ট আইনস্টাইন তাঁর বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্বে বলেছিলেন, আলোর গতি হলো প্রকৃতির চূড়ান্ত সীমা। কিন্তু এবার সেই ধারণাকেই নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করলেন একদল গবেষক।
সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা এমন এক রহস্যময় ঘটনার সন্ধান পেয়েছেন, যেখানে ‘অন্ধকার’ আলোর চেয়েও দ্রুতগতিতে ছুটতে দেখা গেছে। শুনতে অবাক লাগলেও এটি কোনো কল্পবিজ্ঞান নয়, বরং বাস্তব বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ।
তবে এখানে রাতের অন্ধকার বোঝানো হয়নি। গবেষকেরা বলছেন, এটি মূলত বিশেষ ধরনের কিছু অন্ধকার বিন্দু বা “ডার্ক স্পট”, যাদের বৈজ্ঞানিক নাম অপটিক্যাল ভর্টেক্স বা ফেজ সিঙ্গুলারিটি।
আলো যখন তরঙ্গ আকারে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সেটি নির্দিষ্ট ছন্দে কম্পিত হতে থাকে। এই তরঙ্গের কিছু অংশে এমন অবস্থা তৈরি হয়, যেখানে আলোর উচ্চ ও নিম্ন তরঙ্গ একে অপরকে বাতিল করে দেয়। ফলে সেখানে তৈরি হয় ক্ষুদ্র অন্ধকার বিন্দু।
বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন, বিশেষ কিছু পরিস্থিতিতে এই অন্ধকার বিন্দুগুলো আলোর তরঙ্গের গতিকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এই প্রশ্নটাই এখন সবার মনে। তবে গবেষকেরা বলছেন, না। কারণ এই অন্ধকার বিন্দুগুলোর কোনো ভর নেই, নেই শক্তি বা তথ্য বহনের ক্ষমতাও। তাই তারা আলোর চেয়ে দ্রুত চললেও প্রকৃতপক্ষে কোনো তথ্য স্থানান্তর করে না।
অর্থাৎ মহাবিশ্বের কার্যকারণ নীতি ভঙ্গ হচ্ছে না, আর বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্বও অক্ষত থাকছে।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার-এ। এটি পরিচালনা করেছেন টেকনিওন–ইসরায়েল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির পদার্থবিজ্ঞানী ইডো কামিনার এবং তাঁর সহকর্মীরা।
ইডো কামিনারের ভাষায়, এই আবিষ্কার শুধু আলোর ক্ষেত্রেই নয়, শব্দতরঙ্গ, তরলের প্রবাহ এমনকি সুপারকন্ডাক্টরের মতো জটিল ব্যবস্থাও বোঝার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।
গবেষকেরা একটি অত্যাধুনিক মাইক্রোস্কোপ প্রযুক্তি ব্যবহার করেন। এর মাধ্যমে তাঁরা হেক্সাগোনাল বোরন নাইট্রাইড নামের একটি বিশেষ দ্বিমাত্রিক পদার্থের মধ্যে অপটিক্যাল ভর্টেক্স পর্যবেক্ষণ করেন।
এই উপাদানটি আলোকে “পোলারিটন” নামের একধরনের কোয়াসিপার্টিকেলে রূপান্তর করতে পারে। এটি আসলে আলো ও পদার্থের এক ধরনের মিশ্র অবস্থা।
মজার বিষয় হলো, এই পোলারিটনগুলো স্বাভাবিক আলোর তুলনায় প্রায় ১০০ গুণ ধীরে চলে। ফলে বিজ্ঞানীরা খুব স্পষ্টভাবে দেখতে পান, কীভাবে বিপরীত চার্জযুক্ত সিঙ্গুলারিটিগুলো ধ্বংস হওয়ার ঠিক আগে হঠাৎ আলোর গতিকেও ছাড়িয়ে যায়।
গবেষকদের মতে, এই নতুন প্রযুক্তি ভবিষ্যতে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও জীববিজ্ঞানের বহু জটিল ও দ্রুতগতির ঘটনা বিশ্লেষণে কাজে লাগতে পারে।
এমনকি প্রকৃতির সবচেয়ে ক্ষুদ্র ও দ্রুত পরিবর্তনশীল মুহূর্তগুলোও হয়তো প্রথমবারের মতো স্পষ্টভাবে দেখা সম্ভব হবে এই প্রযুক্তির মাধ্যমে।
সোহাগ/
