ছোট মাছেও মিলল মাইক্রোপ্লাস্টিক, সবচেয়ে কম পাওয়া গেল যে মাছে
নিজস্ব প্রতিবেদক: দৈনন্দিন ব্যবহারের নানা পণ্যের পর এবার দেশের ছোট মাছেও মিলেছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি। শুধু মাছের অন্ত্র বা ফুলকাতেই নয়, মানুষের খাদ্য হিসেবে খাওয়া মাংসপেশিতেও এই অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার অস্তিত্ব শনাক্ত করেছেন গবেষকরা। নতুন এই গবেষণা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) গবেষকদের এক গবেষণায় দেশের অন্যতম বৃহৎ প্রাকৃতিক জলাভূমি আড়িয়াল বিলের পাঁচ প্রজাতির দেশীয় ছোট মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। গবেষণায় দেখা যায়, সবচেয়ে কম মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে পুঁটি মাছে। বিপরীতে সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে কই মাছে।
গবেষকদের মতে, বর্তমানে এসব মাছ খাওয়ার ফলে তাৎক্ষণিক স্বাস্থ্যঝুঁকির প্রমাণ না মিললেও দীর্ঘমেয়াদে মানবস্বাস্থ্য, জলজ পরিবেশ এবং খাদ্যনিরাপত্তার ওপর এর প্রভাব নিয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
বাকৃবির মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের পরিচালিত গবেষণাটি সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী Journal of Hazardous Materials Advances-এ প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকদের দাবি, আড়িয়াল বিলের মাছ, পানি ও পলিমাটিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ নিয়ে এটিই দেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক গবেষণা।
গবেষণার জন্য আড়িয়াল বিলের গাদীঘাট, বসুরোলা ডেঙ্গা, সাগর ডেঙ্গা, বড়াইখালী ও আলমপুর এলাকা থেকে ২০২৪ সালের বর্ষা, ২০২৪-২৫ সালের শীত এবং ২০২৫ সালের শুষ্ক মৌসুমে পানি, পলিমাটি ও মাছের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। মোট ১৫০টি মাছের অন্ত্র, ফুলকা ও মাংসপেশি আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষণায় কই, বাটা, মেনি (নানদিনা), গুলশা টেংরা এবং পুঁটি মাছ পরীক্ষা করা হয়। ফলাফলে দেখা যায়, পুঁটি মাছের মাংসপেশিতে সবচেয়ে কম, অর্থাৎ মাত্র শূন্য দশমিক ৫০ থেকে শূন্য দশমিক ৫১টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে কই মাছে সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। এর পর রয়েছে বাটা মাছ, এরপর মেনি এবং গুলশা টেংরা। বর্ষা, শীত ও শুষ্ক মৌসুম মিলিয়ে কই মাছের মাংসপেশিতে গড়ে প্রায় একটি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। পাশাপাশি এর অন্ত্র ও ফুলকাতেও তুলনামূলক বেশি কণা শনাক্ত হয়েছে।
গবেষকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কই মাছ সর্বভুক হওয়ায় তলদেশের পলি, প্ল্যাঙ্কটন এবং অন্যান্য খাদ্যের সঙ্গে থাকা প্লাস্টিক কণাও সহজেই গ্রহণ করে। এছাড়া ৩০০ মাইক্রোমিটারের চেয়ে ছোট কণাগুলো মাছের পরিপাকতন্ত্র অতিক্রম করে মাংসপেশিতে পৌঁছাতে পারে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, বাটা মাছের অন্ত্রে বর্ষা মৌসুমে তুলনামূলক বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেলেও মাংসপেশিতে তিন মৌসুমেই প্রায় একই মাত্রার কণা ছিল। একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে মেনি ও গুলশা টেংরা মাছেও।
গবেষণার প্রধান গবেষক ও বাকৃবির ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান বলেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন পরিবেশের প্রায় সবখানেই ছড়িয়ে পড়েছে। আড়িয়াল বিলের মাছের মাংসপেশিতেও এর উপস্থিতি পাওয়া যাওয়ায় বিষয়টি জনস্বাস্থ্যের দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি জানান, বর্তমানে এসব মাছ খেয়ে সরাসরি ক্ষতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে দীর্ঘদিন ধরে শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক জমতে থাকলে ভবিষ্যতে এর নেতিবাচক প্রভাব দেখা দিতে পারে, যা পরবর্তী প্রজন্মের জন্যও ঝুঁকির কারণ হতে পারে।
গবেষকদের মতে, আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং উৎস থেকেই প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এজন্য নদী ও খালে বর্জ্য শোধন ব্যবস্থা চালু, নিষিদ্ধ প্লাস্টিক জাল ও সুতা ব্যবহার বন্ধ, প্লাস্টিক বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
সোহাগ/
