নতুন পে স্কেলে যেসব সুবিধা কমছে, বাড়ি ভাড়ায় বড় পরিবর্তন
নিজস্ব প্রতিবেদক: নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো-২০২৬ কার্যকর হলে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। বিশেষ করে বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের ক্ষেত্রে গ্রেডভেদে ভিন্ন হার চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে অপেক্ষাকৃত নিচের গ্রেডে ৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট থাকলেও উচ্চতর গ্রেডে এই হার ধাপে ধাপে কমবে।
অন্যদিকে মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব থাকায় বাড়িভাড়া ভাতার হার মূল বেতনের অনুপাতে কিছুটা কমানো হচ্ছে। তবে মূল বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ায় ভাতার টাকার পরিমাণ আগের তুলনায় বাড়তে পারে।
গত ৩১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে জাতীয় বেতন কাঠামো-২০২৬ এবং সশস্ত্র বাহিনীর বেতন কাঠামো অনুমোদন করা হয়। ওই বৈঠকের কার্যবিবরণী থেকে নতুন কাঠামোর এসব পরিবর্তনের তথ্য জানা গেছে।
বর্তমান বেতন কাঠামোয় সব গ্রেডের সরকারি চাকরিজীবী বার্ষিক ৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট পান। নতুন কাঠামোয় অভিন্ন এই হার বাদ দিয়ে গ্রেড অনুযায়ী আলাদা ইনক্রিমেন্ট নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
কোন গ্রেডে কত ইনক্রিমেন্ট
নতুন কাঠামোয় ২০তম থেকে ৬ষ্ঠ গ্রেড পর্যন্ত কর্মরতদের বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট ৫ শতাংশ রাখার প্রস্তাব রয়েছে। এরপর ৫ম গ্রেডে ৪ শতাংশ, ৪র্থ ও ৩য় গ্রেডে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ২য় গ্রেডে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
সশস্ত্র বাহিনীতেও একই ধরনের কাঠামো প্রস্তাব করা হয়েছে। ক্যাপ্টেন ও সমমর্যাদার পদ এবং এর নিচের পদে ৫ শতাংশ, মেজর পদে ৪ শতাংশ, লেফটেন্যান্ট কর্নেল ও কর্নেল পদে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও সমমর্যাদার পদে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশ বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের প্রস্তাব রয়েছে।
বাতিল হবে বিশেষ প্রণোদনা
২০২৪ সালে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা চালু করা হয়েছিল। শুরুতে এটি মূল বেতনের ৫ শতাংশ এবং পরে ১০ শতাংশ করা হয়। নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হলে এই বিশেষ প্রণোদনা বাতিল করার প্রস্তাব রয়েছে।
বাড়িভাড়া ভাতায় পরিবর্তন
নতুন বেতন কাঠামোয় বাড়িভাড়া ভাতার হারও পরিবর্তন করা হচ্ছে। বর্তমানে ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় গ্রেড অনুযায়ী মূল বেতনের ৫০ থেকে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িভাড়া পাওয়া যায়। নতুন কাঠামোয় তা কমিয়ে ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
ঢাকার বাইরে অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও সাভার এলাকায় বর্তমানে ৪০ থেকে ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িভাড়া পাওয়া যায়। নতুন কাঠামোয় এই হার ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে।
এ ছাড়া সিটি করপোরেশন ও সাভারের বাইরে কর্মরতদের বাড়িভাড়া ভাতা বর্তমানে ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ হলেও নতুন কাঠামোয় তা ২৫ থেকে ৪৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
তবে মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার কারণে ভাতার হার কমলেও প্রকৃত টাকার পরিমাণ অনেক ক্ষেত্রে আগের তুলনায় বেশি হতে পারে।
৮ বছরেই উচ্চতর গ্রেড
বর্তমান ব্যবস্থায় একই গ্রেডে ১০ বছর চাকরি করার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে উচ্চতর গ্রেডে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। নতুন কাঠামোয় এই সময় কমিয়ে ৮ বছর করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
তবে পদোন্নতি ছাড়া দ্বিতীয়বার উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার ক্ষেত্রে একই গ্রেডে ৬ বছর চাকরির শর্ত বহাল থাকবে।
পদোন্নতির সুযোগ রয়েছে এমন পদে কর্মরতরা পদোন্নতি না পেলে চাকরিজীবনে সর্বোচ্চ দুইবার উচ্চতর গ্রেডে যেতে পারবেন। অন্যদিকে যেসব পদে পদোন্নতির কোনো সুযোগ নেই এবং যেগুলো ব্লকড পদ হিসেবে বিবেচিত, সেসব পদে কর্মরতরা চাকরিজীবনে সর্বোচ্চ তিনবার উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
বয়স অনুযায়ী বাড়বে চিকিৎসা ভাতা
নতুন কাঠামোয় চিকিৎসা ভাতাতেও বড় পরিবর্তন আসছে। ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত চাকরিজীবীরা মাসে ৩ হাজার টাকা, ৫০ বছরের বেশি থেকে ৬০ বছর পর্যন্ত ৪ হাজার টাকা, ৬০ থেকে ৭০ বছর পর্যন্ত ৫ হাজার টাকা এবং ৭০ বছরের বেশি বয়সে ৬ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা পাওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
সব সরকারি কর্মচারী পাবেন মোবাইল ভাতা
নতুন পে স্কেলে প্রথমবারের মতো সব গ্রেডের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য মোবাইল ভাতার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বর্তমানে ১ম থেকে ৩য় গ্রেডের কর্মকর্তারা মাসে ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং ৪র্থ ও ৫ম গ্রেডের কর্মকর্তারা ১ হাজার টাকা মোবাইল বিল পান। নতুন কাঠামোয় ১ম থেকে ৫ম গ্রেডে মাসিক মোবাইল ভাতা ৫০০ টাকা এবং ৬ষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেডে ১৫০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে।
বাড়ছে যাতায়াত, টিফিন ও ধোলাই ভাতা
নতুন বেতন কাঠামোয় কয়েকটি ছোট ভাতায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। যাতায়াত ভাতা ৩০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬০০ টাকা, টিফিন ভাতা ২০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা এবং ধোলাই ভাতা ১০০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা করার কথা বলা হয়েছে।
কমছে বাংলা নববর্ষ ভাতা
তবে সব ভাতা বাড়ছে না। বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীরা মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে বাংলা নববর্ষ ভাতা পান। নতুন কাঠামোয় এই হার কমিয়ে ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
পাহাড়ি, হাওর ও চর এলাকায় ভাতা
দুর্গম পার্বত্য এলাকায় কর্মরতদের জন্য মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে পাহাড়ি ভাতা বহাল রাখার প্রস্তাব রয়েছে। পার্বত্য জেলা ও উপজেলা সদরে এর সর্বোচ্চ সীমা ৫ হাজার টাকা এবং সদরের বাইরের এলাকায় ৫ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।
হাওর, দ্বীপ ও চর এলাকায়ও মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে ভাতা বহাল থাকবে। তবে এর সর্বোচ্চ সীমা ৫ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
ঝুঁকি ও বিশেষ ভাতায় বাড়তে পারে ২০ শতাংশ
নতুন কাঠামোয় ঝুঁকি ভাতাসহ বিভিন্ন বিশেষ ভাতা বর্তমান পরিমাণের ওপর ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে প্রেষণ ভাতাও নতুনভাবে মূল বেতনের ১০ শতাংশ হারে নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
তবে শিক্ষা সহায়ক, কার্যভার, আপ্যায়ন, কুক অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যালাউন্স, উৎসব এবং শ্রান্তি-বিনোদন ভাতার বর্তমান হার বহাল রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
সশস্ত্র বাহিনীর ভাতাতেও পরিবর্তন
সশস্ত্র বাহিনীর জন্যও নতুন বেতন কাঠামো প্রস্তাব করা হয়েছে। জাতীয় বেতন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিভিন্ন পদ ও বেতন নির্ধারণের কথা রয়েছে।
বিমান বাহিনীর ফ্লাইং পে ১০০ থেকে ১২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। কমান্ড, স্টাফ, টিচিং, কোয়ালিফিকেশন, ডিস্টার্বেন্স ও বিশেষজ্ঞ বেতন ১০ শতাংশ করে বাড়তে পারে।
এ ছাড়া দক্ষতা, নিযুক্তি, প্যারাসুট, কমান্ডো/স্নাইপার, সোয়াডস/স্কুবা ডাইভিং ও সদাচরণ বেতন ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। প্রতিরক্ষা, কিট, ডেঞ্জার মানি, দোভাষী ও শিক্ষকতা ভাতাসহ বেশির ভাগ ভাতা ১০ শতাংশ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। জরিপ ভাতা বাড়তে পারে ৩০ শতাংশ।
নতুন পে স্কেলে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় কত
অর্থ মন্ত্রণালয় বর্তমানে নতুন বেতন কাঠামোর গেজেট প্রণয়নের কাজ করছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, মূল বেতন তিন ধাপে কার্যকর করা হবে। এরপর ২০২৮ সালের জানুয়ারি থেকে বিভিন্ন ভাতা কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে তিন বছরে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় হবে ১ লাখ ৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। এর মধ্যে চলতি বছরে অতিরিক্ত ব্যয় ৩৭ হাজার ৩৭২ কোটি, ২০২৭ সালে ৪৪ হাজার ৮৩৮ কোটি এবং ২০২৮ সালে ২৩ হাজার ১৭০ কোটি টাকা।
সব ভাতা ও সুবিধা কার্যকর হলে বেতন, ভাতা, পেনশন, আনুতোষিক ও লাম্পগ্রান্ট মিলিয়ে সরকারের মোট ব্যয় ২ লাখ ৩৬ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।
নতুন পে স্কেলের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর মধ্যে রয়েছে গ্রেডভেদে ইনক্রিমেন্ট, উচ্চতর গ্রেড পাওয়ার সময় কমানো, বাড়িভাড়া ভাতার হার পুনর্নির্ধারণ, চিকিৎসা ও মোবাইল ভাতা বাড়ানো এবং বিভিন্ন বিশেষ ভাতায় পরিবর্তন। তবে এসব সুবিধা চূড়ান্তভাবে কার্যকর হবে প্রজ্ঞাপন জারির পর।
সোহাগ/
আপনার জন্য নির্বাচিত নিউজ
- দেশের বাজারে আজ ১৮, ২১ ও ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম
- ২৩ সেপ্টেম্বর কি সরকারি ছুটি; জেনে নিন বিস্তারিত
- ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে টানা ৪ দিনের ছুটি, পাবেন যারা
- ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে টানা ৪ দিনের ছুটি, যারা পাবেন না
- আজকের স্বর্ণের বাজারদর: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- পে-স্কেলের গেজেট নিয়ে নতুন যে জটিলতা
- আজকের সকল দেশের টাকার রেট: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি ২৩ নাকি ২৪ সেপ্টেম্বর
- টানা ৪ দিন সারাদেশে বজ্রসহ বৃষ্টির আভাস
- ১১–১৫ গ্রেডে বাড়িভাড়া নিয়ে নতুন জটিলতার আশঙ্কা
- অনুসন্ধানে কিছু পেলে আমাকে শুধু ১০% দিয়েন
- নতুন অধ্যায়ে আর্জেন্টিনা, স্কালোনির দলে বড় চমক
- টিভিতে আজকের খেলা: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- বিদ্যুৎ নেই, হাসপাতালে মোবাইলের আলোয় চিকিৎসা
- জামানত ছাড়াই ২০ লাখ টাকা, পাবেন যেসব তরুণ
