১২ কেজি এলপিজির দাম ২,০৬০ টাকা, বিক্রি হচ্ছে ২,৫০০ টাকায়
নিজস্ব প্রতিবেদক: রান্নার গ্যাসের দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। কিন্তু নির্ধারিত দামে এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে পারছেন না সাধারণ ভোক্তারা। ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের সরকারি নির্ধারিত দাম ২ হাজার ৬০ টাকা হলেও ঢাকার বিভিন্ন বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৩৫০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়। অর্থাৎ প্রতিটি সিলিন্ডার কিনতে ক্রেতাকে বাড়তি গুনতে হচ্ছে ২৯০ থেকে ৪৪০ টাকা।
ঢাকার বাইরের বাজারেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে নির্ধারিত দামের চেয়ে ৪০ থেকে ২৪০ টাকা বেশি দামে। এতে রান্নার গ্যাসের বাড়তি খরচ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ পরিবারগুলো।
গত ২ নভেম্বর বিইআরসি ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার ৬০ টাকা নির্ধারণ করে। তবে নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পরও বাজারে নির্ধারিত মূল্য নিশ্চিত করা যায়নি। আমদানিকারক, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন বাড়ানোর পরও কেন বেশি দামে গ্যাস বিক্রি হচ্ছে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে।
ঢাকায় ১২ কেজির সিলিন্ডার ২,৩৫০ থেকে ২,৫০০ টাকা
ঢাকার বিভিন্ন এলাকার খুচরা দোকান ও ডিলার পয়েন্ট ঘুরে দেখা গেছে, ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৩৫০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়।
মিরপুরের শেওড়াপাড়া, ৬০ ফিট এলাকা এবং উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরের দোকানগুলোতে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি টাকা চাওয়া হচ্ছে। কিছু দোকানে পরিচিত ক্রেতা ছাড়া অন্যদের কাছে গ্যাস বিক্রি করতে অনীহাও দেখা গেছে। কোথাও ক্রেতাকে প্রথমে গ্যাস নেই বলে জানানো হলেও পরে যোগাযোগ করলে বেশি দামে সিলিন্ডার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
উত্তরার এক খুচরা বিক্রেতা ১২ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি করছেন বলে জানা গেছে। তাঁর দাবি, তিনি নিজেই সিলিন্ডারটি ২ হাজার ২৫০ টাকায় কিনেছেন।
অন্যদিকে মিরপুরের ৬০ ফিট এলাকার এক বিক্রেতা পরে যোগাযোগ করা হলে ২ হাজার ৫০০ টাকা দাম চান। এসব ঘটনায় বাজারে সরবরাহ, বিক্রয়মূল্য এবং তদারকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ঢাকার বাইরেও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে গ্যাস
শুধু রাজধানী নয়, দেশের বিভিন্ন এলাকার বাজারেও বিইআরসি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে।
বিভিন্ন এলাকার বাজার থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী:
-
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড: ২ হাজার ১০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা।
-
রাজশাহীর বাগমারা: ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকা।
-
পটুয়াখালীর বাউফল: ২ হাজার ১০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা।
-
টাঙ্গাইলের সখীপুর: ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকা।
-
সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা: ২ হাজার ১০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা।
এসব এলাকায় সরবরাহের ঘাটতি ও পরিবহন খরচকে বাড়তি দামের কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
টাঙ্গাইলের সখীপুরের এক ডিলারের দাবি, কোম্পানি চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে না। এ মাসে এখনো তিনি কোম্পানির কাছ থেকে গ্যাস পাননি। ফলে স্থানীয় বাজারে সাময়িক সংকট তৈরি হয়েছে।
আমদানি কমেছে, সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ
দেশে এক কোটির বেশি গ্রাহক এলপিজি ব্যবহার করেন। এর প্রায় ৮০ শতাংশ ব্যবহৃত হয় গৃহস্থালি রান্নার কাজে। বাসাবাড়িতে পাইপলাইনের গ্যাস-সংযোগ সীমিত হওয়ায় ২০১৫ সাল থেকে এলপিজির চাহিদা বাড়তে থাকে। বর্তমানে দেশে বছরে এলপিজির চাহিদা ১৮ লাখ টনের বেশি।
এই খাতের প্রায় ৯৯ শতাংশ সরবরাহ আসে বেসরকারি আমদানিকারকদের মাধ্যমে। বাকি অংশ দেশে উৎপাদন করে সরকারি প্রতিষ্ঠান।
এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশ (লোয়াব) ও বিইআরসি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্টে দেশে এলপিজি আমদানি হয়েছিল ১ লাখ ৫৮ হাজার মেট্রিক টন। সেপ্টেম্বরে আমদানি হয় ১ লাখ ৫৬ হাজার টন। অক্টোবরে তা কমে ১ লাখ ৪২ হাজার টনের নিচে নেমে আসে। তবে ৪ নভেম্বরের মধ্যে আরও ৪০ হাজার ২০০ টন এলপিজি দেশে এসেছে।
আমদানিকারকদের কেউ কেউ বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির সরবরাহ সংকুচিত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ায় এখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেশি দামে গ্যাস আমদানি করতে হচ্ছে। জাহাজভাড়া ও পরিবহন খরচও বেড়েছে। পাশাপাশি দেশে দীর্ঘ সময়ের জন্য এলপিজি মজুত রাখার পর্যাপ্ত অবকাঠামো নেই বলে তাঁদের দাবি।
তবে কয়েকটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য, তারা সক্ষমতা অনুযায়ী সরবরাহ বাড়িয়েছে। তাদের দাবি, বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চলছে। নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করলে সংশ্লিষ্ট বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
আমদানিকারক, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের মধ্যে মতবিরোধ
নতুন দাম নির্ধারণের সময় ১২ কেজির সিলিন্ডারের ক্ষেত্রে আমদানিকারকদের মজুত ও বোতলজাত করার খরচ বাবদ কমিশন প্রায় ৮২ টাকা বাড়ানো হয়েছে। পরিবেশকদের কমিশন ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮৫ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন ৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ টাকা করা হয়েছে।
তবে পরিবেশক ও খুচরা ব্যবসায়ীদের দাবি, বাড়ানো কমিশনে তাঁদের প্রকৃত খরচ উঠছে না। বিশেষ করে ঢাকার মতো বড় শহরে পরিবহন ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বেশি হওয়ায় নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার বিক্রি করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বাজারে সরবরাহ এখনো পর্যাপ্ত নয়। কোম্পানির প্ল্যান্টে গিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে ট্রাককে। এতে পরিবহন ও পরিচালন খরচ বাড়ছে। কোনো কোনো কোম্পানির বিরুদ্ধেও বেশি দামে গ্যাস বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে আমদানিকারকদের একটি অংশ বলছে, পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও কিছু ব্যবসায়ী বেশি দামে বিক্রি করছেন। ফলে বাজারে প্রকৃত সংকট কতটা এবং বাড়তি দামের পেছনে কারা দায়ী, তা নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে।
বাড়তি দামে বিক্রি ঠেকাতে কাজ করছে বিইআরসি
বাজারে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রির অভিযোগ পাওয়ার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন।
বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে কমিশন কাজ করছে। শিল্প খাতে এলপিজির ব্যবহার কতটা বেড়েছে, তা যাচাই করা হচ্ছে। কমিশনের সদস্যরা মাঠপর্যায়ে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যারা সরাসরি আমদানি না করে অন্যদের কাছ থেকে এলপিজি কিনে বাজারে বিক্রি করছেন, তাঁদের একটি অংশ বেশি দামে বিক্রি করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অভিযান চালাচ্ছে ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর
নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রির অভিযোগের বিষয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরও নজরদারি করছে।
অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, বিভিন্ন জায়গা থেকে বাড়তি দামে সিলিন্ডার বিক্রির তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। অভিযোগের ভিত্তিতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে জরিমানাও করা হয়েছে। অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
তবে বাজারে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ বন্ধ করতে নিয়মিত তদারকি, সরবরাহ পরিস্থিতি যাচাই এবং নির্ধারিত মূল্য কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সাধারণ ভোক্তার ওপর বাড়তি খরচের চাপ
১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার দেশের অধিকাংশ পরিবারের রান্নার কাজে ব্যবহৃত হয়। ফলে নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েক শ টাকা বেশি দিয়ে গ্যাস কিনতে হলে মাসিক পারিবারিক ব্যয়ও বেড়ে যায়।
বিশেষ করে যেসব পরিবারে পাইপলাইনের গ্যাস নেই, তাদের জন্য এলপিজি এখন প্রয়োজনীয় জ্বালানি। বাজারে সরবরাহের অনিশ্চয়তা ও বাড়তি দাম একসঙ্গে ভোক্তাদের দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে।
এদিকে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে এলপিজির দাম বেশি বলে আগেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে বিভিন্ন দেশে সরকারি ভর্তুকি, বাজারব্যবস্থা ও আমদানির ধরন আলাদা হওয়ায় শুধু খুচরা দাম তুলনা করে পুরো পরিস্থিতি বোঝা যায় না।
বিইআরসি ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার ৬০ টাকা নির্ধারণ করলেও রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে তা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। কোথাও ক্রেতাকে ২৯০ টাকা, কোথাও ৪৪০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি দিতে হচ্ছে।
আমদানিকারকরা আন্তর্জাতিক বাজার ও সরবরাহ পরিস্থিতির কথা বলছেন। পরিবেশকরা কমিশন ও পরিবহন ব্যয়ের কথা তুলে ধরছেন। অন্যদিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর বাড়তি দামে বিক্রি ঠেকাতে কাজ করছে।
তবে সাধারণ ভোক্তার কাছে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো, নির্ধারিত দামে নিয়মিত এলপিজি পাওয়া। সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা এবং বাজারে কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা না গেলে রান্নার গ্যাসের বাড়তি দামের চাপ আরও কিছুদিন ভোক্তাদের বহন করতে হতে পারে।
সোহাগ/
