নিজের জমি অন্যের নামে রেকর্ড হলে কী করবেন
নিজস্ব প্রতিবেদক: নিজের কেনা কিংবা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমি খতিয়ানে অন্যের নামে রেকর্ড হয়েছে? এমন পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত না হয়ে প্রথমে জমির মালিকানার কাগজপত্র এবং রেকর্ডের ভুল যাচাই করা জরুরি। কারণ, জমির খতিয়ানে অন্যের নাম থাকলেই সব ক্ষেত্রে তিনি জমির চূড়ান্ত মালিক হয়ে যান না। আবার শুধু দলিল বা ভূমি উন্নয়ন করের রসিদ থাকলেই রেকর্ডের বিরোধ স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিটে যায় না।
বাংলাদেশে জমির রেকর্ড সংশোধনের জন্য একাধিক আইনি ব্যবস্থা রয়েছে। তবে কীভাবে সংশোধন করতে হবে, তা নির্ভর করে ভুলটি করণিক, জরিপসংক্রান্ত, নামজারির, নাকি জালিয়াতির মাধ্যমে হয়েছে তার ওপর। খতিয়ান চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত হয়েছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
কী কারণে অন্যের নামে জমি রেকর্ড হতে পারে?
বিভিন্ন কারণে প্রকৃত মালিকের পরিবর্তে অন্য ব্যক্তির নামে জমি রেকর্ড হতে পারে। যেমন:
-
জরিপের সময় মালিকের নাম বা জমির তথ্য ভুলভাবে লেখা।
-
জমি কেনাবেচার পর নতুন মালিকের নামে নামজারি না করা।
-
উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমিতে কোনো ওয়ারিশের নাম বাদ পড়ে যাওয়া।
-
জমির দাগ নম্বর, হিস্যা বা পরিমাণ নির্ধারণে ভুল।
-
জাল দলিল বা মিথ্যা তথ্য দিয়ে রেকর্ডে অন্যের নাম অন্তর্ভুক্ত করা।
-
জরিপের আপত্তি বা আপিলের সিদ্ধান্ত যথাযথভাবে রেকর্ডে প্রতিফলিত না হওয়া।
তবে ভুলের ধরন না জেনে সরাসরি রেকর্ড সংশোধনের আবেদন করা ঠিক নয়। প্রথমে জমির আগের ও বর্তমান খতিয়ান, দলিল এবং সংশ্লিষ্ট জরিপের নথি মিলিয়ে দেখতে হবে।
জমির রেকর্ড সংশোধনে যেসব কাগজপত্র লাগতে পারে
নিজের মালিকানার দাবি প্রতিষ্ঠা করতে প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করতে হবে। জমির ধরন ও বিরোধের ওপর ভিত্তি করে সাধারণত নিচের কাগজপত্র কাজে আসতে পারে।
১. নিবন্ধিত দলিল: জমি কেনা হলে ক্রয়দলিল এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আগের মালিকের মালিকানার দলিল।
২. পুরোনো ও বর্তমান খতিয়ান: সিএস, এসএ, আরএস, বিএস বা সংশ্লিষ্ট জরিপের খতিয়ান।
৩. জমির পরিচিতি: মৌজার নাম, জেএল নম্বর, দাগ নম্বর, খতিয়ান নম্বর ও জমির পরিমাণ।
৪. নামজারির কাগজপত্র: নামজারি হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট মামলার আদেশ, খতিয়ান ও ডিসিআর।
৫. উত্তরাধিকারসংক্রান্ত নথি: ওয়ারিশ সনদ, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বণ্টননামা এবং পূর্ববর্তী মালিকের দলিল।
৬. ভূমি উন্নয়ন করের রসিদ: নিয়মিত কর পরিশোধের প্রমাণ।
৭. মামলার নথি: জমি নিয়ে আগে কোনো মামলা হয়ে থাকলে আদালতের রায়, আদেশ ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র।
মনে রাখতে হবে, সব ক্ষেত্রে সব নথি প্রয়োজন হয় না। শুধু ভূমি উন্নয়ন করের রসিদ বা জমির দখল থাকলেই মালিকানা চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয় না। মালিকানা কীভাবে অর্জিত হয়েছে, তার ওপর প্রয়োজনীয় প্রমাণ নির্ভর করবে।
কী ধরনের ভুল হলে কোথায় আবেদন করবেন?
১. নামের বানান, হিস্যা বা হিসাবের ভুল হলে
খতিয়ানে নামের বানান, জমির পরিমাণ, হিস্যা বা গাণিতিক হিসাবে ভুল থাকলে সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্তৃপক্ষের কাছে সংশোধনের আবেদন করা যেতে পারে। চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত রেকর্ডের করণিক ভুল সংশোধনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০ এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালার বিধান প্রযোজ্য হতে পারে। এ ধরনের ভুল সংশোধনের ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের রয়েছে কি না, তা যাচাই করতে হবে।
২. জরিপের সময় অন্যের নামে জমি রেকর্ড হলে
জরিপ চলাকালে খসড়া খতিয়ানে নিজের জমি অন্যের নামে দেখা গেলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট জরিপ বা সেটেলমেন্ট অফিসে আপত্তি জানানো যায়। আপত্তির সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট হলে বিধি অনুযায়ী আপিলের সুযোগ থাকতে পারে।
আর খতিয়ান চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত হওয়ার পর সর্বশেষ সংশোধিত রেকর্ড নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে বিষয়টি ভিন্ন। রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ১৪৫ক ধারায় প্রতিষ্ঠিত ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনালে মামলা করার প্রয়োজন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে মামলার ধরন, সংশ্লিষ্ট এলাকার ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার এবং আইনে নির্ধারিত সময়সীমা যাচাই করা জরুরি।
৩. জালিয়াতির মাধ্যমে অন্যের নামে রেকর্ড হলে
জাল দলিল, মিথ্যা তথ্য বা প্রতারণার মাধ্যমে জমি অন্যের নামে রেকর্ড করা হলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট নথির সত্যতা যাচাই করতে হবে। চূড়ান্ত প্রকাশনার আগে জরিপের নথিতে জালিয়াতি ধরা পড়লে সেটেলমেন্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ থাকতে পারে। চূড়ান্ত রেকর্ডে প্রতারণামূলক লিখন বা জালিয়াতির বিষয় থাকলে প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট রাজস্ব কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা যেতে পারে।
তবে জাল দলিলের কারণে প্রকৃত মালিকানা নিয়ে বিরোধ তৈরি হলে শুধু রেকর্ড সংশোধনের আবেদন যথেষ্ট নাও হতে পারে। বিরোধের ধরন অনুযায়ী দেওয়ানি আদালত বা উপযুক্ত আইনি প্রক্রিয়ায় যেতে হতে পারে। এ ক্ষেত্রে ভূমি আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া ভালো।
৪. নামজারি অন্যের নামে হয়ে গেলে
নিজের নামে নিবন্ধিত দলিল থাকা সত্ত্বেও অন্য ব্যক্তির নামে নামজারি হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট নামজারি মামলার নথি ও আদেশের সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহ করুন। কোন দলিল বা তথ্যের ভিত্তিতে নামজারি করা হয়েছে, তা যাচাই করতে হবে।
নামজারি আদেশে ভুল থাকলে প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী আপিল, রিভিউ বা সংশোধনের সুযোগ থাকতে পারে। তবে নামজারি মূলত রাজস্ব আদায় ও ভূমি ব্যবস্থাপনার প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। এটি নিজে থেকে চূড়ান্ত মালিকানা নির্ধারণ করে না। তাই প্রকৃত মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী আদালতের আশ্রয় নিতে হতে পারে।
আবেদন করার আগে যে পাঁচটি বিষয় যাচাই করবেন
জমির পরিচিতি মিলিয়ে নিন: মৌজা, দাগ নম্বর, খতিয়ান নম্বর ও জমির পরিমাণ ঠিক আছে কি না দেখুন।
মালিকানার ধারাবাহিকতা যাচাই করুন: জমি কেনা হলে আগের মালিক থেকে আপনার নামে মালিকানা হস্তান্তরের দলিলগুলো মিলিয়ে নিন। উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া হলে ওয়ারিশদের অধিকার ও বণ্টনের তথ্য যাচাই করুন।
খতিয়ানের অবস্থা জানুন: রেকর্ডটি খসড়া পর্যায়ে রয়েছে, নাকি চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত হয়েছে, তা নিশ্চিত করুন।
বিরোধের ধরন বুঝুন: সাধারণ করণিক ভুল, নামজারির সমস্যা এবং প্রকৃত মালিকানা নিয়ে বিরোধ এক বিষয় নয়। সমস্যার ধরন অনুযায়ী সঠিক কর্তৃপক্ষ নির্বাচন করতে হবে।
আইনি সময়সীমা খেয়াল রাখুন: আপত্তি, আপিল, রিভিউ বা ট্রাইব্যুনালে মামলা করার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকতে পারে। তাই ভুল শনাক্ত হওয়ার পর দেরি না করে পদক্ষেপ নিন।
অনলাইনে জমির রেকর্ড যাচাই করবেন যেভাবে
জমির খতিয়ান ও ভূমিসংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ের জন্য সরকারি ওয়েবসাইট ব্যবহার করা যায়।
-
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট: https://land.gov.bd/
-
ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর: https://dlrs.gov.bd/
-
বাংলাদেশের প্রচলিত আইন: https://bdlaws.minlaw.gov.bd/
প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট উপজেলা ভূমি অফিস, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি শাখা অথবা ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট অফিসে যোগাযোগ করা যেতে পারে।
নিজের জমি অন্যের নামে রেকর্ড হলে সেটি সংশোধনের সুযোগ থাকতে পারে। তবে কোন পথে এগোতে হবে, তা নির্ভর করে জমির মালিকানার প্রমাণ, রেকর্ডের ধরন এবং ভুলের প্রকৃতির ওপর। তাই প্রথমে দলিল ও খতিয়ান যাচাই করুন, সংশ্লিষ্ট নথির কপি সংগ্রহ করুন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ভূমি অফিস, জরিপ কর্তৃপক্ষ বা উপযুক্ত আদালতের মাধ্যমে প্রতিকার চান। জটিল মালিকানা বিরোধে অভিজ্ঞ ভূমি আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
সোহাগ/
