১০ ব্যাংকেই ৪ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ
নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের সংকট দিন দিন আরও গভীর হচ্ছে। মোট ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে মাত্র ১০টি ব্যাংকেই কেন্দ্রীভূত হয়েছে প্রায় ৭২ শতাংশ খেলাপি ঋণ। জুন শেষে এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৫৩১ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। একই সময়ে ব্যাংক খাতের মোট ঋণস্থিতি ছিল ১৮ লাখ ৫০ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই এখন খেলাপি হয়ে পড়েছে।
শীর্ষ ১০ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ
খেলাপি ঋণের পরিমাণের দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। ব্যাংকটির মোট ঋণস্থিতি প্রায় ১ লাখ ৮৯ হাজার ৬৮৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ৯৮ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৫২ দশমিক ১৫ শতাংশ।
দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক। ব্যাংকটির মোট ঋণ প্রায় ১ লাখ ৯০৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়েছে ৭৫ হাজার ৭২৯ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৭৫ শতাংশ।
তৃতীয় অবস্থানে থাকা ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৬০ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা। ব্যাংকটির মোট ঋণের প্রায় ৯৭ শতাংশই খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যাংকটির বড় অংশের ঋণ এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণের সময় বিতরণ করা হয়েছিল। এই ব্যাংকসহ আরও কয়েকটি ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের প্রক্রিয়াও চলছে।
চতুর্থ অবস্থানে থাকা এক্সিম ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৩৮ হাজার ৫২ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৭১ শতাংশ। এরপর রয়েছে অগ্রণী ব্যাংক। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ৩২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৪৪ শতাংশ।
শীর্ষ ১০-এর অন্য ব্যাংকগুলোর মধ্যে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ প্রায় ২৯ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকা, আইএফআইসি ব্যাংকের ২৮ হাজার ৫২০ কোটি, ন্যাশনাল ব্যাংকের ২৮ হাজার ২৭৭ কোটি, ইউনিয়ন ব্যাংকের ২৭ হাজার ১৩৪ কোটি এবং এবি ব্যাংকের ২০ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা।
সব মিলিয়ে এই ১০ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা।
অনিয়ম ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ঋণ
ব্যাংকার ও খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এসব ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বাড়ার পেছনে অতীতে রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর প্রভাবে ঋণ বিতরণ অন্যতম কারণ। বিশেষ করে কয়েকটি ব্যাংক নির্দিষ্ট ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার পর নামে-বেনামে প্রতিষ্ঠান খুলে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
এস আলম, বেক্সিমকো, নাসা, সিকদার, আরামিট, অ্যাননটেক্স, ক্রিসেন্ট লেদার, বিসমিল্লাহ ও হলমার্কসহ বিভিন্ন আলোচিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ঋণের বড় অংশ বর্তমানে খেলাপি হয়ে পড়েছে।
ব্যাংকারদের ভাষ্য, এসব ঋণের অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত বন্ধকি সম্পদ নেই। বড় ঋণগ্রহীতাদের কেউ বিদেশে অবস্থান করছেন, কেউ কারাগারে, আবার কেউ ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছেন। ফলে আদালতের মাধ্যমে ঋণ আদায়ের নির্দেশ পাওয়া গেলেও অর্থ উদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মজিবুর রহমান জানান, ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের প্রায় ৫৬ শতাংশই শীর্ষ পাঁচটি গ্রুপের কাছে রয়েছে। এসব ঋণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকেই কারাগারে রয়েছেন অথবা দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নন-ফান্ডেড ঋণ পরবর্তী সময়ে ফান্ডেড ঋণে পরিণত হওয়ায় পর্যাপ্ত বন্ধকি সম্পদও নেই।
খেলাপি ঋণ আদায়ে মেলা আয়োজন ও টাস্কফোর্স গঠনসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
ইসলামী ব্যাংকে এস আলমের ঋণ বড় চাপ
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের খেলাপি ঋণের বড় অংশ এস আলম গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট বলে ব্যাংকটির তথ্য থেকে জানা গেছে। ব্যাংকটির শীর্ষ ২০ খেলাপি গ্রাহকের বড় অংশই ওই গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৫৭ হাজার কোটি টাকা বলে ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে।
ব্যাংকটির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলতাফ হুসাইন বলেন, খেলাপি ঋণ আদায়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন ছাড় দিয়ে ঋণ নিষ্পত্তির চেষ্টা চলছে এবং এর প্রভাব আগামী প্রান্তিকে দেখা যাবে। এস আলম গ্রুপের খেলাপি ঋণ বাদ দিলে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ২৩ শতাংশের নিচে রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
তবে সামগ্রিক হিসাবে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ নিয়ে ইসলামী ব্যাংকই এখন দেশের সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণের ব্যাংক।
ছাড় দিয়েও কমছে না খেলাপি ঋণ
খেলাপি ঋণ কমাতে গত কয়েক বছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন সুযোগ দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন, এককালীন পরিশোধের সুযোগ, সুদ মওকুফ এবং বিশেষ ব্যবস্থায় ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ।
এমনকি ১০ বছর মেয়াদি বিশেষ পুনঃতফসিল করা ঋণকে নতুন করে দুই বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১৫ বছর মেয়াদে নিয়মিত করার সুযোগও দেওয়া হয়েছে। সমস্যাগ্রস্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান সচল রাখতে বিশেষ প্রণোদনা তহবিলের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
তবে এসব সুবিধার পরও খেলাপি ঋণ কমেনি। বরং চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৪৯ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা। জুন শেষে মোট খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
এতে প্রশ্ন উঠেছে, বারবার পুনঃতফসিল ও নানা ছাড় দেওয়ার পরও খেলাপি ঋণ কমছে না কেন।
শিথিল নীতিতে বাড়তে পারে ঝুঁকি
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, খেলাপি ঋণ চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নিয়ম থেকে সরে গিয়ে শিথিলতা দেখানো হলে ব্যাংক খাতের সংকট আরও গভীর হতে পারে।
তার মতে, অতীতে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়েও খেলাপি ঋণ কমানো যায়নি। বরং একই ঋণগ্রহীতাকে বারবার ছাড় দেওয়ার ফলে ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে নেতিবাচক বার্তা তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, বড় ঋণখেলাপিরা যদি মনে করেন ঋণ পরিশোধ না করলেও ভবিষ্যতে আবার সুযোগ পাওয়া যাবে, তাহলে ঋণ পরিশোধের আগ্রহ আরও কমতে পারে।
কঠোর আদায় ব্যবস্থার তাগিদ
ব্যাংকারদের মতে, শুধু পুনঃতফসিল বা ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ দিয়ে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। প্রকৃত খেলাপি ঋণ চিহ্নিত করে দ্রুত তা আদায়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
অর্থঋণ আদালতে মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি, বন্ধকি সম্পদ দ্রুত বিক্রির কার্যকর ব্যবস্থা এবং খেলাপি ঋণ কিনে নেওয়ার জন্য সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি গঠনসহ বিভিন্ন উদ্যোগ এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।
কারণ খেলাপি ঋণ শুধু ব্যাংকের হিসাবের একটি সংখ্যা নয়। এর সঙ্গে আমানতকারীর অর্থ, ব্যাংকের মূলধন, নতুন বিনিয়োগ, ঋণের সুদহার এবং সামগ্রিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা জড়িত।
৬ লাখ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণের প্রায় ৭২ শতাংশ যখন মাত্র ১০টি ব্যাংকে কেন্দ্রীভূত, তখন বোঝা যায় ব্যাংক খাতের সংকটের বড় অংশ নির্দিষ্ট কিছু ব্যাংকের দুর্বলতা, ঋণ বিতরণে অনিয়ম ও অতীতের নানা সমস্যার সঙ্গে যুক্ত।
এখন মূল প্রশ্ন শুধু খেলাপি ঋণের পরিমাণ কত, তা নয়। ব্যাংক থেকে বেরিয়ে যাওয়া এই বিপুল অর্থের কতটা ফেরত আনা সম্ভব এবং কত দ্রুত তা আদায়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যাবে, সেটিই হয়ে উঠেছে বড় চ্যালেঞ্জ।
সোহাগ/
আপনার জন্য নির্বাচিত নিউজ
- ১৯৮০-এর দশক-এর ছবি বানানোর নতুন AI ট্রেন্ড, যেভাবে করবেন
- ChatGPT-এর ৮০-এর দশকের ছবি ট্রেন্ড, যেভাবে তৈরি করবেন
- নতুন পে স্কেলে সব গ্রেডে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সুখবর
- পে-স্কেলে ৪ ক্যাটাগরিতে বাড়িভাড়া ভাতায় পরিবর্তনের সুপারিশ
- আজকের স্বর্ণের বাজারদর: ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- আজকের সকল দেশের টাকার রেট: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- আজকের স্বর্ণের দাম কমল, ভরি কত টাকা
- এক পদ, এক পেনশন চালু হচ্ছে, পে-স্কেলে বড় পরিবর্তন
- বাংলাদেশের ম্যাচ কবে; ত্রিদেশীয় সিরিজের পূর্ণ সূচি
- নবম পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ নিয়ে সর্বশেষ তথ্য
- একাদশে ভর্তির আবেদন নিয়ে সুখবর, বাড়ল সময়
- ফেসবুকে আশির দশকে ফেরার ট্রেন্ড, মেতেছেন তারকারাও
- মার্চ-জুলাই ৫ মাসে রেকর্ড বিদেশি ঋণ পরিশোধ
- টাকা ছাপতে এক বছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের খরচ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ
- ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার আবহাওয়ার পূর্বাভাসে যা জানাল অধিদপ্তর
