হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের আগে ৯৯ শতাংশ মানুষের মধ্যে থাকে যে ৪ ঝুঁকি
নিজস্ব প্রতিবেদক: হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোককে অনেক সময় আকস্মিক ঘটনা মনে হলেও এর পেছনে দীর্ঘদিনের কিছু স্বাস্থ্যঝুঁকি কাজ করে। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, হৃদরোগ ও স্ট্রোকের মতো গুরুতর ঘটনার শিকার হওয়া প্রায় ৯৯ শতাংশ মানুষের মধ্যেই আগে থেকে অন্তত একটি পরিচিত ঝুঁকি উপস্থিত ছিল।
দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৯০ লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা এ তথ্য পেয়েছেন। গবেষণায় মূলত চারটি ঝুঁকির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেগুলো হলো উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে কোলেস্টেরলের উচ্চ মাত্রা, রক্তে শর্করার উচ্চ মাত্রা এবং ধূমপান।
গবেষণার ফল বলছে, এসব ঝুঁকির অন্তত একটি আগে থেকেই থাকলে ভবিষ্যতে হৃদরোগ বা স্ট্রোকের আশঙ্কা বাড়তে পারে। তাই বড় কোনো শারীরিক সমস্যার অপেক্ষা না করে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও ঝুঁকিগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।
হৃদরোগ ও স্ট্রোকের সঙ্গে সম্পর্কিত ৪টি ঝুঁকি
গবেষণায় যেসব ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে, সেগুলো হলো:
১. উচ্চ রক্তচাপ: দীর্ঘদিন রক্তচাপ বেশি থাকলে হৃদযন্ত্র ও রক্তনালির ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। এটি হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক ও হার্ট ফেইলিওরের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
২. রক্তে কোলেস্টেরলের উচ্চ মাত্রা: বিশেষ করে ক্ষতিকর এলডিএল কোলেস্টেরল বেশি হলে ধমনিতে চর্বিজাতীয় পদার্থ জমতে পারে। এতে রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
৩. রক্তে শর্করার উচ্চ মাত্রা: দীর্ঘদিন রক্তে শর্করা বেশি থাকলে রক্তনালি ও হৃদযন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ডায়াবেটিস এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির একটি।
৪. ধূমপান: ধূমপান রক্তনালির ক্ষতি করে এবং রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা বাড়াতে পারে। ফলে হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে উচ্চ রক্তচাপে
গবেষণায় উচ্চ রক্তচাপকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকিগুলোর একটি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়া, উভয় দেশের তথ্যেই দেখা গেছে, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক বা হার্ট ফেইলিওরের শিকার হওয়া ৯৩ শতাংশের বেশি মানুষের আগে থেকেই উচ্চ রক্তচাপ ছিল।
এ কারণে চিকিৎসকেরা রক্তচাপ নিয়মিত মাপার ওপর গুরুত্ব দেন। অনেকের ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপের তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। ফলে নিজেকে সুস্থ মনে হলেও শরীরে ঝুঁকি থেকে যেতে পারে।
কম বয়সী নারীদের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি রয়েছে
গবেষণার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ৬০ বছরের কম বয়সী নারীদের মধ্যেও হৃদরোগ ও স্ট্রোকের আগে এই চারটি ঝুঁকির অন্তত একটি থাকার হার ৯৫ শতাংশের বেশি পাওয়া গেছে।
সাধারণভাবে কম বয়সী নারীদের হৃদরোগের ঝুঁকি তুলনামূলক কম বলে মনে করা হলেও এই ফলাফল নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও সচেতনতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
হঠাৎ হৃদরোগের ঘটনা কি সত্যিই ঝুঁকি ছাড়াই ঘটে?
সাম্প্রতিক সময়ে কোনো পরিচিত ঝুঁকি ছাড়াই হৃদরোগের ঘটনা ঘটছে বলে যে আলোচনা রয়েছে, নতুন গবেষণাটি সেই ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
গবেষকদের মতে, আগের কিছু গবেষণায় ঝুঁকির বিষয়গুলো যথাযথভাবে শনাক্ত না-ও হতে পারে। আবার কোনো ঝুঁকি চিকিৎসাগতভাবে রোগ নির্ণয়ের নির্দিষ্ট মাত্রায় না পৌঁছালে সেটি হিসাবের বাইরে থেকে যেতে পারে। ফলে হৃদরোগের ঘটনার আগে থাকা ঝুঁকিগুলো সব সময় স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে না।
যুক্তরাষ্ট্রের নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ফিলিপ গ্রিনল্যান্ড এক সম্পাদকীয়তে বলেছেন, হৃদরোগের বড় ঘটনার আগে প্রায় সব ক্ষেত্রেই এক বা একাধিক ঝুঁকি উপস্থিত থাকে। তাই চিকিৎসা করা সম্ভব এমন ঝুঁকিগুলো নিয়ন্ত্রণে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে কী করবেন?
উচ্চ রক্তচাপ, কোলেস্টেরল, রক্তে শর্করা ও ধূমপান, এই চারটি বিষয় নিয়ন্ত্রণে রাখা হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য কিছু অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে:
নিয়মিত রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরল পরীক্ষা করুন।
ধূমপান ও তামাকজাতীয় পণ্য ব্যবহার বন্ধ করুন।
অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার কম খান।
নিয়মিত হাঁটুন বা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী শরীরচর্চা করুন।
ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন এবং পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন।
উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা কোলেস্টেরলের সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা চালিয়ে যান।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে Journal of the American College of Cardiology সাময়িকীতে। গবেষণার মূল বার্তা হলো, হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে আগে থেকেই পরিচিত ও নিয়ন্ত্রণযোগ্য স্বাস্থ্যঝুঁকিগুলোর দিকে নজর দেওয়া জরুরি। তবে কোনো একটি ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখলেই হৃদরোগের আশঙ্কা পুরোপুরি দূর হয়ে যায় না।
সিদ্দিকা/
