ওয়ারিশের জমি ভাগ করার আগে যে ১০টি বিষয় জানা জরুরি
নিজস্ব প্রতিবেদক: বাবা, মা বা পরিবারের কোনো সদস্য মারা যাওয়ার পর তাঁর রেখে যাওয়া জমি ওয়ারিশদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার প্রয়োজন হয়। কিন্তু উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমি ভাগ করার ক্ষেত্রে শুধু কে কতটুকু জমি পাবেন, তা নির্ধারণ করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। জমির প্রকৃত মালিকানা, সব বৈধ ওয়ারিশের পরিচয়, প্রত্যেকের প্রাপ্য অংশ, বণ্টননামা নিবন্ধন এবং নামজারির বিষয়গুলোও ঠিকভাবে সম্পন্ন করা জরুরি।
এসব বিষয়ে শুরুতেই সতর্ক না হলে ভবিষ্যতে জমির দখল, সীমানা, মালিকানা কিংবা নামজারি নিয়ে বিরোধ তৈরি হতে পারে। তাই ওয়ারিশ সূত্রে পাওয়া জমি ভাগ করার আগে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জেনে রাখা প্রয়োজন।
১. প্রথমেই সব বৈধ ওয়ারিশের পরিচয় নিশ্চিত করুন
জমি ভাগ করার আগে মৃত ব্যক্তির সব বৈধ ওয়ারিশ কারা, তা নির্ধারণ করতে হবে। শুধু ছেলে-মেয়েদের তালিকা তৈরি করলেই হবে না। মৃত ব্যক্তির স্বামী বা স্ত্রী, বাবা-মা এবং প্রযোজ্য উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী অন্য কোনো ওয়ারিশ থাকলে তাঁদেরও হিসাবের মধ্যে আনতে হবে।
বাংলাদেশে উত্তরাধিকারসূত্রে সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে ব্যক্তির ধর্ম ও প্রযোজ্য ব্যক্তিগত আইন অনুযায়ী অংশ নির্ধারিত হয়। তাই সবার অংশ সমান হবে, এমন ধারণা ঠিক নয়।
এ জন্য সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশন থেকে ওয়ারিশ সনদ সংগ্রহ করতে হবে। তবে শুধু ওয়ারিশ সনদ থাকলেই উত্তরাধিকারীর অংশের হিসাব চূড়ান্ত হয়ে যায় না। প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী প্রত্যেকের প্রাপ্য অংশ নিশ্চিত করতে হবে।
২. মৃত ব্যক্তির জমির প্রকৃত পরিমাণ ও মালিকানা যাচাই করুন
ওয়ারিশদের মধ্যে জমি ভাগ করার আগে মৃত ব্যক্তির নামে ঠিক কতটুকু জমি ছিল, তা যাচাই করা জরুরি। অনেক সময় পারিবারিকভাবে জমির পরিমাণ এক রকম জানা থাকলেও দলিল, খতিয়ান বা জরিপের রেকর্ডে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়।
এ জন্য সংগ্রহ ও যাচাই করুন:
-
মূল বা পূর্ববর্তী মালিকানার দলিল এবং প্রয়োজনে বায়া দলিল
-
সর্বশেষ খতিয়ান বা পর্চা
-
মৌজা ও দাগ নম্বর
-
জমির পরিমাণ ও শ্রেণি
-
ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের তথ্য
-
জমি নিয়ে কোনো মামলা, বন্ধক বা বিরোধ রয়েছে কি না
মনে রাখতে হবে, শুধু খতিয়ানে মৃত ব্যক্তির নাম থাকলেই জমির সব মালিকানা-সংক্রান্ত বিষয় নিশ্চিত হয়ে যায় না। দলিল, রেকর্ড, উত্তরাধিকার এবং বাস্তব দখলের তথ্য মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
৩. কে কতটুকু জমি পাবেন, তা আইন অনুযায়ী হিসাব করুন
ওয়ারিশদের মধ্যে জমি ভাগ করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো প্রত্যেকের প্রাপ্য অংশ নির্ধারণ। এ ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির ধর্ম অনুযায়ী প্রযোজ্য উত্তরাধিকার আইন অনুসরণ করতে হবে।
উদাহরণ হিসেবে, মুসলিম উত্তরাধিকার আইনে ছেলে ও মেয়ের অংশের হিসাব নির্দিষ্ট নিয়মে নির্ধারিত হয়। আবার স্বামী বা স্ত্রী এবং মৃত ব্যক্তির বাবা-মায়েরও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে উত্তরাধিকার থাকতে পারে। অন্যদিকে হিন্দু উত্তরাধিকারসহ অন্যান্য ব্যক্তিগত আইনের নিয়ম আলাদা হতে পারে।
তাই পরিবারের প্রচলিত ধারণা বা মৌখিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে জমির ভাগ নির্ধারণ না করে প্রয়োজনে অভিজ্ঞ আইনজীবীর সহায়তায় হিসাব যাচাই করা উচিত।
৪. জমি ভাগের আগে সব ওয়ারিশের সম্মতি নিন
ওয়ারিশদের মধ্যে জমি ভাগ করার ক্ষেত্রে পারস্পরিক সমঝোতা গুরুত্বপূর্ণ। কে কোন দাগের জমি নেবেন, কার অংশ রাস্তার পাশে হবে, কার জমিতে বাড়ি বা পুকুর রয়েছে, এসব বিষয় আলোচনা করে ঠিক করা ভালো।
একই পরিমাণ জমি হলেও সব জমির অবস্থান, রাস্তার যোগাযোগ, বাজারমূল্য বা ব্যবহারযোগ্যতা এক রকম নাও হতে পারে। তাই শুধু জমির পরিমাণ নয়, জমির অবস্থান ও বাস্তব সুবিধাও বিবেচনায় রাখা উচিত।
সব ওয়ারিশের সম্মতিতে জমি ভাগ করা গেলে ভবিষ্যতে বিরোধের ঝুঁকি কমে। তবে কোনো ওয়ারিশের আইনগত অংশ বাদ দিয়ে বা চাপ প্রয়োগ করে বণ্টন করা উচিত নয়।
৫. আলাদা খতিয়ান করতে চাইলে নিবন্ধিত বণ্টননামা প্রয়োজন
ওয়ারিশদের মধ্যে জমি ভাগ করার পর প্রত্যেকে নিজের অংশ অনুযায়ী পৃথক খতিয়ান করতে চাইলে বণ্টননামা দলিল গুরুত্বপূর্ণ।
রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ১৪৩খ ধারায় উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া স্থাবর সম্পত্তি ওয়ারিশদের মধ্যে আপসের মাধ্যমে ভাগ করার পর সংশ্লিষ্টদের স্বাক্ষরে বণ্টন দলিল প্রস্তুত ও নিবন্ধনের কথা বলা হয়েছে। নিবন্ধিত বণ্টন দলিলের ভিত্তিতে রাজস্ব কর্মকর্তা খতিয়ান সংশোধন করতে পারেন।
অর্থাৎ, সব ওয়ারিশের সম্মতিতে কে কোন দাগে বা দাগের কোন অংশে জমি পাবেন, তা নির্ধারণ করে বণ্টননামা তৈরি করতে হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিলটি নিবন্ধন করতে হবে।
৬. যৌথ নামজারি ও পৃথক নামজারির পার্থক্য বুঝুন
অনেকের ধারণা, ওয়ারিশ সূত্রে পাওয়া জমি নামজারি করতে হলে শুরুতেই বণ্টননামা দলিল করতে হয়। তবে বিষয়টি এমন নয়।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখের নির্দেশনা অনুযায়ী, মৃত ব্যক্তির সব ওয়ারিশ চাইলে প্রত্যেকের প্রাপ্য হিস্যা উল্লেখ করে একসঙ্গে যৌথ নামজারির আবেদন করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে ওয়ারিশ সনদ জমা দিতে হয়, কিন্তু বণ্টননামা দলিল বাধ্যতামূলক নয়।
অন্যদিকে, ওয়ারিশরা যদি জমি ভাগ করে প্রত্যেকে নিজের অংশের জন্য আলাদা খতিয়ান করতে চান, তাহলে নিবন্ধিত বণ্টননামা দলিলের ভিত্তিতে পৃথক নামজারির আবেদন করতে হবে।
অর্থাৎ, দুটি বিষয় আলাদা:
-
যৌথ নামজারি: সব ওয়ারিশের নাম একটি খতিয়ানে থাকবে এবং প্রত্যেকের প্রাপ্য হিস্যা উল্লেখ থাকবে।
-
পৃথক নামজারি: বণ্টননামা অনুযায়ী প্রত্যেক ওয়ারিশের নামে আলাদা খতিয়ান তৈরি হবে।
তাই জমি ভাগের আগে পরিবার যৌথ খতিয়ান রাখবে, নাকি পৃথক খতিয়ান করবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
৭. জমির সীমানা ও দখল সরেজমিনে যাচাই করুন
কাগজে জমির ভাগ নির্ধারণ করলেও বাস্তবে জমির সীমানা ঠিক না থাকলে পরবর্তী সময়ে বিরোধ হতে পারে। তাই বণ্টনের আগে মৌজা ম্যাপ, দাগ নম্বর এবং জমির পরিমাণ অনুযায়ী সরেজমিনে মাপজোখ করা ভালো।
বিশেষ করে যেসব বিষয় যাচাই করা প্রয়োজন:
-
প্রত্যেকের ভাগে কোন দাগের জমি পড়ছে
-
জমির সীমানা কোথায়
-
রাস্তা বা চলাচলের পথ রয়েছে কি না
-
পুকুর, বাড়ি, গাছপালা বা স্থাপনা কার অংশে পড়ছে
-
অন্য কেউ জমি দখল করে রেখেছেন কি না
প্রয়োজনে অভিজ্ঞ আমিন বা সার্ভেয়ার দিয়ে জমি মাপিয়ে সীমানা নির্ধারণ করা যেতে পারে।
৮. বণ্টননামা ও নামজারির কাগজপত্র প্রস্তুত রাখুন
জমি ভাগ ও নামজারির কাজ করতে সাধারণত কয়েক ধরনের কাগজপত্র প্রয়োজন হতে পারে। যেমন:
১. মৃত ব্যক্তির মৃত্যু সনদ২. ওয়ারিশ সনদ৩. মৃত ব্যক্তির মালিকানার দলিল৪. সর্বশেষ খতিয়ান বা পর্চা৫. ওয়ারিশদের জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি৬. মৌজা, দাগ ও জমির পরিমাণের তথ্য৭. ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের তথ্য৮. নিবন্ধিত বণ্টননামা দলিল, যদি পৃথক নামজারি করতে চান
আবেদনের ধরন ও জমির রেকর্ড অনুযায়ী অতিরিক্ত কাগজপত্রও চাওয়া হতে পারে।
৯. নামজারির আবেদন কোথায় করবেন?
উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির নামজারির আবেদন অনলাইনে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ই-নামজারি ব্যবস্থার মাধ্যমে করা যায়।
আবেদনের জন্য সরকারি ওয়েবসাইট:
আবেদনের সময় জমির তথ্য, ওয়ারিশদের পরিচয় এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঠিকভাবে দিতে হবে। আবেদন যাচাইয়ের সময় সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস প্রয়োজন অনুযায়ী শুনানি বা অতিরিক্ত কাগজপত্র চাইতে পারে।
নামজারি সম্পন্ন হলে নতুন খতিয়ানে মালিকানা-সংক্রান্ত রেকর্ড হালনাগাদ হয়। তবে মনে রাখতে হবে, নামজারি নিজে থেকে কোনো ত্রুটিপূর্ণ দলিলকে বৈধ করে না বা চূড়ান্ত মালিকানা-বিরোধের নিষ্পত্তি করে না।
১০. সমঝোতা না হলে কী করবেন?
সব ওয়ারিশের মধ্যে জমি ভাগ নিয়ে সমঝোতা না হলে জোর করে জমি দখল বা একতরফাভাবে ভাগ করে নেওয়া উচিত নয়। এতে বিরোধ আরও জটিল হতে পারে।
প্রথমে আইনজীবীর মাধ্যমে কাগজপত্র যাচাই করে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা যেতে পারে। সমঝোতা সম্ভব না হলে পরিস্থিতি অনুযায়ী দেওয়ানি আদালতে বণ্টন বা বাটোয়ারা মামলা করার প্রয়োজন হতে পারে।
বিশেষ করে কোনো ওয়ারিশের অংশ অস্বীকার করা হলে, জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকলে বা কেউ জমি ভাগে বাধা দিলে আইনি পরামর্শ নিয়ে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
ওয়ারিশ সূত্রে পাওয়া জমি ভাগ করার সময় কয়েকটি ভুল ভবিষ্যতে বড় সমস্যার কারণ হতে পারে।
-
সব বৈধ ওয়ারিশকে অন্তর্ভুক্ত না করা
-
আইন অনুযায়ী প্রাপ্য অংশ নির্ধারণ না করা
-
শুধু মৌখিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে জমি ভাগ করা
-
জমির দাগ ও সীমানা যাচাই না করা
-
পৃথক খতিয়ান করতে নিবন্ধিত বণ্টননামা না করা
-
দলিল ও খতিয়ানের তথ্য না মিলিয়ে নামজারির আবেদন করা
-
অন্য ওয়ারিশের সম্মতি বা আইনগত অধিকার উপেক্ষা করা
ওয়ারিশ সূত্রে পাওয়া জমি ভাগ করার আগে সব বৈধ ওয়ারিশ চিহ্নিত করা, প্রত্যেকের প্রাপ্য অংশ হিসাব করা এবং জমির দলিল-খতিয়ান যাচাই করা সবচেয়ে জরুরি। সবাই একসঙ্গে যৌথ নামজারি করতে চাইলে বণ্টননামা ছাড়াও আবেদন করা যায়। কিন্তু জমি ভাগ করে পৃথক খতিয়ান করতে চাইলে নিবন্ধিত বণ্টননামা প্রয়োজন।
তাই তাড়াহুড়া করে জমি ভাগ না করে আগে কাগজপত্র যাচাই, ওয়ারিশদের সম্মতি এবং আইন অনুযায়ী বণ্টনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করাই নিরাপদ।
সোহাগ/
