পুরুষের তুলনায় নারীদের মাঝারি রক্তস্বল্পতার ঝুঁকি ১১ গুণ
নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের গ্রামীণ নারীদের মধ্যে রক্তস্বল্পতার উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে এক গবেষণায়। গবেষণায় দেখা গেছে, স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসা নারীদের প্রায় ৭৮ শতাংশ রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত। পুরুষদের ক্ষেত্রে এ হার ৩৯ দশমিক ৭ শতাংশ। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, পুরুষের তুলনায় নারীদের মাঝারি মাত্রার রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ১১ দশমিক ৫৩ গুণ বেশি।
চট্টগ্রাম বিভাগের চারটি গ্রামীণ ইউনিয়নে স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসা প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়। আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘হেলথ সায়েন্স রিপোর্টস’-এ গত ১০ অক্টোবর প্রকাশিত গবেষণায় হিমোগ্লোবিন পরীক্ষার তথ্য পাওয়া ৪৫৯ জনকে চূড়ান্ত বিশ্লেষণে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
গবেষণায় রক্তস্বল্পতার যে চিত্র উঠে এসেছে
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৪৫৯ জনের মধ্যে ৫৯ দশমিক ৩ শতাংশ রক্তস্বল্পতায় ভুগছেন। নারী অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে এ হার ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ। অন্যদিকে পুরুষদের মধ্যে রক্তস্বল্পতায় আক্রান্তের হার ৩৯ দশমিক ৭ শতাংশ।
গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ২৭ শতাংশের মৃদু, ২৯ দশমিক ৬ শতাংশের মাঝারি এবং ২ দশমিক ৬ শতাংশের তীব্র রক্তস্বল্পতা পাওয়া গেছে।
নারী-পুরুষের মধ্যে ঝুঁকির পার্থক্যও ছিল উল্লেখযোগ্য। গবেষণায় পুরুষের তুলনায় নারীদের মৃদু রক্তস্বল্পতার ঝুঁকি ২ দশমিক ৫১ গুণ এবং মাঝারি রক্তস্বল্পতার ঝুঁকি ১১ দশমিক ৫৩ গুণ বেশি পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া স্বাভাবিক ওজনের মানুষের তুলনায় কম ওজনের ব্যক্তিদের মাঝারি মাত্রার রক্তস্বল্পতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ৩ দশমিক ৪২ গুণ বেশি বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
নারীদের রক্তস্বল্পতার ঝুঁকি বেশি হওয়ার কারণ কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, নারীদের রক্তস্বল্পতার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে। এর মধ্যে রয়েছে পুষ্টিহীনতা, মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, কম বয়সে বিয়ে এবং গর্ভধারণ ও সন্তান জন্মদান।
গর্ভাবস্থায় নারীর শরীরে আয়রনসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদানের চাহিদা বেড়ে যায়। কিন্তু অনেক নারী প্রয়োজন অনুযায়ী পুষ্টিকর খাবার পান না। ফলে শরীরে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কমে রক্তস্বল্পতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আফসানা হাবিব শিউলী মনে করেন, নারীদের পুষ্টির চাহিদা অনুযায়ী খাবার নিশ্চিত করা জরুরি। এ জন্য পুষ্টিবিষয়ক শিক্ষা ও সচেতনতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
সব রক্তস্বল্পতার কারণ আয়রনের অভাব নয়
রক্তস্বল্পতা হলেই যে শরীরে শুধু আয়রনের ঘাটতি রয়েছে, তা নয়। ফলেট ও ভিটামিন বি১২-এর অভাব, দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ, বিভিন্ন সংক্রমণ এবং বংশগত রক্তরোগের কারণেও রক্তস্বল্পতা দেখা দিতে পারে।
তাই রক্তস্বল্পতা শনাক্ত হলে নিজের ইচ্ছামতো আয়রনের ওষুধ খাওয়ার পরিবর্তে চিকিৎসকের পরামর্শে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা উচিত। এতে সমস্যার প্রকৃত কারণ জানা এবং সে অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়া সহজ হয়।
কিশোরী ও গর্ভবতীদের নিয়মিত পরীক্ষা জরুরি
গবেষণার সহগবেষক ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের মিডিয়া স্টাডিজ অ্যান্ড জার্নালিজম বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম গ্রামীণ নারীদের নিয়মিত হিমোগ্লোবিন পরীক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
তাঁর মতে, কিশোরী, সন্তান ধারণের বয়সী নারী এবং গর্ভবতীদের ক্ষেত্রে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী আয়রন ও ফলিক অ্যাসিডের বড়ি গ্রহণ এবং চিকিৎসার অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
খাদ্যতালিকায় মাছ, মাংস, ডিম, ডাল ও শাকসবজি রাখার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। আয়রনসমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে ভিটামিন সি-যুক্ত ফল খেলে শরীরে আয়রন শোষণে সহায়তা হয়। একই সঙ্গে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, নিরাপদ মাতৃত্ব এবং সন্তান জন্মদানের মধ্যে যথেষ্ট বিরতি নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
থ্যালাসেমিয়াসহ অন্যান্য কারণও বিবেচনায় নিতে হবে
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. সালাহউদ্দিন শাহের মতে, চট্টগ্রাম অঞ্চলে থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্তের হার বেশি। তাই রক্তস্বল্পতার ক্ষেত্রে শুধু আয়রনের ঘাটতিকে দায়ী না করে প্রকৃত কারণ নির্ণয় করা জরুরি।
গবেষণার ফলাফল নিয়ে যে বিষয়টি মনে রাখা দরকার
গবেষণায় নারীদের মধ্যে রক্তস্বল্পতার উচ্চ হার পাওয়া গেলেও এর ফলাফল দেশের সব নারী-পুরুষের ক্ষেত্রে সরাসরি প্রয়োগ করা যাবে না। কারণ, গবেষণার তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল প্রায় এক দশক আগে। পাশাপাশি চূড়ান্ত বিশ্লেষণে হিমোগ্লোবিন পরীক্ষার তথ্য পাওয়া ৪৫৯ জনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।
এ ছাড়া গবেষণায় রক্তস্বল্পতার সম্ভাব্য সব কারণ আলাদাভাবে নির্ণয় করা হয়নি। ফলে এই ফলাফল নির্দিষ্ট এলাকার স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসা ব্যক্তিদের পরিস্থিতি তুলে ধরে, পুরো দেশের বর্তমান চিত্র নয়।
তবে গবেষণাটি গ্রামীণ নারীদের পুষ্টি, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং রক্তস্বল্পতার প্রকৃত কারণ শনাক্ত করার প্রয়োজনীয়তা আবারও সামনে এনেছে।
সিদ্দিকা/
