নিয়ম মেনে খাওয়া ও ব্যায়ামের পর হতে পারে হৃদরোগ, নেপথ্যে ৫ কারণ
নিজস্ব প্রতিবেদক: নিয়ম মেনে খাওয়াদাওয়া, নিয়মিত ব্যায়াম ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন—হৃদ্যন্ত্র সুস্থ রাখতে এসব অভ্যাসের গুরুত্ব অনেক। তবে এসব মেনে চলার পরও কারও কারও হৃদ্রোগ হতে পারে। কারণ, হৃদ্রোগের ঝুঁকি শুধু খাবার বা শারীরিক পরিশ্রমের ওপর নির্ভর করে না; বংশগত বৈশিষ্ট্য, কিছু শারীরিক সমস্যা এবং অজানা ঝুঁকিও এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষ করে পরিবারে অল্প বয়সে হৃদ্রোগের ইতিহাস থাকলে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। কিছু জিনগত সমস্যা দীর্ঘদিন কোনো লক্ষণ ছাড়াই থাকতে পারে। ফলে বাইরে থেকে সুস্থ মনে হলেও কারও হৃদ্রোগের ঝুঁকি থাকতে পারে।
১. বংশগতভাবে বেশি কোলেস্টেরল
রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল বা এলডিএল (LDL) বেশি থাকলে ধমনিতে চর্বিজাতীয় পদার্থ জমে রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে হৃদ্রোগ ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ে।
কিছু মানুষের ক্ষেত্রে পারিবারিক হাইপারকোলেস্টেরোলেমিয়া (Familial Hypercholesterolemia) নামের বংশগত সমস্যার কারণে জন্মগতভাবেই এলডিএল কোলেস্টেরল অনেক বেশি থাকে। স্বাস্থ্যকর খাবার ও ব্যায়াম উপকারী হলেও এ ক্ষেত্রে শুধু জীবনযাত্রার পরিবর্তন যথেষ্ট নাও হতে পারে।
পরিবারে কারও অল্প বয়সে হার্ট অ্যাটাক বা খুব বেশি কোলেস্টেরলের ইতিহাস থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে কোলেস্টেরল পরীক্ষা করানো গুরুত্বপূর্ণ।
২. হৃদ্পেশির জিনগত সমস্যা
হৃৎপিণ্ডের পেশিতে কিছু বংশগত পরিবর্তনের কারণে কার্ডিওমায়োপ্যাথি (Cardiomyopathy) হতে পারে। এ ধরনের সমস্যায় হৃদ্পেশি অস্বাভাবিকভাবে মোটা, প্রসারিত বা শক্ত হয়ে যেতে পারে। ফলে হৃৎপিণ্ডের রক্ত পাম্প করার ক্ষমতা ব্যাহত হতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে শুরুতে কোনো লক্ষণ থাকে না। পরে শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, বুক ধড়ফড় করা কিংবা মাথা ঘোরার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
পরিবারে কার্ডিওমায়োপ্যাথি, অল্প বয়সে আকস্মিক হৃদ্মৃত্যু বা গুরুতর হৃদ্রোগের ইতিহাস থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
৩. হৃদ্যন্ত্রের বৈদ্যুতিক সংকেতের সমস্যা
হৃৎপিণ্ড নির্দিষ্ট বৈদ্যুতিক সংকেতের মাধ্যমে নিয়মিত স্পন্দিত হয়। জিনগত বা অন্য কোনো কারণে এই সংকেতের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সমস্যা হলে হৃদ্স্পন্দন খুব দ্রুত, ধীর কিংবা অনিয়মিত হতে পারে।
কিছু ধরনের অ্যারিদমিয়া (Arrhythmia) দীর্ঘদিন ধরা না-ও পড়তে পারে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, বুক ধড়ফড় করা বা শ্বাসকষ্টের মতো লক্ষণ দেখা দেয়।
বিশেষ করে ব্যায়ামের সময় অজ্ঞান হয়ে যাওয়া কিংবা পরিবারে অল্প বয়সে আকস্মিক মৃত্যুর ইতিহাস থাকলে বিষয়টি অবহেলা না করে চিকিৎসকের মূল্যায়ন নেওয়া প্রয়োজন।
৪. উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস
উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস হৃদ্রোগের গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ। উচ্চ রক্তচাপ দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণে না থাকলে হৃৎপিণ্ডকে বেশি পরিশ্রম করতে হয়। অন্যদিকে ডায়াবেটিস রক্তনালির ক্ষতি করে হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
কেউ নিয়মিত ব্যায়াম করলেও তাঁর উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিস থাকতে পারে। অনেক সময় এসব সমস্যার শুরুতে স্পষ্ট উপসর্গও দেখা যায় না।
তাই শুধু শরীর ভালো লাগছে বলে নিশ্চিন্ত থাকা ঠিক নয়। বয়স, পারিবারিক ইতিহাস ও ব্যক্তিগত ঝুঁকি অনুযায়ী রক্তচাপ, রক্তের শর্করা এবং কোলেস্টেরল পরীক্ষা করানো প্রয়োজন হতে পারে।
৫. ধূমপান, ঘুমের সমস্যা ও দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ
স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া ও ব্যায়াম করার পাশাপাশি ঘুম, মানসিক চাপ এবং তামাক ব্যবহারের বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ। ধূমপান ও তামাকজাত পণ্য রক্তনালির ক্ষতি করে এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। দীর্ঘদিন ঘুমের সমস্যা থাকলেও রক্তচাপসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার ওপর প্রভাব পড়তে পারে।
দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের সঙ্গে অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস, ঘুমের ঘাটতি ও রক্তচাপের সমস্যা যুক্ত হলে হৃদ্যন্ত্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তাই নিয়মিত ব্যায়ামের পাশাপাশি পর্যাপ্ত ঘুম, ধূমপান পরিহার এবং মানসিক চাপ সামলানোর অভ্যাস গড়ে তোলাও জরুরি।
হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমাতে কী করবেন?
হৃদ্রোগের সব ঝুঁকি প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে কিছু অভ্যাস ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে—
-
শাকসবজি, ফল, ডাল ও আঁশযুক্ত খাবারসহ সুষম খাদ্য গ্রহণ করুন।
-
নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করুন এবং ধূমপান এড়িয়ে চলুন।
-
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রক্তচাপ, রক্তের শর্করা ও কোলেস্টেরল পরীক্ষা করুন।
-
পরিবারে অল্প বয়সে হৃদ্রোগের ইতিহাস থাকলে চিকিৎসককে জানান।
-
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিয়মিত ওষুধ বন্ধ করবেন না।
কখন জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন? বুকে চাপ বা ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম, হঠাৎ দুর্বলতা কিংবা ব্যথা হাত, পিঠ, ঘাড় বা চোয়ালে ছড়িয়ে পড়লে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিন। এসব লক্ষণ হার্ট অ্যাটাকের ইঙ্গিত হতে পারে।
সবশেষে মনে রাখা জরুরি, নিয়মিত ব্যায়াম ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমায়, কিন্তু ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করে না। নিজের পারিবারিক ইতিহাস ও শারীরিক অবস্থার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই হৃদ্যন্ত্রের সুস্থতা রক্ষার ভালো উপায়।
আশা/
