১৫ ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ২ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকা
নিজস্ব প্রতিবেদক: খেলাপি ঋণ, ঋণ জালিয়াতি ও নানা অনিয়মের কারণে দেশের ব্যাংক খাতে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব এখন ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতায়ও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দীর্ঘদিন ধরে বিপুল পরিমাণ ঋণ আদায় না হওয়ায় খেলাপি ঋণ বাড়ছে। একই সঙ্গে এসব ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে গিয়ে চাপে পড়ছে অনেক ব্যাংক।
সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে সরকারি-বেসরকারি ১৫টি ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২৯ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা। ব্যাংক খাতে এত বড় প্রভিশন ঘাটতিকে আর্থিক দুর্বলতার গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
কারণ, খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করতে না পারলে ভবিষ্যতে সম্ভাব্য লোকসান সামাল দেওয়া এবং ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এর ফলে ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।
সরকারি ৫ ব্যাংকে ঘাটতি ৭৮ হাজার কোটি টাকা
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর অবস্থাও উদ্বেগজনক। তথ্য অনুযায়ী, পাঁচটি সরকারি ব্যাংকে সম্মিলিত প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ ৭৮ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘাটতিতে রয়েছে জনতা ব্যাংক। ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি ৫০ হাজার ১৬০ কোটি টাকা।
অন্য সরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে অগ্রণী ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি ১২ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা, রূপালী ব্যাংকের ১০ হাজার ৭৫৩ কোটি এবং বেসিক ব্যাংকের ৫ হাজার ৪৭ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ঘাটতি প্রায় ৩৩ কোটি টাকা।
দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি ঋণ আদায় না হওয়া এবং নতুন করে ঋণের মান খারাপ হয়ে যাওয়ায় এসব ব্যাংকের ওপর প্রভিশন সংরক্ষণের চাপ আরও বাড়ছে।
বেসরকারি ব্যাংকেও বড় ঘাটতি
বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর পরিস্থিতিও স্বস্তিদায়ক নয়। তথ্য অনুযায়ী, ১০টি বেসরকারি ব্যাংকে সম্মিলিত প্রভিশন ঘাটতি দেড় লাখ কোটি টাকার বেশি।
একক ব্যাংক হিসেবে সবচেয়ে বেশি প্রভিশন ঘাটতিতে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। ব্যাংকটির ঘাটতির পরিমাণ ৮২ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা।
এরপর রয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক। ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি ২৩ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা। আইএফআইসি ব্যাংকের ঘাটতি ২১ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা।
এ ছাড়া প্রিমিয়ার ব্যাংকের ১১ হাজার ৯৭১ কোটি, ইউনিয়ন ব্যাংকের ৫ হাজার ৫ কোটি, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ২ হাজার ৫৯৫ কোটি এবং মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ২ হাজার ৯৫ কোটি টাকা প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে।
বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ঘাটতি ৬৪৫ কোটি, এনআরবিসি ব্যাংকের ৮২০ কোটি এবং এনআরবি ব্যাংকের ১৩০ কোটি টাকা।
খেলাপি ঋণই বড় চাপ
অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংক খাতের বর্তমান সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ খেলাপি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশই এখন খেলাপি।
মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। আর ২০২৫ সালের জুনের তুলনায় এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৭৬ হাজার ১২৭ কোটি টাকা।
খেলাপি ঋণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকগুলোকে এসব ঋণের বিপরীতে আরও বেশি প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হচ্ছে। কিন্তু অনেক ব্যাংকের আয় ও মুনাফা সেই চাপ সামাল দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত না হওয়ায় বড় অঙ্কের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
প্রভিশন কেন গুরুত্বপূর্ণ
আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যাংকগুলোকে ঋণের মান অনুযায়ী নির্দিষ্ট হারে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। কোনো ঋণ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেলে সম্ভাব্য লোকসান মোকাবিলার জন্য ব্যাংককে আগে থেকেই নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ আলাদা করে রাখতে হয়।
এতে কোনো ঋণ আদায় না হলেও সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতি সামাল দেওয়ার একটি সুরক্ষা তৈরি হয়। কিন্তু ব্যাংকের প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণে ঘাটতি থাকলে তার প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।
একই সঙ্গে বড় প্রভিশন ঘাটতি থাকলে ব্যাংকের মূলধন ঘাটতিতে পড়ার ঝুঁকিও বাড়তে পারে। এতে নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমার পাশাপাশি ব্যাংকের সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বারবার ছাড় দিয়েও কমছে না খেলাপি ঋণ
ব্যাংক খাতের সংকট নিয়ে অর্থনীতিবিদদের অন্যতম উদ্বেগ হলো খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের বারবার নীতিগত ছাড় দেওয়া। তাদের মতে, পুনঃতফসিলসহ বিভিন্ন সুবিধা অতিরিক্ত দেওয়া হলে সময়মতো ঋণ পরিশোধের প্রবণতা দুর্বল হতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়েও খেলাপি ঋণ কমাতে বিভিন্ন নীতিগত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে জুন শেষে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ায় বোঝা যাচ্ছে, এসব উদ্যোগে এখনো প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়নি।
সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন কার্যকর ব্যবস্থা
বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংক খাতের বর্তমান সংকট মোকাবিলায় শুধু প্রভিশন ঘাটতি পূরণ করলেই হবে না। খেলাপি ঋণের মূল কারণ চিহ্নিত করে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
বড় ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ আদায়, ঋণ বিতরণে অনিয়ম বন্ধ এবং ব্যাংকের ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ কমানোর পাশাপাশি ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় দ্রুত তদন্ত করে অর্থ উদ্ধারের ব্যবস্থাও করতে হবে।
ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ যখন মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশে পৌঁছেছে, তার সঙ্গে ১৫টি ব্যাংকের ২ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকার বেশি প্রভিশন ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, খেলাপি ঋণ আদায়, নতুন করে অনিয়মের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ বন্ধ এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর মূলধন ভিত্তি শক্তিশালী করার দিকে এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। তা না হলে প্রভিশন ঘাটতি ও মূলধন সংকট ভবিষ্যতে আরও গভীর হতে পারে, যার প্রভাব পড়তে পারে ব্যাংক, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ আমানতকারী সবার ওপর।
সোহাগ/
আপনার জন্য নির্বাচিত নিউজ
- ১৯৮০-এর দশক-এর ছবি বানানোর নতুন AI ট্রেন্ড, যেভাবে করবেন
- ChatGPT-এর ৮০-এর দশকের ছবি ট্রেন্ড, যেভাবে তৈরি করবেন
- নতুন পে স্কেলে সব গ্রেডে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সুখবর
- পে-স্কেলে ৪ ক্যাটাগরিতে বাড়িভাড়া ভাতায় পরিবর্তনের সুপারিশ
- আজকের স্বর্ণের বাজারদর: ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- আজকের সকল দেশের টাকার রেট: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- আজকের স্বর্ণের দাম কমল, ভরি কত টাকা
- এক পদ, এক পেনশন চালু হচ্ছে, পে-স্কেলে বড় পরিবর্তন
- নবম পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ নিয়ে সর্বশেষ তথ্য
- বাংলাদেশের ম্যাচ কবে; ত্রিদেশীয় সিরিজের পূর্ণ সূচি
- একাদশে ভর্তির আবেদন নিয়ে সুখবর, বাড়ল সময়
- ফেসবুকে আশির দশকে ফেরার ট্রেন্ড, মেতেছেন তারকারাও
- টাকা ছাপতে এক বছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের খরচ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ
- মার্চ-জুলাই ৫ মাসে রেকর্ড বিদেশি ঋণ পরিশোধ
- ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার আবহাওয়ার পূর্বাভাসে যা জানাল অধিদপ্তর
