এক গোলেই বিদায় নিলেন রোনালদো, মেসি ও নেইমার
নিজস্ব প্রতিবেদক: ফুটবল মাঠে তিনজনের তিন রকম পরিচয়। লিওনেল মেসির পায়ের জাদু, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর অদম্য গোলক্ষুধা আর নেইমার জুনিয়রের শৈল্পিক ফুটবল। দীর্ঘ সময় ধরে এই তিন তারকাকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে বিশ্ব ফুটবলের বড় একটি অংশ। তাদের পারফরম্যান্স, রেকর্ড ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা উপভোগ করেছেন কোটি কোটি সমর্থক।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে ফুটবলের পরিচিত দৃশ্যপট। ২০২৬ সালে একে একে জাতীয় দলের অধ্যায় শেষ করেছেন নেইমার, মেসি ও রোনালদো। তিনজনের বিদায়ের সময়, পরিস্থিতি ও আবেগ আলাদা হলেও তাদের শেষ আন্তর্জাতিক গোলের গল্পে পাওয়া গেছে এক বিস্ময়কর মিল। তিনজনই দেশের জার্সিতে শেষ গোলটি করেছেন পেনাল্টি থেকে।
নেইমারের বিদায়, বিশ্বকাপেই শেষ গোল
ব্রাজিলের হয়ে নেইমারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায় লেখা হয় ২০২৬ বিশ্বকাপে। নরওয়ের বিপক্ষে শেষ ষোলোতে ২-১ গোলে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় ব্রাজিল। ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ে পেনাল্টি থেকে গোল করেছিলেন নেইমার। সেটিই হয়ে থাকে ব্রাজিলের জার্সিতে তার শেষ আন্তর্জাতিক গোল।
বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পর জাতীয় দলের হয়ে আর না খেলার ইঙ্গিত দেন এই ফরোয়ার্ড। পরে ২৯ জুলাইয়ের দিকে নিজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানার কথা জানান তিনি। ব্রাজিলের হয়ে ১৩০ ম্যাচে ৮০ গোল করে দেশের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবেই জাতীয় দল ছাড়েন নেইমার।
তার বিদায়ে ব্রাজিল হারিয়েছে এমন একজন ফুটবলারকে, যিনি ড্রিবলিং, গতি ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে আলাদা এক খেলার ধরন তৈরি করেছিলেন।
মেসির শেষ ম্যাচে গোল ও দুই অ্যাসিস্ট
নেইমারের পর আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানান আর্জেন্টাইন মহাতারকা লিওনেল মেসি। ৩১ আগস্ট ২০২৬ জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন তিনি। তবে দেশের সমর্থকদের সামনে শেষবারের মতো খেলার সুযোগ পান বুয়েনস আইরেসের মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে।
৬ অক্টোবর বেনিনের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে ৩-০ গোলে জয় পায় আর্জেন্টিনা। ম্যাচে নিকোলাস ওতামেন্দি ও নিকো পাজের গোলে সহায়তা করেন মেসি। পরে পেনাল্টি থেকে নিজেও গোল করেন তিনি। এটিই হয়ে থাকে আর্জেন্টিনার হয়ে তার শেষ গোল।
জাতীয় দলের হয়ে ২০৮ ম্যাচে ১২৬ গোল করে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ করেন আটবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী এই তারকা। আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপ ও কোপা আমেরিকা জয়ের স্মৃতিও তার ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় অর্জন হয়ে থাকবে।
রোনালদোর শেষ গোলও পেনাল্টিতে
সবশেষে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানান ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। ৫ নভেম্বর ২০২৬ পর্তুগালের জাতীয় দলের জার্সি তুলে রাখার ঘোষণা দেন ৪১ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড। এর মধ্য দিয়ে ২০০৩ সালে শুরু হওয়া তার ২৩ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তি ঘটে।
পর্তুগালের হয়ে রোনালদোর শেষ গোলটি এসেছিল ২০২৬ বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে। ম্যাচে পেনাল্টি থেকে গোল করেন তিনি। সেই গোলটিই হয়ে থাকে জাতীয় দলের জার্সিতে তার শেষ গোল।
পর্তুগালের হয়ে ২৩৪ ম্যাচে ১৪৬ গোল করেছেন রোনালদো। আন্তর্জাতিক ফুটবলে পুরুষদের মধ্যে সর্বোচ্চ গোল ও ম্যাচ খেলার রেকর্ড দুটিই তার দখলে। ইউরো ২০১৬ এবং উয়েফা নেশন্স লিগের দুটি শিরোপা জয়ের পথেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তিনি।
তিন তারকার শেষ গোল, একই চিত্রনাট্য
নেইমার, মেসি ও রোনালদো তিনজনই আলাদা দেশের হয়ে খেলেছেন। তাদের খেলার ধরন, নেতৃত্ব ও অর্জনের জায়গাতেও রয়েছে পার্থক্য। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ গোলের ক্ষেত্রে মিলটি বেশ বিরল।
নেইমার নরওয়ের বিপক্ষে, মেসি বেনিনের বিপক্ষে এবং রোনালদো ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে গোল করেছেন। তিনজনেরই জাতীয় দলের হয়ে শেষ গোল এসেছে স্পটকিক থেকে।
এই মিল হয়তো নিছকই কাকতালীয়। তবে ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এটি হয়ে থাকবে তিন মহাতারকার বিদায়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ব্যতিক্রমী এক পরিসংখ্যান।
তিনজনের ফুটবলে তিন রকম প্রভাব
নেইমার ফুটবলপ্রেমীদের কাছে পরিচিত তার ড্রিবলিং, বল নিয়ন্ত্রণ ও সৃজনশীলতার জন্য। প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে জায়গা তৈরি করা কিংবা কঠিন পরিস্থিতিতে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে সুযোগ তৈরি করা ছিল তার খেলার বড় বৈশিষ্ট্য।
মেসির ক্ষেত্রে ফুটবল যেন ছিল শিল্পের মতো। বল পায়ে গতি পরিবর্তন, নিখুঁত পাস, অসাধারণ ফিনিশিং এবং সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরি করার ক্ষমতা তাকে নিয়ে গেছে কিংবদন্তির পর্যায়ে। আর্জেন্টিনাকে ২০২২ বিশ্বকাপ ও দুটি কোপা আমেরিকা জেতানোর স্মৃতিও তার ক্যারিয়ারের সঙ্গে জড়িয়ে থাকবে।
অন্যদিকে রোনালদোর পরিচয়ের বড় অংশজুড়ে রয়েছে পরিশ্রম, শারীরিক সক্ষমতা, আত্মবিশ্বাস ও গোল করার ক্ষুধা। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে নিজেকে বারবার নতুনভাবে গড়ে তোলার মাধ্যমে তিনি হয়ে উঠেছেন ফুটবলের অন্যতম আলোচিত ব্যক্তিত্ব। পর্তুগালের হয়ে ইউরো ও নেশন্স লিগ জয় তার অর্জনের তালিকায় বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে।
শেষ হলো একটি সময়ের গল্প
একসময় ফুটবলপ্রেমীদের আলোচনার বড় অংশজুড়ে থাকত মেসি, রোনালদো ও নেইমারের তুলনা। কে বেশি গোল করেছেন, কার ড্রিবলিং ভালো, কে বেশি শিরোপা জিতেছেন, এমন বিতর্কে বছরের পর বছর সরগরম ছিল ফুটবলবিশ্ব।
এখন সেই আলোচনায় যোগ হয়েছে বিদায়ের স্মৃতি। নতুন প্রজন্মের ফুটবলাররা নিজেদের প্রতিভা দিয়ে মাঠ মাতাচ্ছেন। ভবিষ্যতে নতুন রেকর্ড তৈরি হবে, নতুন প্রতিদ্বন্দ্বিতাও জন্ম নেবে। কিন্তু একই সময়ে এই তিন তারকার দীর্ঘদিনের প্রভাব ও জনপ্রিয়তার পুনরাবৃত্তি সহজ হবে না।
ফুটবল থেমে থাকবে না। নতুন তারকা আসবেন, নতুন গোল হবে, নতুন ইতিহাস লেখা হবে। তবে মেসির বাঁ পায়ের জাদু, রোনালদোর গোল উদ্যাপন আর নেইমারের নান্দনিক ড্রিবলিং যে প্রজন্মের স্মৃতির অংশ হয়ে আছে, তাদের কাছে এই তিন তারকার বিদায় বিশেষ এক অধ্যায়ের সমাপ্তি।
তিনজনের শেষ গোল পেনাল্টি থেকে আসার মিলটি হয়তো কাকতালীয়। কিন্তু তাদের রেখে যাওয়া স্মৃতি ও ফুটবলে প্রভাব কাকতালীয় নয়। তারা প্রত্যেকেই নিজেদের মতো করে একটি সময়কে সংজ্ঞায়িত করেছেন।
আয়শা/
