পুরুষদের জন্য আসছে জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল, কীভাবে কাজ করবে
নিজস্ব প্রতিবেদক: জন্মনিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব এত দিন মূলত নারীদের ওপরই বেশি ছিল। নারীদের জন্য পিল, ইমপ্লান্ট ও আইইউডিসহ একাধিক পদ্ধতি থাকলেও পুরুষদের বিকল্প এখনো সীমিত। তবে বিজ্ঞানীদের নতুন গবেষণায় এই চিত্র বদলানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। পুরুষদের জন্য এমন একটি হরমোনবিহীন জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল তৈরির চেষ্টা চলছে, যা যৌনমিলনের আগে সেবন করলে কয়েক ঘণ্টার জন্য শুক্রাণুর চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েল কর্নেল মেডিসিনের গবেষকেরা এ পিল তৈরির কাজ করছেন। গবেষণাটি সফল হলে পুরুষদের জন্য জন্মনিয়ন্ত্রণের নতুন একটি বিকল্প তৈরি হতে পারে। তবে ওষুধটি এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। এটি বাজারে ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত নয়।
যৌনমিলনের আগে খেতে হবে পরীক্ষাধীন পিল
গবেষকদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন পিলটি যৌনমিলনের প্রায় ৩০ মিনিট আগে সেবন করতে হতে পারে। এর সম্ভাব্য প্রভাব ছয় থেকে আট ঘণ্টা স্থায়ী হতে পারে। এরপর শুক্রাণুর স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা ফিরে আসার কথা।
অর্থাৎ, এটি প্রতিদিন খাওয়ার পিল নয়। বরং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহারের উপযোগী একটি জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি তৈরিই গবেষকদের লক্ষ্য।
২০২৬ সালের ২৩ অক্টোবর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই গবেষণাকে এগিয়ে নিতে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথের অধীন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব চাইল্ড হেলথ অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট থেকে চার বছরের জন্য ৮২ লাখ ডলারের অনুদান পেয়েছে গবেষক দল।
প্রকল্পটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন ওয়েল কর্নেল মেডিসিনের ফার্মাকোলজির অধ্যাপক ড. জোচেন বাক ও ড. লনি লেভিন। ওষুধ তৈরির কাজে যুক্ত রয়েছেন ড. পিটার মেইনকেও।
কীভাবে কাজ করবে পুরুষদের এই জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল?
গবেষণাটির মূল লক্ষ্য সলিউবল অ্যাডেনাইল সাইক্লেজ বা এসএসি (sAC) নামের একটি এনজাইমকে সাময়িকভাবে নিষ্ক্রিয় করা। শুক্রাণুর চলাচল ও কার্যক্ষমতা বজায় রাখতে এই এনজাইম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
গবেষকেরা এমন ওষুধ তৈরি করছেন, যা সাময়িকভাবে এসএসি এনজাইমের কার্যক্রম আটকে দিতে পারে। এতে শুক্রাণুর চলাচল বাধাগ্রস্ত হবে। ফলে শুক্রাণুর ডিম্বাণু পর্যন্ত পৌঁছানোর সক্ষমতা কমে যেতে পারে এবং নিষেকের সম্ভাবনা প্রতিরোধ করা সম্ভব হতে পারে।
২০২৩ সালে Nature Communications সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি প্রাক-ক্লিনিক্যাল গবেষণায় এসএসি এনজাইম বন্ধ করার প্রভাব নিয়ে পরীক্ষা করা হয়। সেখানে পরীক্ষাগারে শুক্রাণুর চলাচল থেমে যাওয়ার পাশাপাশি প্রাণীর ওপর পরিচালিত পরীক্ষায় গর্ভধারণ প্রতিরোধের ফল পাওয়া যায়।
তবে প্রাণী ও পরীক্ষাগারের গবেষণার ফল সরাসরি মানুষের ক্ষেত্রে কার্যকর হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। মানুষের জন্য ওষুধটি নিরাপদ ও কার্যকর কি না, তা ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের মাধ্যমেই নিশ্চিত হতে হবে।
পিলটির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে কী জানা গেছে?
নতুন ওষুধটির নিরাপত্তা যাচাই গবেষণার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ এটি সুস্থ পুরুষদের ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হচ্ছে। তাই শুক্রাণুর চলাচল বন্ধ করার পাশাপাশি শরীরের অন্যান্য অঙ্গ, হরমোনের ভারসাম্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজননক্ষমতার ওপর এর কোনো প্রভাব পড়ে কি না, সেটিও পরীক্ষা করতে হবে।
গবেষকদের সামনে এখন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। ওষুধটি প্রত্যাশিত সময় পর্যন্ত কাজ করবে কি না, এর প্রভাব নির্দিষ্ট সময়ের পর পুরোপুরি কেটে যাবে কি না এবং দীর্ঘমেয়াদে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরি হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
নতুন অনুদানের অর্থের একটি বড় অংশ ওষুধটির বিষক্রিয়া ও নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং মানবদেহে পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যয় করা হবে। এরপর সুস্থ পুরুষদের নিয়ে প্রথম পর্যায়ের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।
YCT-529 নিয়েও চলছে গবেষণা
পুরুষদের জন্য হরমোনবিহীন জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল তৈরির আরেকটি উদ্যোগ হলো YCT-529। তবে এটি এসএসি-ভিত্তিক পিলের মতো একইভাবে কাজ করে না।
YCT-529 শুক্রাণুর চলাচল বন্ধ করার পরিবর্তে শুক্রাণু উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি হচ্ছে। ২০২৫ সালে প্রকাশিত প্রথম পর্যায়ের মানবপরীক্ষায় ১৬ জন পুরুষের ওপর ওষুধটির একবারের বিভিন্ন মাত্রা পরীক্ষা করা হয়। প্রাথমিক পরীক্ষায় এটি সামগ্রিকভাবে সহনীয় বলে দেখা যায়।
তবে ওই পরীক্ষায় শুক্রাণুর সংখ্যা কমানো বা গর্ভধারণ প্রতিরোধে ওষুধটির কার্যকারিতা যাচাই করা হয়নি। পরবর্তী গবেষণায় ২৮, ৯০ ও ১৮০ দিন ব্যবহারের পর এর নিরাপত্তা এবং শুক্রাণুর বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করার পরিকল্পনা রয়েছে।
কবে বাজারে আসতে পারে পুরুষদের জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল?
এখনই বলা যাচ্ছে না, পুরুষদের জন্য হরমোনবিহীন জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল কবে বাজারে পাওয়া যাবে। এসএসি-ভিত্তিক পিলটি এখনো মানবদেহে পরীক্ষার প্রস্তুতির পর্যায়ে রয়েছে। অন্যদিকে, YCT-529-এর মানবপরীক্ষা শুরু হলেও সেটিও সাধারণ ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত নয়।
বাজারে আসার আগে ওষুধগুলোর কার্যকারিতা, নিরাপত্তা, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং প্রজননক্ষমতা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। এসব পরীক্ষায় সফল না হওয়া পর্যন্ত পিলগুলোকে কার্যকর জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।
জন্মনিয়ন্ত্রণে পুরুষদের ভূমিকা কি বাড়বে?
বর্তমানে পুরুষদের জন্মনিয়ন্ত্রণের প্রধান উপায় কনডম ও ভ্যাসেকটমি। নিরাপদ, কার্যকর ও প্রয়োজনে বন্ধ করা যায় এমন পিল তৈরি হলে পরিবার পরিকল্পনায় পুরুষদের অংশগ্রহণ বাড়তে পারে। এতে জন্মনিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নারী ও পুরুষের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল যৌনবাহিত সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা দেয় না। এ ধরনের সংক্রমণ প্রতিরোধে কনডমের ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, পুরুষদের জন্য হরমোনবিহীন জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল তৈরির গবেষণা পরিবার পরিকল্পনায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে গবেষণার ফল, মানবদেহে পরীক্ষা এবং অনুমোদনের ধাপ পেরোনোর পরই বোঝা যাবে, এই পদ্ধতি বাস্তবে কতটা কার্যকর ও নিরাপদ।
আশা/
