চোখের নিচে কালো দাগ পড়ে কেন? কমানোর সহজ উপায়
নিজস্ব প্রতিবেদক: পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া, দীর্ঘ সময় পড়াশোনা বা কাজ করা, কিংবা রাত জাগার পর অনেকের চোখের নিচে কালচে দাগ ও ফোলা ভাব দেখা দেয়। ব্যস্ত জীবনে ঘুমের অনিয়মকে এর প্রধান কারণ মনে করা হলেও, চোখের নিচে কালো দাগ পড়ার পেছনে আরও কিছু বিষয় কাজ করতে পারে।
চোখের চারপাশের ত্বক মুখের অন্যান্য অংশের তুলনায় পাতলা ও সংবেদনশীল। এ কারণে রক্তনালির আভা, ত্বকের রঙের পরিবর্তন এবং বয়সের প্রভাব এই অংশে তুলনামূলকভাবে বেশি দৃশ্যমান হয়। বংশগত বৈশিষ্ট্য, অতিরিক্ত রোদে থাকা ও চোখের নিচে তরল জমার কারণেও কালচে দাগ বা ফোলা ভাব দেখা দিতে পারে।
তাই এক রাত ভালো ঘুমালেই চোখের নিচের কালো দাগ পুরোপুরি দূর হয়ে যাবে, এমনটি সব সময় হয় না। সমস্যার কারণ বুঝে যত্ন নেওয়াই এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
ঘুমের অভাবে চোখের নিচে ফোলা ভাব হয় কেন?
ঘুমের সময় শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া চলতে থাকে। নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুম না হলে তার প্রভাব শরীরের পাশাপাশি ত্বকেও পড়তে পারে। চোখের চারপাশের ত্বক পাতলা হওয়ায় ক্লান্তির ছাপ সেখানে সহজে বোঝা যায়।
ঘুম কম হলে চোখের নিচের রক্তনালিগুলো আরও স্পষ্ট দেখাতে পারে। আবার ওই অংশে সাময়িকভাবে তরল জমলে ফোলা ভাব তৈরি হয়, যা সাধারণভাবে ‘আই ব্যাগ’ নামে পরিচিত।
তবে চোখের নিচে ফোলা ভাবের জন্য শুধু ঘুমের অভাব দায়ী নয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা কমে যেতে পারে। বংশগত বৈশিষ্ট্য এবং চোখের চারপাশের চর্বির বণ্টনে পরিবর্তনের কারণেও আই ব্যাগ দেখা দিতে পারে।
চোখের নিচের ফোলা ভাব কমানোর উপায়
রাত জাগার পর সকালে চোখের নিচে ফোলা ভাব দেখা দিলে কয়েকটি সহজ অভ্যাস কাজে লাগতে পারে।
পর্যাপ্ত ঘুমান: নিয়মিত ঘুমের সময় ঠিক রাখুন। বয়স অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ঘুম নিশ্চিত করলে ক্লান্তির ছাপ কমতে সাহায্য করতে পারে।
ঠান্ডা সেঁক দিন: পরিষ্কার কাপড়ে মোড়ানো ঠান্ডা সেঁক চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ ধরে রাখতে পারেন। এতে সাময়িকভাবে ফোলা ভাব কমতে পারে। সরাসরি বরফ চোখের ত্বকে লাগাবেন না।
লবণ কম খান: খাবারে অতিরিক্ত লবণ থাকলে শরীরে পানি জমে থাকার প্রবণতা বাড়তে পারে। তাই অতিরিক্ত লবণযুক্ত খাবার কম খাওয়ার চেষ্টা করুন।
পর্যাপ্ত পানি পান করুন: শরীরে পানির ঘাটতি এড়াতে নিয়মিত পানি পান করুন। পাশাপাশি সুষম খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
এসব পদক্ষেপের পরও ফোলা ভাব দীর্ঘদিন থাকলে, ক্রমে বাড়লে কিংবা হঠাৎ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
চোখের নিচে কালো দাগ পড়ে কেন?
চোখের নিচে কালচে দাগ বা ডার্ক সার্কেল হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। ঘুমের অভাবে দাগ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে, তবে এটিই একমাত্র কারণ নয়।
১. ত্বক পাতলা হওয়া: চোখের নিচের ত্বক পাতলা হলে এর নিচের রক্তনালির নীলচে বা বেগুনি আভা বেশি দৃশ্যমান হতে পারে। এতে ওই অংশ কালচে দেখায়।
২. বংশগত বৈশিষ্ট্য: পরিবারের অন্য সদস্যদের চোখের নিচে কালো দাগ থাকলে কারও কারও ক্ষেত্রেও এমন প্রবণতা দেখা যেতে পারে।
৩. ত্বকে রঞ্জক পদার্থের আধিক্য: চোখের নিচের ত্বকে মেলানিন বা রঞ্জক পদার্থ বেশি থাকলে ওই অংশের রং গাঢ় হতে পারে।
৪. অতিরিক্ত রোদে থাকা: সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাবে ত্বকে রঞ্জক পদার্থের পরিমাণ বাড়তে পারে। এতে চোখের নিচের কালচে দাগ আরও স্পষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
৫. ক্লান্তি ও ফোলা ভাব: চোখের নিচে ফোলা তৈরি হলে সেখানে ছায়া পড়ে কালচে দেখাতে পারে। আবার ক্লান্তির কারণে মুখের ত্বক ফ্যাকাশে দেখালেও চোখের নিচের রক্তনালিগুলো বেশি দৃশ্যমান হতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে আয়রনের ঘাটতি বা অন্য শারীরিক সমস্যার সঙ্গেও চোখের নিচের কালচে ভাবের সম্পর্ক থাকতে পারে। তবে শুধু ডার্ক সার্কেল দেখে আয়রনের ঘাটতি বা কোনো রোগ নির্ণয় করা যায় না।
ডার্ক সার্কেল কমানোর সহজ উপায়
চোখের নিচে কালো দাগ কমাতে প্রথমেই কারণ অনুযায়ী যত্ন নেওয়া জরুরি। কয়েকটি অভ্যাস এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।
নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুম: কিশোর-কিশোরীদের সাধারণত প্রতি রাতে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সাধারণভাবে ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমের পরামর্শ দেওয়া হয়। বয়স অনুযায়ী ঘুমের প্রয়োজন পূরণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
রোদ থেকে সুরক্ষা: বাইরে গেলে সানগ্লাস ব্যবহার করুন। চোখের চারপাশের সংবেদনশীল ত্বকের উপযোগী সানস্ক্রিন ব্যবহার করতে পারেন, তবে তা যেন চোখে না লাগে।
সুষম খাবার ও পর্যাপ্ত পানি: নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার খান এবং শরীরে পানির ঘাটতি হতে দেবেন না। আয়রনের ঘাটতি সন্দেহ হলে পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে থেকে আয়রন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করবেন না।
ত্বকের উপযোগী প্রসাধনী: চোখের চারপাশের ত্বকের জন্য তৈরি কিছু পণ্য নির্দিষ্ট ধরনের কালচে দাগ কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে সব পণ্য সবার জন্য উপযোগী নয়। জ্বালাপোড়া বা অস্বস্তি হলে ব্যবহার বন্ধ করুন।
মনে রাখতে হবে, বংশগত বৈশিষ্ট্য বা ত্বকের স্বাভাবিক গঠনের কারণে তৈরি ডার্ক সার্কেল পুরোপুরি দূর করা সব সময় সম্ভব নয়। তাই দ্রুত ফল পাওয়ার আশায় অজানা ক্রিম বা ঘরোয়া উপাদান চোখের আশপাশে ব্যবহার করা ঠিক নয়।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
চোখের নিচে কালচে দাগ থাকলেই যে কোনো অসুস্থতা হয়েছে, তা নয়। তবে হঠাৎ করে চোখের নিচে বেশি ফোলা দেখা দিলে, বিশেষ করে এক চোখের চারপাশে ফোলা বা ব্যথা হলে, কিংবা দৃষ্টির পরিবর্তন, জ্বর বা অন্য উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
দীর্ঘদিন ধরে কালচে দাগ বা ফোলা ভাব থাকলে এবং তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে সম্ভাব্য কারণ জেনে নেওয়া ভালো।
চোখের নিচের কালো দাগ কমানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিয়মিত ঘুম, সঠিক ত্বক পরিচর্যা এবং সমস্যার কারণ বোঝা। কারণ অনুযায়ী যত্ন নিলে দাগের তীব্রতা কমতে পারে, যদিও সব ক্ষেত্রে তা পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়।
সোহাগ/
