প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে এলপিজির দাম ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বেশি
নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজির দাম প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের তুলনায় অনেক বেশি। পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের প্রকাশিত খুচরা দরের সঙ্গে তুলনা করলে বাংলাদেশে প্রতি কেজি এলপিজির দাম প্রায় ৩০ থেকে ৪৫ শতাংশ বেশি। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক সরবরাহ সংকট, আমদানির উৎস পরিবর্তন, পরিবহন ব্যয় এবং স্থানীয় চার্জ বৃদ্ধির কারণে দেশের বাজারে এলপিজির দাম বেড়েছে।
প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে প্রতি কেজি এলপিজির দাম ছিল ১১৩ টাকা। নভেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭১ টাকা ৬৮ পয়সায়। অর্থাৎ কয়েক মাসের ব্যবধানে দাম বেড়েছে প্রায় ৫২ শতাংশ।
অন্যদিকে একই সময়ে পাকিস্তানে এলপিজির দাম বেড়েছে প্রায় ৩৪ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ১২ শতাংশ, ভারতে ৭ শতাংশ এবং নেপালে প্রায় ৬ শতাংশ। দেশগুলোর প্রকাশিত দাম ও মুদ্রা বিনিময় হার বিবেচনায় এই হিসাব করা হয়েছে।
নভেম্বরের প্রকাশিত দর অনুযায়ী, প্রতি কেজি এলপিজির দাম বাংলাদেশে ১৭১ টাকা ৬৮ পয়সা। একই সময়ে পাকিস্তানে এর দাম প্রায় ১৩২ টাকা, শ্রীলঙ্কায় ১৩০ টাকা এবং নেপালে ১১৯ টাকা।
অর্থাৎ এসব দেশের তুলনায় বাংলাদেশে এলপিজির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। তবে পাকিস্তানের ক্ষেত্রে একটি বিষয় বিবেচনায় রাখা জরুরি। দেশটির সরকারি নির্ধারিত দরের সঙ্গে খোলাবাজারের দামের বড় পার্থক্য রয়েছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তানের খোলাবাজারে এলপিজির দাম সরকারি দরের প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে।
ভারতের গৃহস্থালি এলপিজির দাম বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রতি কেজি প্রায় ৮৭ টাকা। তবে এই দরের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি তুলনা করা ঠিক হবে না। কারণ, ভারত সরকার বাসাবাড়ির গ্রাহকদের এলপিজিতে ভর্তুকি দেয়। অন্যদিকে বাণিজ্যিক গ্রাহকদের বাজারদরেই গ্যাস কিনতে হয়। দিল্লিতে বাণিজ্যিক এলপিজির দাম প্রতি কেজি প্রায় ১৯৪ টাকা।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ এ বিষয়ে বলেন, ভারতের গৃহস্থালি ও বাণিজ্যিক এলপিজির দরের পার্থক্য বিবেচনা না করে তুলনা করলে প্রকৃত চিত্র বোঝা কঠিন।
বিইআরসি চেয়ারম্যানের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ তুলনামূলক ছোট ক্রেতা হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজি কেনার ক্ষেত্রে বড় আমদানিকারক দেশগুলোর মতো সুবিধা পায় না।
ভারত একবারে একটি জাহাজে প্রায় এক লাখ টন এলপিজি আমদানি করতে পারে। বিপরীতে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত এর চেয়ে অনেক কম পরিমাণে এলপিজি কেনে। বড় ক্রেতারা বেশি পরিমাণে পণ্য কেনায় সরবরাহকারীদের কাছ থেকে দর-কষাকষিতে সুবিধা পেয়ে থাকে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আরও কয়েকটি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভরতা, দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তির সীমাবদ্ধতা এবং বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে গ্যাস স্থানান্তরের বাড়তি খরচ।
দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে সাধারণত সরবরাহের পরিমাণ ও সময়সূচি সম্পর্কে তুলনামূলক নিশ্চয়তা পাওয়া যায়। কিন্তু স্পট মার্কেট থেকে পণ্য কিনলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর আগে বাংলাদেশ এলপিজির বড় অংশ আমদানি করত উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধের কারণে সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটে।
এ পরিস্থিতিতে আমদানিকারকদের বিকল্প উৎস হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকতে হয়েছে। বিইআরসির দেশভিত্তিক আমদানি তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট এলপিজি আমদানিতে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ছিল ২৭ দশমিক ৪ শতাংশ। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে হয়েছে ৮৫ শতাংশ।
একই সময়ে ওমান থেকে এলপিজি আমদানির অংশ ৪১ শতাংশ থেকে কমে শূন্যে নেমে এসেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলপিজি আনতে পরিবহন সময় ও ব্যয় দুটিই বেশি হচ্ছে। জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের মেক্সিকো উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে এলপিজিবাহী জাহাজ বাংলাদেশে পৌঁছাতে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ দিন লাগে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসতে সময় লাগত প্রায় দুই সপ্তাহ।
ওমেরা পেট্রোলিয়ামের পরিচালক এবং এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাবেক সভাপতি আজম জে চৌধুরী জানান, সংঘাতের আগে প্রতি টন এলপিজি পরিবহনে ব্যয় হতো প্রায় ৮২ ডলার। বর্তমান পরিস্থিতিতে তা বেড়ে সর্বোচ্চ ২৫০ ডলারে পৌঁছেছে।
বাংলাদেশের আমদানির উৎস পরিবর্তনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও এলপিজির দাম বেড়েছে। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রোপেন রপ্তানি দৈনিক রেকর্ড ২২ লাখ ব্যারেলে পৌঁছায়। একই মাসে এশিয়ার বাজারগুলো যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৩ কোটি ৮০ লাখ ব্যারেল প্রোপেন এবং ১ কোটি ৪ লাখ ব্যারেল বিউটেন আমদানি করে।
সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন দেশের ক্রেতাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ায় দামেও চাপ তৈরি হয়েছে।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের হিসাবে, অক্টোবরে উত্তর এশিয়ার বাজারে প্রতি টন প্রোপেনের দাম ছিল ৯৭৭ ডলার এবং বিউটেনের দাম ১ হাজার ৫৭ ডলার।
বাংলাদেশে এলপিজির দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিইআরসি ৩৫ শতাংশ প্রোপেন ও ৬৫ শতাংশ বিউটেনের মিশ্রণ ধরে হিসাব করে। এই অনুপাত অনুযায়ী উত্তর এশিয়ার বাজারদর বিবেচনায় প্রতি টন মিশ্র এলপিজির গড় দাম দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ২৯ ডলার।
অন্যদিকে সৌদি আরামকোর কন্ট্রাক্ট প্রাইস বা সিপি অনুযায়ী একই মিশ্রণের গড় দাম প্রায় ৭৫৯ ডলার। অর্থাৎ উত্তর এশিয়ার বাজারদর এই বেঞ্চমার্কের তুলনায় প্রায় ৩৬ শতাংশ বেশি।
তবে আমদানির উৎস ও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত ক্রয়মূল্য এক নাও হতে পারে। পণ্যের দাম ছাড়াও পরিবহন, বিমা, চালানের পরিমাণ এবং সরবরাহকারীকে দেওয়া অতিরিক্ত প্রিমিয়াম আমদানি ব্যয়ে প্রভাব ফেলে।
আন্তর্জাতিক বাজারের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ চার্জ বৃদ্ধিও এলপিজির খুচরা দামে প্রভাব ফেলেছে। বিইআরসির নভেম্বরের মূল্য সমন্বয়ে সংরক্ষণ ও বোতলজাতকরণ চার্জ প্রতি কেজিতে ১৬ টাকা ৭৪ পয়সা থেকে বেড়ে ২৩ টাকা ৪৮ পয়সা হয়েছে। অর্থাৎ এই চার্জ বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ।
এ ছাড়া পরিবেশকদের চার্জ ৪ টাকা ১৭ পয়সা থেকে বেড়ে ৭ টাকা ৮ পয়সা এবং খুচরা বিক্রেতাদের চার্জ ৩ টাকা ৭৫ পয়সা থেকে বেড়ে ৫ টাকা ৮৩ পয়সা হয়েছে।
১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের ক্ষেত্রে সংরক্ষণ ও বোতলজাতকরণ চার্জ ২০১ টাকা থেকে বেড়ে ২৮২ টাকা হয়েছে। পরিবেশকদের চার্জ ৫০ টাকা থেকে ৮৫ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতাদের চার্জ ৪৫ টাকা থেকে ৭০ টাকা হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে কমিশন বৃদ্ধি ও বিতরণব্যবস্থায় পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। এ দাবিতে সারা দেশে এলপিজি বিক্রি বন্ধ রেখে দুই দিনের ধর্মঘটের ঘোষণাও এসেছিল।
বাংলাদেশে এলপিজি পরিচালনার লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে প্রায় ৩৩টি। তবে বিইআরসির কারিগরি কমিটির উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মাত্র ১৬টি প্রতিষ্ঠান ১৭ লাখ ৪০ হাজার টন এলপিজি আমদানি করেছে।
এর মধ্যে সাতটি প্রতিষ্ঠানের হাতে ছিল মোট আমদানির প্রায় ৮৬ শতাংশ। ফলে বাজারে অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ওপর আমদানির বড় অংশ নির্ভরশীল।
দেশের লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত বার্ষিক বোতলজাতকরণ সক্ষমতা ৬৩ লাখ ৮০ হাজার টন। অথচ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ ছিল এই সক্ষমতার মাত্র ২৭ শতাংশের মতো। অর্থাৎ অবকাঠামোগত সক্ষমতার বড় অংশ অব্যবহৃত রয়েছে।
বেসরকারি অপারেটরদের ওপর নির্ভরতা কমাতে এবং সংকটের সময় বিকল্প সরবরাহ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) নিজস্ব উদ্যোগে এলপিজি আমদানির পরিকল্পনা নিয়েছিল।
তবে দরপত্রের মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য প্রস্তাব না পাওয়ায় সংস্থাটি এখন বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজছে বলে জানিয়েছেন বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ।
রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সংরক্ষণাগার ব্যবহার এবং বিপণন অংশীদার খুঁজে বের করার বিষয়ে আলোচনা করছে।
সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকট, দীর্ঘ পরিবহনপথ, আমদানির সীমাবদ্ধতা, স্থানীয় চার্জ বৃদ্ধি এবং বাজারের কাঠামোগত সমস্যার সম্মিলিত প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের এলপিজির দামে। এসব সমস্যা সমাধান না হলে ভোক্তাদের জন্য সাশ্রয়ী দামে এলপিজি পাওয়া কঠিন হয়ে থাকতে পারে।
সোহাগ/
