জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬: উল্টে গেল গ্রেডভিত্তিক বেতনের হিসাব
নিজস্ব প্রতিবেদক: জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ কার্যকর হওয়ার পর সরকারি কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণে নতুন করে অসঙ্গতির বিষয় সামনে এসেছে। একই দপ্তরের কয়েকজন কর্মচারীর সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসের বেতন বিল তুলনা করে দেখা গেছে, পুরোনো স্কেলে উচ্চ গ্রেডে থাকা একজন কর্মচারী নতুন স্কেলে নিম্ন গ্রেডের সহকর্মীর চেয়ে কম মূল বেতন পাচ্ছেন। এতে নতুন বেতন নির্ধারণের পদ্ধতি নিয়ে কর্মচারীদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
একটি দপ্তরের বেতন বিলের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের বেতন স্কেলে গ্রেড-১৪-এর একজন হিসাবরক্ষকের মূল বেতন ছিল গ্রেড-১৫-এর একজন মোটরচালকের চেয়ে ১০ টাকা বেশি। কিন্তু ২০২৬ সালের নতুন স্কেলে হিসাবটি উল্টে গেছে। এখন গ্রেড-১৫-এর ওই মোটরচালক গ্রেড-১৪-এর হিসাবরক্ষকের চেয়ে ২৯৫ টাকা বেশি মূল বেতন পাচ্ছেন।
নতুন বেতন স্কেলে কার কত টাকা বেড়েছে?
একই দপ্তরের তিনজন কর্মচারীর সেপ্টেম্বর ২০২৬ ও অক্টোবর ২০২৬ মাসের বেতন বিলের তথ্য তুলনা করে এই চিত্র পাওয়া গেছে। কর্মচারীদের পদ, গ্রেড এবং বেতন বৃদ্ধির হিসাব নিচে তুলে ধরা হলো।
| কর্মচারীর নাম ও পদ | গ্রেড | পুরোনো মূল বেতন | নতুন মূল বেতন | বৃদ্ধি |
|---|---|---|---|---|
| সালমা বেগম, সাঁটমুদ্রাক্ষরিক-কাম-কম্পিউটার অপারেটর | ১৩ | ১৬,২৮০ টাকা | ২৩,৮৫০ টাকা | ৭,৫৭০ টাকা |
| ফারহানা ইয়াসমিন, হিসাবরক্ষক | ১৪ | ১৮,৪০০ টাকা | ২৬,১১০ টাকা | ৭,৭১০ টাকা |
| আব্দুল করিম, মোটরচালক | ১৫ | ১৮,৩৯০ টাকা | ২৬,৪০৫ টাকা | ৮,০১৫ টাকা |
তথ্য অনুযায়ী, গ্রেড-১৩-এর কর্মচারীর মূল বেতন বেড়েছে ৭ হাজার ৫৭০ টাকা বা ৪৬ দশমিক ৫ শতাংশ। গ্রেড-১৪-এর কর্মচারীর বেড়েছে ৭ হাজার ৭১০ টাকা বা ৪১ দশমিক ৯ শতাংশ। অন্যদিকে গ্রেড-১৫-এর কর্মচারীর মূল বেতন বেড়েছে ৮ হাজার ১৫ টাকা বা ৪৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
উচ্চ গ্রেডের কর্মচারীর চেয়ে নিম্ন গ্রেডে বেতন বেশি কেন?
বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়টি হলো গ্রেড-১৪ ও গ্রেড-১৫-এর দুই কর্মচারীর মূল বেতনের পার্থক্য।
পুরোনো বেতন স্কেলে হিসাবরক্ষক ফারহানা ইয়াসমিনের মূল বেতন ছিল ১৮ হাজার ৪০০ টাকা। অন্যদিকে মোটরচালক আব্দুল করিমের মূল বেতন ছিল ১৮ হাজার ৩৯০ টাকা। অর্থাৎ পুরোনো স্কেলে হিসাবরক্ষক ১০ টাকা বেশি পেতেন।
কিন্তু নতুন বেতন স্কেলে হিসাবরক্ষকের মূল বেতন হয়েছে ২৬ হাজার ১১০ টাকা। আর মোটরচালকের মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ২৬ হাজার ৪০৫ টাকা।
ফলে নতুন স্কেলে নিম্ন গ্রেডের মোটরচালক উচ্চ গ্রেডের হিসাবরক্ষকের চেয়ে ২৯৫ টাকা বেশি মূল বেতন পাচ্ছেন।
অবশ্য পাশাপাশি গ্রেডের বেতনসীমা একে অপরের সঙ্গে মিলে যাওয়ায় জ্যেষ্ঠতা ও বেতনধাপের ভিত্তিতে নিম্ন গ্রেডের কোনো কর্মচারীর বেতন উচ্চ গ্রেডের কর্মচারীর চেয়ে বেশি হওয়া অসম্ভব নয়। তবে এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, পুরোনো স্কেলে এগিয়ে থাকা কর্মচারী নতুন স্কেলে পিছিয়ে পড়েছেন।
বেতন বৃদ্ধির হারেও দেখা গেছে পার্থক্য
তিন কর্মচারীর বেতন বৃদ্ধির হার বিশ্লেষণ করলেও পার্থক্য চোখে পড়ে। গ্রেড-১৪-এর কর্মচারীর তুলনায় গ্রেড-১৫-এর কর্মচারীর বেতন বৃদ্ধির হার বেশি।
গ্রেড-১৪-এর কর্মচারীর মূল বেতন বেড়েছে ৪১ দশমিক ৯ শতাংশ। বিপরীতে গ্রেড-১৫-এর কর্মচারীর বেড়েছে ৪৩ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীর বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ৭ শতাংশ পয়েন্ট বেশি।
টাকার অঙ্কেও গ্রেড-১৫-এর কর্মচারী গ্রেড-১৪-এর কর্মচারীর তুলনায় ৩০৫ টাকা বেশি মূল বেতন বৃদ্ধি পেয়েছেন।
এতে বোঝা যায়, নতুন স্কেলে বেতন বৃদ্ধির পরিমাণ শুধু আগের মূল বেতনের ওপর নির্ভর করেনি। কর্মচারীর গ্রেড, বেতনধাপ এবং নতুন স্কেলে বেতন নির্ধারণের পদ্ধতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
মূল বেতন বাড়লেও হাতে পাওয়া টাকা কি একই হারে বেড়েছে?
নতুন বেতন স্কেলে মূল বেতন বাড়লেও মোট বেতন একই অনুপাতে বাড়েনি বলে বেতন বিলের তথ্যে দেখা গেছে।
এর একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৩ সাল থেকে পাওয়া বিশেষ সুবিধা নতুন স্কেলে আর আলাদাভাবে দেওয়া হচ্ছে না। পাশাপাশি কয়েকজন কর্মচারীর বাড়িভাড়া ভাতাও কমেছে।
উদাহরণ হিসেবে মোটরচালক আব্দুল করিমের বেতনের হিসাব তুলে ধরা হয়েছে। পুরোনো স্কেলে সেপ্টেম্বর মাসে তার মোট বেতন ছিল ৩৪ হাজার ৩৬৩ টাকা। নতুন স্কেলে অক্টোবর মাসে তা বেড়ে হয়েছে ৩৯ হাজার ১৩৫ টাকা ৫০ পয়সা।
অর্থাৎ মূল বেতন ৮ হাজার ১৫ টাকা বাড়লেও মোট বেতন বেড়েছে ৪ হাজার ৭৭২ টাকা ৫০ পয়সা।
এ ক্ষেত্রে বাড়িভাড়া ভাতা ১০ হাজার ১১৪ টাকা ৫০ পয়সা থেকে কমে ৯ হাজার ৬৩০ টাকা ৫০ পয়সা হয়েছে। ফলে মূল বেতন বৃদ্ধির পুরো প্রভাব মোট বেতনে পড়েনি।
বেতন বিলের এই তুলনা থেকে নতুন বেতন স্কেলে গ্রেডভিত্তিক বেতন নির্ধারণের বিষয়টি পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
বিশেষ করে পাশাপাশি গ্রেডের কর্মচারীদের মূল বেতন নির্ধারণ, পুরোনো বেতনের সঙ্গে নতুন বেতনের সামঞ্জস্য এবং ভাতার পরিবর্তনের বিষয়গুলো স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
তবে একটি দপ্তরের তিনজন কর্মচারীর বেতন বিলের তথ্য দিয়ে পুরো সরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে একই ধরনের অসঙ্গতি রয়েছে বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। বিষয়টি নিশ্চিত করতে বিভিন্ন দপ্তরের কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি বিধান পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
নতুন বেতন স্কেলে কার বেতন কীভাবে নির্ধারিত হয়েছে, কোন গ্রেডে কতটা বৃদ্ধি হয়েছে এবং ভাতার পরিবর্তনে প্রকৃত আয় কতটা বদলেছে, এসব বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা পেলে কর্মচারীদের মধ্যে তৈরি হওয়া প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সহজ হবে।
সোহাগ/
