এনআইডির নাম, বয়স বা ঠিকানায় ভুল, ঘরে বসে সংশোধন করুন
নিজস্ব প্রতিবেদক: জাতীয় পরিচয়পত্রে নিজের নামের বানান ভুল থাকলে বা নামের কোনো অংশ বাদ পড়লে সংশোধনের আবেদন করা যায়। এ ক্ষেত্রে সংশোধিত নামের পক্ষে গ্রহণযোগ্য প্রমাণপত্র জমা দিতে হবে।
নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী, আবেদনকারীর শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসি বা সমমান হলে সংশ্লিষ্ট সনদ নাম সংশোধনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়। পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী জন্মনিবন্ধন সনদ, পাসপোর্ট, নাগরিকত্ব সনদ, চাকরির প্রমাণপত্র, বিবাহিত হলে নিকাহনামা এবং বাবা-মা বা স্বামী-স্ত্রীর এনআইডির কপিও চাওয়া হতে পারে।
কেউ ডাকনাম বা অন্য নামে এনআইডি তৈরি করে থাকলে এবং প্রকৃত নাম সংশোধন করতে চাইলে অতিরিক্ত প্রমাণপত্র প্রয়োজন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী এফিডেভিট, জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি এবং মূল কাগজপত্রসহ শুনানিতে উপস্থিত হওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
জন্মতারিখ বা বয়সের ভুল সংশোধন করবেন কীভাবে?
এনআইডিতে জন্মতারিখ ভুল থাকলে তা সংশোধনের জন্য সঠিক জন্মতারিখের পক্ষে গ্রহণযোগ্য দলিল জমা দিতে হবে।
যাঁদের এসএসসি বা সমমানের শিক্ষাগত যোগ্যতা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষার সনদ গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়। আর যাঁদের এসএসসি বা সমমানের সনদ নেই, তাঁদের ক্ষেত্রে জন্মনিবন্ধন, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, চাকরির সার্ভিস বুক, এমপিও বা অন্যান্য গ্রহণযোগ্য দলিল চাওয়া হতে পারে।
জন্মতারিখে বড় ধরনের পরিবর্তন চাইলে নির্বাচন কমিশন অতিরিক্ত যাচাই করতে পারে। প্রয়োজন হলে মূল সনদ প্রদর্শন, ব্যক্তিগত শুনানি কিংবা তদন্তের ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে।
এখানে মনে রাখতে হবে, শুধু নিজের পছন্দ অনুযায়ী বয়স পরিবর্তনের সুযোগ নেই। প্রকৃত জন্মতারিখের পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ থাকতে হবে।
এনআইডির ঠিকানা ভুল হলে কী করবেন?
জাতীয় পরিচয়পত্রে বাড়ি বা হোল্ডিং নম্বর, গ্রাম, রাস্তা কিংবা ডাকঘরের নাম ভুল থাকলে সংশোধনের আবেদন করা যায়। এ ক্ষেত্রে সঠিক ঠিকানার প্রমাণ হিসেবে বাড়ির দলিল, গ্যাস, বিদ্যুৎ বা পানির বিল, বাড়িভাড়ার চুক্তিপত্র কিংবা বাড়িভাড়ার রসিদ জমা দেওয়া যেতে পারে।
ঠিকানা পরিবর্তন এবং ঠিকানার বানান বা নম্বর সংশোধন এক বিষয় নয়।
-
একই ভোটার এলাকার মধ্যে ঠিকানার ভুল: অনলাইনে সাধারণ সংশোধনের আবেদন করে প্রমাণপত্র জমা দিতে হবে।
-
এক এলাকা থেকে অন্য ভোটার এলাকায় স্থানান্তর: নতুন এলাকার উপজেলা বা থানা নির্বাচন অফিসে ভোটার এলাকা স্থানান্তরের জন্য ফরম-১৩ অনুযায়ী আবেদন করতে হবে।
অর্থাৎ শুধু বসবাসের ঠিকানা পরিবর্তন হয়েছে বলে এনআইডির তথ্য সংশোধন এবং ভোটার এলাকা পরিবর্তনের প্রক্রিয়াকে এক মনে করা যাবে না।
অনলাইনে এনআইডি সংশোধনের আবেদন করবেন যেভাবে
এনআইডির নাম, জন্মতারিখ বা অন্যান্য তথ্য সংশোধনের জন্য নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত অনলাইন পোর্টাল ব্যবহার করা যায়। আবেদন করার পদ্ধতি হলো:
প্রথম ধাপ: জাতীয় পরিচয়পত্র সেবার ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন।
দ্বিতীয় ধাপ: আগে অ্যাকাউন্ট তৈরি না করা থাকলে নিবন্ধন করুন। এ জন্য এনআইডি নম্বর, জন্মতারিখ এবং প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে হবে।
তৃতীয় ধাপ: মোবাইল ফোন বা ই-মেইলে পাওয়া অ্যাক্টিভেশন কোড দিয়ে নিবন্ধন সম্পন্ন করুন।
চতুর্থ ধাপ: এনআইডি ওয়ালেট অ্যাপের মাধ্যমে মুখমণ্ডল যাচাই করে নিজের অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করুন।
পঞ্চম ধাপ: প্রোফাইলে থাকা যে তথ্যটি ভুল, সেটি সংশোধনের অপশন থেকে পরিবর্তন করুন।
ষষ্ঠ ধাপ: সংশোধনের পক্ষে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র স্ক্যান করে আপলোড করুন।
সপ্তম ধাপ: নির্ধারিত সংশোধন ফি পরিশোধ করে আবেদন জমা দিন।
আবেদন জমা দেওয়ার পর অনলাইন অ্যাকাউন্ট থেকে আবেদনের অবস্থা দেখা যাবে। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট উপজেলা, থানা বা জেলা নির্বাচন অফিসে যোগাযোগ করতে হবে।
এনআইডি সংশোধনে কোন কাগজপত্র লাগবে?
ভুলের ধরন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আলাদা হতে পারে। সাধারণভাবে যেসব দলিল প্রয়োজন হতে পারে, সেগুলো হলো:
| সংশোধনের ধরন | সম্ভাব্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র |
|---|---|
| নিজের নাম | এসএসসি সনদ, জন্মনিবন্ধন, পাসপোর্ট |
| বাবা-মায়ের নাম | শিক্ষাগত সনদ, তাঁদের এনআইডি, জন্মনিবন্ধন |
| জন্মতারিখ | এসএসসি সনদ, জন্মনিবন্ধন, পাসপোর্ট |
| ঠিকানা | বাড়ির দলিল, ইউটিলিটি বিল, ভাড়ার চুক্তিপত্র |
| স্বামীর নাম সংযোজন | কাবিননামা ও স্বামীর এনআইডি |
| স্বামীর নাম বাদ দেওয়া | তালাকনামা |
| রক্তের গ্রুপ | রক্তের গ্রুপ নির্ণয়ের মেডিকেল রিপোর্ট |
এগুলো সম্ভাব্য দলিলের তালিকা। আবেদনকারীর পরিস্থিতি ও সংশোধনের ধরন অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন অতিরিক্ত কাগজপত্র চাইতে পারে।
এনআইডি সংশোধনে কত টাকা ফি দিতে হয়?
জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনের জন্য নির্ধারিত ফি দিতে হয়। তবে আবেদনের ধরন, সংশোধনের প্রকৃতি এবং আগে সংশোধন করা হয়েছে কি না, তার ওপর ফি নির্ভর করতে পারে।
তাই নির্দিষ্ট পরিমাণ ফি ধরে না নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অনলাইন ফি ক্যালকুলেটর থেকে নিজের আবেদনের ফি জেনে নেওয়া ভালো।
ফি জানার জন্য নির্বাচন কমিশনের এনআইডি সেবার ওয়েবসাইটে গিয়ে ‘ফি হিসাব করুন’ অপশন ব্যবহার করতে হবে। সেখানে এনআইডি নম্বর ও আবেদনের ধরন নির্বাচন করে ফি দেখা যাবে।
এনআইডির তথ্য সংশোধনে কত দিন সময় লাগে?
সংশোধনের সময় নির্ভর করে ভুলের ধরন, জমা দেওয়া কাগজপত্র এবং যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তার ওপর। সাধারণ বানান সংশোধন ও জন্মতারিখের বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রক্রিয়া এক রকম নয়।
কোনো আবেদনে অতিরিক্ত কাগজপত্র, তদন্ত বা ব্যক্তিগত শুনানির প্রয়োজন হলে বেশি সময় লাগতে পারে। তাই আবেদন জমা দেওয়ার পর অনলাইন অ্যাকাউন্টে নিয়মিত আবেদনের অবস্থা দেখতে হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট নির্বাচন অফিসে যোগাযোগ করতে হবে।
আবেদন করার আগে যে বিষয়গুলো মনে রাখবেন
এনআইডি সংশোধনের আবেদন করার সময় কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।
১. ভুল তথ্য সংশোধনের জন্য সঠিক ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণপত্র জমা দিন।
২. শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসি বা সমমান হলে সংশ্লিষ্ট সনদ প্রস্তুত রাখুন।
৩. নাম ও জন্মতারিখের ক্ষেত্রে বিভিন্ন কাগজে ভিন্ন তথ্য থাকলে আগে সঠিক তথ্যের প্রমাণ নিশ্চিত করুন।
৪. অস্পষ্ট বা অসম্পূর্ণ কাগজপত্র জমা দেবেন না।
৫. আবেদন করার আগে সব তথ্য ভালোভাবে যাচাই করুন।
৬. আবেদন জমা দেওয়ার পর রসিদ ও আবেদন নম্বর সংরক্ষণ করুন।
৭. দালাল বা অননুমোদিত ব্যক্তির মাধ্যমে সংশোধনের চেষ্টা না করে সরাসরি নির্বাচন কমিশনের সেবা ব্যবহার করুন।
এনআইডি সংশোধনের জন্য কোথায় যোগাযোগ করবেন?
অনলাইনে আবেদন করতে সমস্যা হলে অথবা অতিরিক্ত যাচাইয়ের প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট উপজেলা, থানা বা জেলা নির্বাচন অফিসে যোগাযোগ করা যায়।
জাতীয় পরিচয়পত্র সংক্রান্ত তথ্যের জন্য নির্বাচন কমিশনের হেল্পলাইন ১০৫ নম্বরেও যোগাযোগ করা যাবে। নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত যোগাযোগের সময় রোববার থেকে বৃহস্পতিবার, সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা।
অনলাইনে আবেদন: https://services.nidw.gov.bd/
ফি হিসাব: https://services.nidw.gov.bd/nid-pub/fees
হেল্পলাইন: ১০৫
জাতীয় পরিচয়পত্রে নাম, জন্মতারিখ বা ঠিকানায় ভুল থাকলে তা সংশোধনের জন্য নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত পদ্ধতিতে আবেদন করতে হবে। তবে প্রতিটি সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র আলাদা। বিশেষ করে জন্মতারিখ ও নিজের নাম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে যথাযথ দলিল না থাকলে আবেদন অনুমোদনে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
তাই এনআইডি সংশোধনের আগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করুন, অনলাইনে সঠিক তথ্য দিয়ে আবেদন করুন এবং আবেদনের অগ্রগতি নিয়মিত যাচাই করুন। এতে অপ্রয়োজনীয় ভোগান্তি কমবে এবং সঠিক তথ্যের জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ হবে।
সোহাগ/
