মশা কেন পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রাণীদের একটি
নিজস্ব প্রতিবেদক: রাতে ঘুমাতে যাওয়ার পর কানের কাছে মশার ভনভন শব্দ শুনলে বিরক্তি আসাটাই স্বাভাবিক। ছোট্ট এই পোকাটি ধরতে বা মারতে কত চেষ্টাই না করতে হয়! কিন্তু আকারে ক্ষুদ্র হলেও মশার বিপদ শুধু চুলকানি বা অস্বস্তিতে সীমাবদ্ধ নয়। নানা রোগের জীবাণু ছড়িয়ে দিয়ে মানুষের মৃত্যুর কারণও হতে পারে এই পতঙ্গ।
হাঙর, কুমির কিংবা বিষধর সাপের মতো ভয়ংকর প্রাণীর কথা মনে এলেও মানুষের মৃত্যুর হিসাব বিবেচনায় মশা বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রাণীদের অন্যতম। কারণ, মশা সরাসরি আক্রমণ করে মানুষকে মারে না; বরং কিছু প্রজাতি রোগজীবাণু বহন করে এক মানুষ থেকে অন্য মানুষের শরীরে সংক্রমণ ছড়িয়ে দিতে পারে।
বিশ্বজুড়ে মশাবাহিত রোগে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে ম্যালেরিয়া অন্যতম প্রধান কারণ। ডেঙ্গু ও অন্যান্য মশাবাহিত রোগও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তাই মশাকে শুধু বিরক্তিকর পোকা হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত বিপদ বোঝা কঠিন।
সব মশা কি মানুষকে কামড়ায়?
না, সব মশা মানুষের রক্ত খায় না। সাধারণত স্ত্রী মশা ডিম তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন ও পুষ্টি পেতে রক্ত পান করে। অন্যদিকে পুরুষ মশা মূলত ফুলের মধু ও উদ্ভিদের অন্যান্য উৎস থেকে খাবার সংগ্রহ করে।
স্ত্রী মশাও ফুলের মধু খেতে পারে। তবে ডিম উৎপাদনের জন্য অনেক প্রজাতির স্ত্রী মশার রক্তের প্রয়োজন হয়। রক্ত খাওয়ার সময় মশা তার সরু, সূচের মতো মুখের অংশ ত্বকের মধ্যে প্রবেশ করায়। এই মুখের অংশকে বলা হয় প্রোবোসিস।
মশার কামড়ের পর ত্বকে ছোট ফোলা দাগ, লালচে ভাব কিংবা চুলকানি দেখা দিতে পারে। এর অন্যতম কারণ মশার লালা। রক্ত পান করার সময় মশা লালা ত্বকে প্রবেশ করায়। এর কিছু উপাদানের প্রতিক্রিয়ায় শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় হয়ে ওঠে, ফলে চুলকানি ও ফোলাভাব দেখা দেয়।
তবে মশা কামড়ালেই যে রোগ হবে, তা নয়। অধিকাংশ কামড়ের ক্ষেত্রে মশাবাহিত কোনো সংক্রমণ ঘটে না। কিন্তু সংক্রমণ ঘটলে কিছু রোগ গুরুতর হয়ে উঠতে পারে।
মশা কীভাবে রোগ ছড়ায়?
মশা মূলত রোগজীবাণুর বাহক হিসেবে কাজ করে। কোনো সংক্রমিত মানুষকে কামড়ানোর সময় নির্দিষ্ট রোগের জীবাণু মশার শরীরে প্রবেশ করতে পারে। জীবাণুটি মশার শরীরে বেঁচে থাকা ও বিকশিত হওয়ার উপযোগী হলে পরে সেই মশা অন্য কাউকে কামড়ানোর মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়াতে পারে।
মশাবাহিত রোগের মধ্যে রয়েছে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, চিকুনগুনিয়া ও কিছু অঞ্চলে ওয়েস্ট নাইল ভাইরাসজনিত রোগ। তবে সব মশা সব রোগ ছড়ায় না। নির্দিষ্ট প্রজাতির মশা নির্দিষ্ট রোগের জীবাণু বহন করতে পারে।
ম্যালেরিয়া হয় প্লাজমোডিয়াম নামের পরজীবীর কারণে। সংক্রমিত স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশা কামড়ালে এই পরজীবী মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির জ্বর, কাঁপুনি, মাথাব্যথা ও অন্যান্য উপসর্গ দেখা দিতে পারে। চিকিৎসা না হলে কিছু ক্ষেত্রে রোগটি প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার মতো ভাইরাসজনিত রোগ ছড়ানোর সঙ্গে এডিস মশার নির্দিষ্ট প্রজাতির সম্পর্ক রয়েছে। এ কারণেই মশা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি কোন এলাকায় কোন রোগ ছড়াচ্ছে, সে বিষয়ে সচেতন থাকাও গুরুত্বপূর্ণ।
আরেকটি বিষয় মনে রাখা দরকার, মশার কামড়ে এইচআইভি সংক্রমণ ছড়ায় না। মশা একজনের রক্ত খাওয়ার পর অন্যজনকে কামড়ালেও এইচআইভি এভাবে সংক্রমিত হয় না।
কেন কাউকে বেশি কামড়ায় মশা?
একই ঘরে কয়েকজন বসে থাকলেও দেখা যায়, কারও শরীরে মশার কামড় বেশি, আবার কারও শরীরে তুলনামূলক কম। এর পেছনে মানুষের শরীর থেকে বের হওয়া বিভিন্ন সংকেতের ভূমিকা রয়েছে।
মানুষ নিঃশ্বাস ছাড়ার সময় কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত করে। স্ত্রী মশা এই গ্যাস শনাক্ত করে সম্ভাব্য খাবারের উৎসের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। এ ছাড়া শরীরের তাপমাত্রা, ত্বক থেকে নির্গত গন্ধ এবং ঘামের সঙ্গে বের হওয়া বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদানও মশাকে আকৃষ্ট করতে পারে।
কিছু গবেষণায় মানুষের শরীরের গন্ধ ও ত্বকের জীবাণুর সঙ্গে মশার আকর্ষণের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে একজনকে অন্যজনের তুলনায় বেশি কামড়ানোর সব কারণ এখনো পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায়নি।
তাই কাউকে বেশি মশা কামড়ালে তিনি অপরিষ্কার—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। শরীরের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য ও পরিবেশগত কারণেও মশার আকর্ষণে পার্থক্য হতে পারে।
মশার কামড় এড়াতে কী করবেন?
মশা নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপগুলোর একটি হলো বংশবিস্তারের উপযুক্ত জায়গা কমিয়ে আনা। বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি মশার প্রজননের সুযোগ তৈরি করতে পারে। তাই নিয়মিত কয়েকটি বিষয়ে নজর রাখা জরুরি।
১. জমে থাকা পানি সরান: ফুলের টবের নিচের পাত্র, পুরোনো টায়ার, খোলা বালতি, ফেলে রাখা কৌটা ও অন্যান্য পাত্রে পানি জমতে দেবেন না। পানির পাত্র নিয়মিত পরিষ্কার করুন।
২. পানির পাত্র ঢেকে রাখুন: বাড়িতে পানি সংরক্ষণের পাত্র এমনভাবে ঢেকে রাখুন, যাতে মশা সেখানে ডিম পাড়তে না পারে।
৩. মশারি ব্যবহার করুন: ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করলে মশার কামড় এড়াতে সাহায্য পাওয়া যায়। বিশেষ করে শিশু, অসুস্থ ব্যক্তি ও দিনের বেলায় ঘুমানো মানুষের ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ।
৪. উপযুক্ত মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করুন: ডিইইটি, পিকারিডিন, আইআর৩৫৩৫ বা অনুমোদিত পিএমডি-যুক্ত প্রতিরোধক ব্যবহার করা যেতে পারে। পণ্যের লেবেলে দেওয়া নির্দেশনা মেনে চলুন। শিশুদের ক্ষেত্রে বয়স অনুযায়ী উপযোগিতা যাচাই করুন।
৫. দরজা-জানালায় জালি ব্যবহার করুন: সম্ভব হলে দরজা-জানালায় মশা প্রবেশ ঠেকানোর জালি লাগান। ঘরের ভেতরে মশা দেখা গেলে নিরাপদ পদ্ধতিতে তা নিয়ন্ত্রণ করুন।
৬. আশপাশ পরিষ্কার রাখুন: শুধু নিজের বাড়ি পরিষ্কার রাখলেই সব সময় যথেষ্ট হয় না। আশপাশের জমে থাকা পানি ও মশার প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণে পরিবার, প্রতিবেশী এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
শুধু আলো দিয়ে পোকা মারার যন্ত্র বা শব্দের মাধ্যমে মশা দূরে রাখার দাবি করা পণ্যের ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়। এসব পদ্ধতির কার্যকারিতা একরকম নয়, আর কিছু যন্ত্র উপকারী পতঙ্গও মেরে ফেলতে পারে।
মশা কামড়ানোর পর চুলকালে কী করবেন?
মশার কামড়ের জায়গায় চুলকানি সাধারণত নিজে থেকেই কমে আসে। জায়গাটি পরিষ্কার রাখা এবং ঠান্ডা সেঁক দিলে অস্বস্তি কমতে পারে। অতিরিক্ত চুলকানো এড়িয়ে চলুন, কারণ এতে ত্বক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
চুলকানি বা ফোলাভাব বেশি হলে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের পরামর্শ নিয়ে উপযুক্ত চিকিৎসা বেছে নেওয়া ভালো। আর মশার কামড়ের পর জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, শরীরব্যথা বা অন্য কোনো অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক দুর্বলতা বা অচেতনতার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।
মনে রাখতে হবে, শুধু মশার কামড়ের দাগ দেখে ডেঙ্গু বা ম্যালেরিয়া শনাক্ত করা যায় না। উপসর্গ ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষার ভিত্তিতে চিকিৎসক রোগ নির্ণয় করেন।
ছোট প্রাণী, কিন্তু বড় জনস্বাস্থ্যঝুঁকি
মশার আকার ছোট বলে একে অবহেলা করার সুযোগ নেই। কিছু প্রজাতি এমন রোগের জীবাণু ছড়াতে পারে, যা মানুষের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। তবে আতঙ্কিত হওয়ার বদলে প্রয়োজন সঠিক তথ্য জানা, মশার বংশবিস্তার কমানো, ব্যক্তিগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং অসুস্থ হলে সময়মতো চিকিৎসা নেওয়া।
পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাণঘাতী প্রাণী হিসেবে মশাকে উল্লেখ করার পেছনে মূল কারণ তার আক্রমণাত্মক শক্তি নয়; বরং রোগ ছড়ানোর ক্ষমতা। আর এই ঝুঁকি কমাতে ব্যক্তিগত সতর্কতার পাশাপাশি নিয়মিত ও সমন্বিত মশা নিয়ন্ত্রণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সিদ্দিকা/
