ভাই-বোনের মধ্যে জমি ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধ হলে কী করবেন
নিজস্ব প্রতিবেদক: বাবা-মা বা পরিবারের কোনো সদস্য মারা যাওয়ার পর তাঁদের রেখে যাওয়া জমি ভাই-বোনের মধ্যে ভাগাভাগি নিয়ে অনেক পরিবারে বিরোধ তৈরি হয়। কেউ জমির বেশি অংশ দাবি করেন, কেউ আবার নিজের প্রাপ্য অংশ বুঝে পান না। কখনো জমির দখল, দলিল কিংবা নামজারি নিয়েও দেখা দেয় জটিলতা। এ ধরনের পরিস্থিতিতে কীভাবে নিজের আইনগত অধিকার বুঝে নেবেন, কোথায় অভিযোগ করবেন এবং সমঝোতা না হলে কীভাবে জমি ভাগ করবেন, তা জানা জরুরি।
বাংলাদেশে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমি ভাগ করার ক্ষেত্রে প্রথমে প্রত্যেক ওয়ারিশের আইনগত অংশ নির্ধারণ করতে হয়। এরপর পারিবারিক সমঝোতার মাধ্যমে জমি ভাগ করা সম্ভব। সমঝোতা না হলে দেওয়ানি আদালতের মাধ্যমে বাটোয়ারা মামলা করার সুযোগ রয়েছে।
প্রথমে জেনে নিন, কে কতটুকু জমির মালিক
জমি ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধ হলে প্রথম কাজ হলো প্রত্যেক উত্তরাধিকারীর আইনগত অংশ নির্ধারণ করা। এ ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির প্রযোজ্য ব্যক্তিগত উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী অংশ হিসাব করতে হবে।
মুসলিম, হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের উত্তরাধিকারসংক্রান্ত বিধান এক নয়। এমনকি মুসলিম উত্তরাধিকার আইনেও মৃত ব্যক্তির স্ত্রী বা স্বামী, সন্তান, বাবা-মা এবং অন্য উত্তরাধিকারী জীবিত আছেন কি না, তার ওপর অংশের পরিমাণ নির্ভর করতে পারে।
তাই ভাই-বোনের মধ্যে জমি সব সময় সমান ভাগ হবে, এমন ধারণা সঠিক নয়। আবার শুধু ছেলে সন্তান বলে কেউ পুরো জমির মালিক হয়ে যাবেন, এমনটিও নয়।
সঠিক হিস্যা নির্ধারণের জন্য মৃত ব্যক্তির সব বৈধ উত্তরাধিকারীর তালিকা তৈরি করে প্রয়োজনে অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত।
জমি ভাগ করার আগে যেসব কাগজপত্র সংগ্রহ করবেন
জমি নিয়ে বিরোধ শুরু হলে আবেগের পরিবর্তে কাগজপত্রের ভিত্তিতে নিজের অধিকার যাচাই করা প্রয়োজন। এ জন্য সাধারণত নিচের নথিগুলো সংগ্রহ করতে পারেন—
১. মৃত ব্যক্তির মূল বা পূর্ববর্তী জমির দলিল এবং বায়া দলিল।
২. সংশ্লিষ্ট জমির সিএস, এসএ, আরএস, বিএস বা সর্বশেষ খতিয়ানের কপি।
৩. জমির মৌজা, দাগ নম্বর ও পরিমাণের তথ্য।
৪. মৃত ব্যক্তির মৃত্যু সনদ।
৫. সব উত্তরাধিকারীর নাম ও সম্পর্ক উল্লেখ করা ওয়ারিশ সনদ।
৬. জমির হালনাগাদ ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা।
৭. আগে কোনো নামজারি হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট নামজারি খতিয়ান ও আদেশের কপি।
৮. জমি নিয়ে মামলা বা বিরোধ থাকলে সংশ্লিষ্ট আদালতের আদেশ ও মামলার কাগজপত্র।
এসব নথি যাচাই করলে মৃত ব্যক্তির প্রকৃত মালিকানা, জমির পরিমাণ এবং প্রত্যেক উত্তরাধিকারীর প্রাপ্য অংশ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়।
পারিবারিক আলোচনার মাধ্যমে জমি ভাগ করার চেষ্টা করুন
ভাই-বোনের মধ্যে জমি ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধ হলে প্রথমে পারিবারিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা ভালো।
এ ক্ষেত্রে পরিবারের সব উত্তরাধিকারীকে নিয়ে বসে কার কতটুকু জমি পাওয়ার কথা, কে কোন অংশে জমি নিতে চান এবং জমির অবস্থান কী হবে, তা আলোচনা করা যেতে পারে।
সমঝোতা হলে কয়েকটি বিষয় লিখিতভাবে নির্ধারণ করা জরুরি—
-
প্রত্যেক উত্তরাধিকারীর জমির পরিমাণ।
-
কে কোন দাগের বা দাগের কোন অংশের জমি পাবেন।
-
জমির সীমানা ও চলাচলের রাস্তার ব্যবস্থা।
-
পুকুর, বাড়ি, গাছপালা বা অন্য স্থাপনার বণ্টন।
-
প্রত্যেকের দখল বুঝিয়ে দেওয়ার বিষয়।
শুধু মৌখিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর না করে আইন অনুযায়ী লিখিত ও নিবন্ধিত বণ্টননামা তৈরি করা নিরাপদ।
সমঝোতা হলে বণ্টননামা দলিল করবেন যেভাবে
ভাই-বোনসহ সব সংশ্লিষ্ট ওয়ারিশ নিজেদের মধ্যে জমি ভাগ করতে রাজি হলে নিবন্ধিত বণ্টননামা দলিল করা যায়।
রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ১৪৩(খ) ধারায় উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া স্থাবর সম্পত্তি নিজেদের মধ্যে আপসে ভাগ করার পর বণ্টন দলিল প্রস্তুত, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর স্বাক্ষর এবং নিবন্ধনের বিধান রয়েছে।
এ ক্ষেত্রে জমির পরিমাণ, দাগ নম্বর, সীমানা এবং প্রত্যেকের প্রাপ্য অংশ দলিলে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন। দলিল প্রস্তুত ও নিবন্ধনের আগে সংশ্লিষ্ট জমির কাগজপত্র আইনজীবী বা অভিজ্ঞ দলিল লেখকের মাধ্যমে যাচাই করে নেওয়া ভালো।
কেউ জমি ভাগ করতে রাজি না হলে কী করবেন?
ভাই বা বোনদের কেউ জমি ভাগ করতে রাজি না হলে কিংবা নিজের প্রাপ্য অংশ বুঝিয়ে দিতে অস্বীকার করলে অন্য ওয়ারিশরা আইনি ব্যবস্থা নিতে পারেন।
এ ক্ষেত্রে দেওয়ানি আদালতে বাটোয়ারা মামলা বা পার্টিশন স্যুট করার সুযোগ রয়েছে।
বাটোয়ারা মামলায় আদালতের কাছে আবেদন করে নিজের আইনগত অংশ অনুযায়ী জমি পৃথকভাবে বুঝে নেওয়ার প্রতিকার চাওয়া যায়।
এ ধরনের মামলা করার আগে সাধারণত যেসব বিষয় প্রস্তুত রাখা প্রয়োজন—
১. মৃত ব্যক্তির মালিকানার দলিল ও খতিয়ান।
২. ওয়ারিশ সনদ ও মৃত্যু সনদ।
৩. সব উত্তরাধিকারীর নাম ও ঠিকানা।
৪. জমির দাগ, খতিয়ান, মৌজা ও পরিমাণের বিবরণ।
৫. নিজের প্রাপ্য অংশের হিসাব।
৬. জমি ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধের প্রাসঙ্গিক প্রমাণ।
মামলায় সংশ্লিষ্ট সব সহশরিককে পক্ষভুক্ত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। আদালত কাগজপত্র, মালিকানা ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য যাচাই করে আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত দেবেন।
মামলার ধরন ও পরিস্থিতি অনুযায়ী আদালতের প্রাথমিক ডিক্রি, জমির পরিমাপ এবং চূড়ান্ত বাটোয়ারার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে পারে। তাই মামলা করার আগে জমি-সংক্রান্ত অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত।
জমি ভাগ না হলেও কি যৌথ নামজারি করা যাবে?
হ্যাঁ। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমি ভাই-বোনের মধ্যে এখনো ভাগ না হলেও সব ওয়ারিশের নামে যৌথ নামজারি করা যায়।
ভূমি মন্ত্রণালয় ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখে এ বিষয়ে একটি স্পষ্টীকরণ জারি করে। এতে বলা হয়, মৃত ব্যক্তির সব ওয়ারিশের নাম এবং প্রত্যেকের প্রাপ্য হিস্যা উল্লেখ করে যৌথ নামজারির আবেদন করা যাবে। এ ক্ষেত্রে বণ্টননামা দলিল বাধ্যতামূলক নয়।
তবে ভাই-বোনেরা যদি জমি আলাদা আলাদাভাবে ভাগ করে পৃথক খতিয়ান করতে চান, তাহলে নিজেদের মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে নিবন্ধিত বণ্টননামা দলিল করতে হবে। এরপর সেই দলিলের ভিত্তিতে পৃথক নামজারির আবেদন করা যাবে।
অর্থাৎ, যৌথ নামজারি এবং জমি ভাগ করে পৃথক নামজারি এক বিষয় নয়।
কোনো ভাই বা বোন জোর করে জমি দখল করলে কী করবেন?
কোনো সহশরিক যদি অন্যদের সম্মতি ছাড়া উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির পুরোটা নিজের দখলে রাখেন, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে প্রথমে জমির মালিকানা ও নিজের অংশের কাগজপত্র সংগ্রহ করতে হবে। এরপর আইনজীবীর মাধ্যমে আইনি নোটিশ পাঠানো বা উপযুক্ত দেওয়ানি প্রতিকার চাওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
জমিতে জোরপূর্বক প্রবেশ, হুমকি, মারধর বা সহিংসতার আশঙ্কা থাকলে নিরাপত্তার জন্য পুলিশের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। তবে জমির মালিকানা বা চূড়ান্ত বণ্টনের বিরোধ সাধারণত দেওয়ানি আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে হয়।
নিজে জোর করে জমি দখল করা, সীমানা ভাঙা কিংবা অন্যের স্থাপনা সরিয়ে ফেলার মতো পদক্ষেপ নেওয়া উচিত নয়। এতে নতুন আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।
জমি ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধ এড়াতে যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকবেন
ভাই-বোনের মধ্যে জমি ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধ এড়াতে কয়েকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—
-
সব উত্তরাধিকারীর নাম ও আইনগত অংশ নিশ্চিত করুন।
-
জমির মূল দলিল ও খতিয়ান যাচাই করুন।
-
মৌখিক বণ্টনের পরিবর্তে নিবন্ধিত বণ্টননামা করুন।
-
জমির সীমানা ও দখল বুঝিয়ে দেওয়ার বিষয়টি লিখিতভাবে রাখুন।
-
কোনো ওয়ারিশের সম্মতি ছাড়া তাঁর অধিকার ক্ষুণ্ন হয়, এমন দলিল তৈরি করবেন না।
-
জমি নিয়ে মামলা চললে আদালতের আদেশ ও নিষেধাজ্ঞা মেনে চলুন।
ভাই-বোনের মধ্যে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমি ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধ হলে প্রথমে প্রত্যেকের আইনগত অংশ নির্ধারণ করতে হবে। এরপর পারিবারিক সমঝোতার মাধ্যমে নিবন্ধিত বণ্টননামা তৈরি করে জমি ভাগ করা যেতে পারে।
কেউ সমঝোতায় রাজি না হলে দেওয়ানি আদালতে বাটোয়ারা মামলা করার সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, জমি এখনো ভাগ না হলেও সব ওয়ারিশের নামে যৌথ নামজারি করা সম্ভব। তাই নিজের প্রাপ্য অংশ বুঝে নিতে জমির কাগজপত্র যাচাই, আইনগত হিস্যা নির্ধারণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক আইনি পদক্ষেপ নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সোহাগ/
