সুপার এল নিনো এলে বাংলাদেশে কী প্রভাব পড়বে
নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রশান্ত মহাসাগর থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে বাংলাদেশ। অথচ সেখানে সমুদ্রের তাপমাত্রার বড় ধরনের পরিবর্তন হলে তার প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের আবহাওয়া, বৃষ্টিপাত, কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা এমনকি বিদ্যুতের চাহিদাতেও। বর্তমানে সেই কারণেই আলোচনায় এসেছে এল নিনো।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) জানিয়েছে, ২০২৬ সালের এল নিনো ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং আগামী কয়েক মাসে এটি আরও শক্তিশালী হয়ে বছরের শেষ দিকে খুব শক্তিশালী পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত এল নিনো পরিস্থিতি বজায় থাকার সম্ভাবনাও প্রায় ১০০ শতাংশ।
এখন প্রশ্ন হলো, এই শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাব বাংলাদেশে কতটা পড়তে পারে?
এল নিনো কী?
এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগর ও বায়ুমণ্ডলের মধ্যে সংঘটিত একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র। স্বাভাবিক অবস্থায় নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরে বাণিজ্যিক বায়ু পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়। এর ফলে উষ্ণ পানি পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে জমা থাকে।
এল নিনোর সময় এই বায়ুপ্রবাহ দুর্বল হয়ে যায়। তখন পশ্চিমে জমে থাকা উষ্ণ পানি প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের দিকে সরে আসে। ফলে ওই অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যায়।
এল নিনো যখন অত্যন্ত শক্তিশালী হয়, তখন অনেক সময় তাকে ‘সুপার এল নিনো’ বলা হয়। তবে এটি সবসময় একটি আনুষ্ঠানিক বৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিন্যাস নয়; সাধারণভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী এল নিনো বোঝাতেই শব্দটি ব্যবহার করা হয়।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই এল নিনো?
প্রশান্ত মহাসাগরের এই উষ্ণতা শুধু ওই অঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের বায়ুপ্রবাহ, তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যেতে পারে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার সাম্প্রতিক পূর্বাভাস বলছে, খুব শক্তিশালী এল নিনো বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার স্বাভাবিক ধরনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারে। কোথাও বন্যা ও অতিবৃষ্টির ঝুঁকি বাড়তে পারে, আবার কোথাও বাড়তে পারে খরা ও তাপপ্রবাহের ঝুঁকি।
তবে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—এল নিনো যত শক্তিশালী হবে, কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে তার প্রভাবও ঠিক ততটাই বেশি হবে, এমন সরাসরি সম্পর্ক নেই। অঞ্চল, ঋতু এবং একই সময়ে সক্রিয় অন্যান্য জলবায়ু ব্যবস্থার ওপর প্রভাবের মাত্রা নির্ভর করে।
বাংলাদেশে কি বৃষ্টি কমবে?
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও জটিল। দেশের বৃষ্টিপাত শুধু এল নিনোর ওপর নির্ভরশীল নয়। বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগর, মৌসুমি বায়ু এবং অন্যান্য জলবায়ু প্রক্রিয়াও বাংলাদেশের বৃষ্টির ধরন নির্ধারণে ভূমিকা রাখে।
বরং বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি তথ্য নিয়ে করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৮১ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে আটটি এল নিনো ঘটনার সাতটিতেই জুন থেকে সেপ্টেম্বরের মৌসুমি বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি ছিল। গবেষণায় এল নিনো ও বাংলাদেশের মৌসুমি বৃষ্টির মধ্যে সম্পর্ককে দুর্বল ও জটিল হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
অর্থাৎ এল নিনো হলেই বাংলাদেশে বৃষ্টি কমে যাবে বা খরা দেখা দেবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
বরং বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বৃষ্টির সময়, পরিমাণ ও স্থানভেদে বণ্টনের পরিবর্তন।
কৃষি ও পানিতে কী প্রভাব পড়তে পারে?
বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ধরনে পরিবর্তন হলে কৃষিতে এর প্রভাব পড়তে পারে। কোনো সময়ে বৃষ্টি কমে গেলে সেচের প্রয়োজন বাড়তে পারে। এতে কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়ার পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।
আবার কোনো এলাকায় স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বৃষ্টি হলে জলাবদ্ধতা, ফসলের ক্ষতি বা অন্যান্য সমস্যা দেখা দিতে পারে।
তাই বাংলাদেশের জন্য শুধু ‘বৃষ্টি কমবে কি না’—এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং কখন বৃষ্টি হচ্ছে, কতটা হচ্ছে এবং দেশের কোন এলাকায় হচ্ছে—এসব বিষয়ও নজরে রাখা প্রয়োজন।
তাপমাত্রা ও বিদ্যুতের চাহিদায় প্রভাব
শক্তিশালী এল নিনোর অন্যতম বৈশ্বিক প্রভাব হলো তাপমাত্রার পরিবর্তন। WMO-এর সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর পূর্বাভাসে বিশ্বের অনেক স্থলভাগে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে।
তাপমাত্রা বেশি হলে মানুষের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও বৈদ্যুতিক পাখার ব্যবহার বাড়তে পারে। এর ফলে বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়ার সম্ভাবনা থাকে।
একইভাবে অতিরিক্ত গরম ও বৃষ্টির অনিয়ম কৃষি উৎপাদন এবং পানির ব্যবস্থাপনাতেও বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
তাহলে কি বাংলাদেশে বড় ধরনের দুর্যোগ হবে?
শুধু এল নিনোর উপস্থিতির ভিত্তিতে এমন কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না। খুব শক্তিশালী এল নিনো বিশ্বজুড়ে চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে, কিন্তু সব অঞ্চলে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হবে না।
WMO-ও বলছে, এল নিনোর শক্তি একা কোনো নির্দিষ্ট দেশের প্রভাবের মাত্রা নির্ধারণ করে না। ভারত মহাসাগরসহ অন্যান্য মহাসাগরীয় ও বায়ুমণ্ডলীয় পরিস্থিতিও প্রভাবকে পরিবর্তন করতে পারে। ২০২৬ সালের শেষ ভাগে ইতিবাচক ইন্ডিয়ান ওশান ডাইপোল (IOD) পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পূর্বাভাসও রয়েছে, যা বিভিন্ন অঞ্চলে এল নিনোর স্বাভাবিক প্রভাবকে বাড়াতে, কমাতে বা পরিবর্তন করতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য কী প্রস্তুতি জরুরি?
এল নিনোর মতো বড় জলবায়ু ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তবে সম্ভাব্য পরিবর্তনের জন্য আগাম প্রস্তুতি নেওয়া যায়।
কৃষকদের সময়মতো আবহাওয়ার পূর্বাভাস পৌঁছে দেওয়া, ফসল ও সেচ ব্যবস্থাপনায় আগাম পরিকল্পনা করা, পানি সংরক্ষণ এবং ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার দক্ষভাবে পরিচালনা করা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এল নিনোকে শুধু প্রশান্ত মহাসাগরের একটি দূরবর্তী ঘটনা হিসেবে দেখলে হবে না। এর প্রভাব সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়া ব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব কতটা হবে, তা নির্ভর করবে এল নিনোর শক্তি, স্থায়িত্ব, মৌসুম এবং বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরের অন্যান্য জলবায়ু পরিস্থিতির ওপর।
তাই আতঙ্কের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিয়মিত আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও জলবায়ু পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকির জন্য আগাম প্রস্তুতি নেওয়া।
সোহাগ/
আপনার জন্য নির্বাচিত নিউজ
- আজকের সোনার দাম: ১৮, ২১ ও ২২ ক্যারেটের দর
- দুর্গাপূজায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টানা ১৬ দিনের ছুটি!
- নবম পে স্কেলের গেজেট নিয়ে বড় অগ্রগতি
- ১৭ সেপ্টেম্বরের আপডেট: নবম পে-স্কেলের গেজেট ভেটিংয়ে
- নবম পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন ভেটিংয়ে, আজই গেজেট প্রকাশের সম্ভাবনা
- আজকের স্বর্ণের বাজারদর: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- আজকের সকল দেশের টাকার রেট: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- পে-স্কেলের গেজেট এখনো হয়নি, ১১ সুবিধায় পরিবর্তনের তথ্য
- দেশের কোথাও কোথাও ভারী বৃষ্টির আভাস, জানাল আবহাওয়া অফিস
- একাদশ শ্রেণির ক্লাস শুরুর তারিখ পরিবর্তন, নতুন দিন ঘোষণা
- সিগারেটের প্যাকেটে নতুন নিয়ম
- হাসিনার ফেরা নিয়ে অডিও ভাইরাল, যা বললেন ওসি
- বিচার প্রশাসনে বড় রদবদল, ৯৯ বিচারক বদলি
- Galaxy A08-এ বড় ব্যাটারি, পারফরম্যান্সে বড় পরিবর্তন
- ব্যালন ডি’অর ২০২৬: বিশ্বকাপের পর বদলে গেছে হিসাব
