৪০০ রানের ক্লাবে বাংলাদেশ নেই!
নিজস্ব প্রতিবেদক: আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ক্রিকেটে এখন ৪০০ রান করাও আর অসম্ভব কিছু নয়। শুধু বড় সংগ্রহ গড়া নয়, ৪০০ পেরোনো লক্ষ্য তাড়া করে জেতার ঘটনাও বাড়ছে। এর সর্বশেষ উদাহরণ শ্রীলঙ্কা। ২২ অক্টোবর রাওয়ালপিন্ডিতে ইংল্যান্ডের করা ৪২৯ রান তাড়া করে অবিশ্বাস্য জয় পেয়েছে দলটি। অথচ ওয়ানডেতে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহ এখনো ৩৫০ রানের নিচে। ৪০০ রানের এই বদলে যাওয়া ক্রিকেটে বাংলাদেশ তাই কোথায়, সেই প্রশ্ন আবারও সামনে এসেছে।
ওয়ানডেতে ৪০০ রানের ইতিহাস
১৯৯৬ বিশ্বকাপে রাওয়ালপিন্ডিতে কেনিয়ার বিপক্ষে ৫ উইকেটে ৩৯৮ রান করেছিল শ্রীলঙ্কা। তখন দলীয় ৪০০ রানের কাছাকাছি পৌঁছানোই ছিল বড় ঘটনা। একই বিশ্বকাপে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে ১৮৮ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার গ্যারি কারস্টেন।
এরপর সময়ের সঙ্গে বদলেছে ওয়ানডে ক্রিকেটের ধরন। ব্যাটিংয়ের আগ্রাসী মানসিকতা, দ্রুত রান তোলার কৌশল এবং সীমিত ওভারের ক্রিকেটে পরিবর্তনের কারণে বড় সংগ্রহ এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি দেখা যায়।
মূল প্রতিবেদনে দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক ওয়ানডেতে দলীয় ৪০০ বা তার বেশি রানের ইনিংস হয়েছে মোট ৩৫ বার। এই তালিকায় সবচেয়ে এগিয়ে ভারত, সর্বোচ্চ ৯ বার ৪০০ রান করেছে দলটি। ইংল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকা করেছে ৮ বার করে। শ্রীলঙ্কা ও অস্ট্রেলিয়া তিনবার করে, নিউজিল্যান্ড দুবার এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও জিম্বাবুয়ে একবার করে এই মাইলফলক ছুঁয়েছে।
অন্যদিকে, টেস্ট মর্যাদাপ্রাপ্ত ১২টি দলের মধ্যে বাংলাদেশ ছাড়াও পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও আয়ারল্যান্ডের আন্তর্জাতিক ওয়ানডেতে দলীয় ৪০০ রানের ইনিংস নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের ওয়ানডে সর্বোচ্চ সংগ্রহ কত?
বাংলাদেশ এখনো আন্তর্জাতিক ওয়ানডেতে ৪০০ রান করতে পারেনি। এমনকি ৩৫০ রানের গণ্ডিও পেরোতে পারেনি দলটি।
আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ২০২৩ সালে সিলেটে ৬ উইকেটে ৩৪৯ রান করেছিল বাংলাদেশ। এটিই ওয়ানডেতে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহ। ফলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বড় স্কোরের নতুন মানদণ্ড তৈরি হলেও বাংলাদেশের সামনে এখনো ৩৫০ রান পেরোনো এবং পরে ৪০০ রানের মাইলফলক ছোঁয়ার চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক ওয়ানডেতে এমন সংগ্রহ না থাকলেও বাংলাদেশের ঘরোয়া লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে ৪০০ রানের বেশি করার নজির রয়েছে।
ঘরোয়া ক্রিকেটে ৪০০ পেরিয়েছে বাংলাদেশ
ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে ২০২৬ সালের জুনে আবাহনীর বিপক্ষে ৪ উইকেটে ৪০৬ রান করেছিল মোহামেডান। এর আগে ২০২৫ সালের ৯ মার্চ একই প্রতিযোগিতায় ব্রাদার্স ইউনিয়নের বিপক্ষে ৮ উইকেটে ৪২২ রান তুলেছিল প্রাইম ব্যাংক।
ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচগুলো লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটের স্বীকৃত হওয়ায় এসব সংগ্রহ বাংলাদেশের ঘরোয়া একদিনের ক্রিকেটে ৪০০ রানের সক্ষমতার প্রমাণ দেয়।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের জুলাইয়ে চট্টগ্রামে একটি প্রস্তুতি ম্যাচে টাইগার্সের বিপক্ষে ৫ উইকেটে ৪০৩ রান করেছিল বাংলাদেশ হাই পারফরম্যান্স (এইচপি) দল। তবে প্রস্তুতি ম্যাচের এই সংগ্রহকে আন্তর্জাতিক ওয়ানডের রেকর্ডের সঙ্গে এক করে দেখা যাবে না।
৪০০ রান তাড়া করে জেতার ঘটনাও বাড়ছে
একসময় ওয়ানডেতে ৪০০ রান তাড়া করে জেতাকে প্রায় অবিশ্বাস্য মনে করা হতো। ২০০৬ সালে জোহানেসবার্গে অস্ট্রেলিয়ার ৪৩৪ রান তাড়া করে দক্ষিণ আফ্রিকার জয় ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় ম্যাচ হয়ে আছে। ওয়ানডেতে সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জয়ের রেকর্ড এখনো সেই ম্যাচের দখলে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে বড় লক্ষ্য তাড়া করে জয়ের ঘটনা আবারও আলোচনায় এসেছে। ২২ অক্টোবর ২০২৬ রাওয়ালপিন্ডিতে ইংল্যান্ডের ৪২৯ রান পেরিয়ে জয় পেয়েছে শ্রীলঙ্কা। এই ফলাফল আন্তর্জাতিক ওয়ানডেতে রান তাড়া করে জয়ের ইতিহাসে অন্যতম বড় অর্জন।
ঘরোয়া লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটেও এমন নজির রয়েছে। ভারতের বিজয় হাজারে ট্রফিতে ২০২৫ সালের ২৪ ডিসেম্বর ঝাড়খন্ডের ৪১২ রান তাড়া করে জিতেছিল কর্ণাটক। আর আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে গত জুলাইয়ে ইন্টার-প্রভিন্সিয়াল লিমিটেড ওভার কাপের ম্যাচে নর্দার্ন নাইটসের ৪১৪ রান পেরিয়ে জয় পেয়েছিল লেনস্টার লাইটনিং।
মূল প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে ৪০০ বা তার বেশি রান তাড়া করে জয়ের পাঁচটি ঘটনার মধ্যে চারটি ঘটেছে ওই সময় থেকে। এর মধ্যে দুটি আন্তর্জাতিক ওয়ানডে এবং দুটি ঘরোয়া লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে।
লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে ৫০০ রানও হয়েছে
শুধু ৪০০ নয়, লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে ৫০০ রানের সীমাও পেরিয়েছে দলগুলো। ভারতের বিজয় হাজারে ট্রফিতে ২০২২ সালে অরুণাচল প্রদেশের বিপক্ষে ২ উইকেটে ৫০৬ রান করেছিল তামিলনাড়ু।
এরপর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে একই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ৬ উইকেটে ৫৭৪ রান তোলে বিহার। লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে এটি অবিশ্বাস্য বড় সংগ্রহগুলোর একটি।
আন্তর্জাতিক ওয়ানডেতে সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহের রেকর্ড ইংল্যান্ডের। ২০২২ সালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ৪ উইকেটে ৪৯৮ রান করেছিল দলটি।
বাংলাদেশের সামনে কী চ্যালেঞ্জ?
আন্তর্জাতিক ওয়ানডেতে ৪০০ রান করতে হলে শুধু ব্যাটিংয়ের গভীরতা থাকলেই হবে না। শুরুতে দ্রুত রান তোলা, মাঝের ওভারে উইকেট ধরে রাখা এবং শেষ দিকে বড় শট খেলার সক্ষমতা একসঙ্গে কাজে লাগাতে হবে। পাশাপাশি প্রতিপক্ষের বোলিং, উইকেটের ধরন ও ম্যাচের পরিস্থিতিও বড় ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে ৪০০ রানের বেশি করার নজির থাকলেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সেই সাফল্য এখনো আসেনি। তাই প্রশ্নটি শুধু ৪০০ রান করার নয়, বরং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পরিবর্তিত ব্যাটিং মানদণ্ডের সঙ্গে বাংলাদেশ কতটা তাল মেলাতে পারছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
ওয়ানডেতে বাংলাদেশের পরবর্তী বড় লক্ষ্য হতে পারে প্রথমে ৩৫০ রানের সীমা পেরোনো, এরপর ৪০০ রানের মাইলফলক ছোঁয়া। সাম্প্রতিক ক্রিকেটে বড় সংগ্রহ ও বড় রান তাড়া করে জয়ের প্রবণতা সেই চ্যালেঞ্জকে আরও প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে।
আয়শা/
