১৯ বছরেও ব্যালন ডি’অর নেই, কী হলো ব্রাজিলের
নিজস্ব প্রতিবেদক: একসময় বিশ্ব ফুটবলে ব্রাজিল মানেই ছিল অসাধারণ প্রতিভা, চোখধাঁধানো ড্রিবলিং আর মাঠজুড়ে সৃজনশীলতার প্রদর্শনী। রোনালদো নাজারিও, রিভালদো, রোনালদিনিও ও কাকার মতো তারকারা শুধু ফুটবলপ্রেমীদের মুগ্ধই করেননি, নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছেন ব্যালন ডি’অরের সোনালি ট্রফিও। কিন্তু সেই সোনালি সময় যেন ক্রমেই অতীত হয়ে যাচ্ছে। এখন প্রশ্ন উঠছে, ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের পর রাফিনিয়া কিংবা নতুন প্রজন্মের কোনো ব্রাজিলিয়ান কি আবার বিশ্বসেরার স্বীকৃতি ফিরিয়ে আনতে পারবেন?
ব্যালন ডি’অরের মঞ্চে ব্রাজিলের বর্তমান চিত্র
ব্যালন ডি’অরের মঞ্চে ব্রাজিলের একসময়কার দাপটের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করলে পার্থক্যটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রোনালদো নাজারিওর মতো কিংবদন্তি যখন পুরস্কার তুলে দেওয়ার জন্য মঞ্চে ওঠেন, তখন ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের গৌরবময় অতীতই যেন বেশি করে সামনে আসে।
সর্বশেষ আলোচিত ব্যালন ডি’অর আসরে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, গ্যাব্রিয়েল মাগালাইস ও মার্কিনিওসের মতো ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার মনোনয়ন পেলেও চূড়ান্ত ফলাফলে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি। রিয়াল মাদ্রিদের তারকা ভিনিসিয়ুস ভোটে ১৭তম স্থানে ছিলেন। অথচ কিছুদিন আগেও তাঁকে এই পুরস্কার জয়ের অন্যতম দাবিদার হিসেবে বিবেচনা করা হতো।
ছেলেদের ব্যালন ডি’অরে ব্রাজিলের সর্বশেষ বড় সাফল্যও অনেক পুরোনো। ২০০৭ সালে কাকা সর্বশেষ ব্রাজিলিয়ান হিসেবে এই পুরস্কার জিতেছিলেন। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও আর কোনো ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারের হাতে ওঠেনি সোনালি বল।
কাকার পর নেইমার ও ভিনিসিয়ুসের লড়াই
কাকার পর ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় তারকাদের মধ্যে নেইমার ছিলেন অন্যতম। অসাধারণ স্কিল, ড্রিবলিং ও আক্রমণাত্মক ফুটবলের জন্য তাঁকে ঘিরে বড় প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। ২০১৫ ও ২০১৭ সালে ব্যালন ডি’অরের ভোটে তৃতীয় স্থান অর্জন করেন তিনি।
অনেক ফুটবলপ্রেমীর বিশ্বাস ছিল, ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারলে নেইমারও একদিন ব্যালন ডি’অর জিততে পারেন। কিন্তু প্রতিভা থাকা আর দীর্ঘ সময় ধরে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পারফর্ম করা এক বিষয় নয়। মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর আধিপত্যের সময়ে নেইমার সেই শীর্ষস্থান দখল করতে পারেননি।
এরপর আলোচনায় আসেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। ২০২৪ সালে ব্যালন ডি’অরের ভোটে দ্বিতীয় হয়েছিলেন রিয়াল মাদ্রিদের এই ফরোয়ার্ড। তাঁর গতি, ড্রিবলিং ও গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে প্রভাব রাখার ক্ষমতা ব্রাজিলিয়ান সমর্থকদের নতুন করে স্বপ্ন দেখিয়েছিল।
তবে নেইমার ও ভিনিসিয়ুসের সাফল্য সত্ত্বেও বড় ছবিটা বদলায়নি। ২০০৭ সালের পর থেকে ব্রাজিলের কোনো খেলোয়াড় ব্যালন ডি’অর জিততে পারেননি। এই দীর্ঘ বিরতি দেশটির ফুটবলার তৈরির ব্যবস্থা ও প্রতিভা বিকাশের পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
রাফিনিয়া কি হতে পারেন ব্রাজিলের পরবর্তী ভরসা?
বর্তমান প্রজন্মে রাফিনিয়া ব্রাজিলের অন্যতম আলোচিত আক্রমণভাগের খেলোয়াড়। ক্লাব ফুটবলে তাঁর পারফরম্যান্স, আক্রমণে অবদান এবং দলকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা তাঁকে বড় তারকাদের আলোচনায় রেখেছে। একই সঙ্গে এস্তেভাওর মতো তরুণ প্রতিভাদের ঘিরেও ভবিষ্যতের আশা দেখছেন সমর্থকেরা।
তবে শুধু ভালো মৌসুম কাটানোই ব্যালন ডি’অর জয়ের জন্য যথেষ্ট নয়। ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের পাশাপাশি বড় শিরোপা, গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে প্রভাব, ধারাবাহিকতা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তাই রাফিনিয়া কিংবা এস্তেভাওকে ঘিরে প্রত্যাশা থাকলেও এখনই তাঁদের ব্যালন ডি’অরজয়ী হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। বরং তাঁদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিজেদের প্রমাণ করা।
কেন পিছিয়ে পড়ছে ব্রাজিলের ফুটবল?
ব্রাজিলের ফুটবলে বিশ্বমানের প্রতিভার ঘাটতি নিয়ে বিশ্লেষকদের উদ্বেগের পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। এর মধ্যে বয়সভিত্তিক ফুটবলার তৈরির কাঠামো, প্রশিক্ষণপদ্ধতি এবং আধুনিক ফুটবলের পরিবর্তিত চাহিদা বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে।
ক্রীড়া বিপণন ও ফুটবল উন্নয়নবিষয়ক বিশেষজ্ঞ আলেকজান্দ্রে ভাসকনসেলোসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সৃষ্টিশীল মিডফিল্ডার, দক্ষ ফুলব্যাক ও কার্যকর সেন্টার ফরোয়ার্ড তৈরিতে ব্রাজিলের ঘাটতি দেশটির ফুটবলার উন্নয়নব্যবস্থার গভীর সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। তাঁর মতে, বয়সভিত্তিক পর্যায়ে প্রশিক্ষণ ও খেলোয়াড় তৈরির কাঠামো উন্নত করা জরুরি। তবে এর সুফল বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে দেখতে সময় লাগতে পারে।
অন্যদিকে ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের একাডেমির অধ্যাপক ও কোচ রজার মাচাদোর মতে, আন্তর্জাতিক ফুটবলে প্রতিযোগিতা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানি ও পর্তুগালের মতো দেশগুলো দক্ষ খেলোয়াড় তৈরিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। ফলে শুধু ঐতিহ্য বা স্বাভাবিক প্রতিভার ওপর নির্ভর করে বিশ্ব ফুটবলে এগিয়ে থাকা এখন আর সহজ নয়।
রাস্তার ফুটবল হারিয়ে যাওয়াও কি বড় কারণ?
ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের সৃষ্টিশীলতার কথা উঠলেই সামনে আসে রাস্তার ফুটবলের ঐতিহ্য। গলি, সমুদ্রসৈকত কিংবা খোলা মাঠে বল নিয়ে খেলতে খেলতেই একসময় অনেক প্রতিভাবান ফুটবলার নিজেদের দক্ষতা শাণিত করতেন। সেখানে ছিল স্বাধীনতা, কল্পনাশক্তি এবং প্রতিপক্ষকে নতুনভাবে সামলানোর সুযোগ।
ব্রাজিলের কিংবদন্তি স্ট্রাইকার রোমারিও মনে করেন, তরুণদের সহজাত সৃষ্টিশীলতা বিকাশে রাস্তার ফুটবলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তাঁর মতে, অতিরিক্ত নিয়মতান্ত্রিক প্রশিক্ষণ ও কৃত্রিম পরিবেশ তরুণদের স্বাভাবিক প্রতিভার বিকাশে বাধা তৈরি করতে পারে।
আধুনিক ফুটবলে গতি, শারীরিক সক্ষমতা, কৌশলগত শৃঙ্খলা ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার গুরুত্বও বেড়েছে। ফলে শুধু ব্যক্তিগত দক্ষতা দিয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে টিকে থাকা কঠিন। তবে সৃষ্টিশীলতা ও কৌশলগত প্রশিক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই হতে পারে ব্রাজিলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
মেসি-রোনালদোর যুগ কি ব্রাজিলের পথ কঠিন করেছে?
লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর দীর্ঘদিনের আধিপত্যও ব্যালন ডি’অরের প্রতিযোগিতাকে কঠিন করে তুলেছিল। এক দশকের বেশি সময় ধরে তাঁদের ধারাবাহিক পারফরম্যান্স অন্য অনেক তারকার পুরস্কার জয়ের সম্ভাবনা সীমিত করেছে।
তবে ব্রাজিলের দীর্ঘদিন ব্যালন ডি’অর না জেতার ব্যাখ্যা শুধু এই দুই মহাতারকার আধিপত্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিভা তৈরি, খেলোয়াড়দের ধারাবাহিকতা, ক্লাব পর্যায়ে সাফল্য এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় প্রভাব—সবকিছুই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
রোমারিওর বক্তব্যেও উঠে এসেছে, ব্রাজিলের ফুটবল কাঠামো আগের মতো নেই। একটি নির্দিষ্ট তারকার ওপর পুরো দেশের প্রত্যাশা চাপিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে একাধিক বিশ্বমানের খেলোয়াড় তৈরি করা প্রয়োজন। নেইমার ও ভিনিসিয়ুসকে ঘিরে যে বিপুল প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা এই সমস্যারই একটি উদাহরণ।
বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিলের সামনে বড় প্রশ্ন
বিশ্বকাপের ইতিহাসে পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। ইউরোপের বিভিন্ন ক্লাবেও নিয়মিত খেলছেন দেশটির অসংখ্য ফুটবলার। এত বড় প্রতিভার ভান্ডার থাকার পরও কেন ব্যালন ডি’অরের মতো ব্যক্তিগত পুরস্কারে ব্রাজিলের উপস্থিতি কমে গেছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
ব্যালন ডি’অরের ইতিহাসে ব্রাজিলের সর্বশেষ জয় কাকার হাত ধরে ২০০৭ সালে। এরপর নেইমার ও ভিনিসিয়ুসের মতো তারকারা শীর্ষ তিনে উঠলেও ট্রফি জিততে পারেননি। রাফিনিয়া ও এস্তেভাওদের সামনে তাই শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য অর্জনের চ্যালেঞ্জ নয়, বরং ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের হারানো মর্যাদা ফিরিয়ে আনার প্রত্যাশাও রয়েছে।
তবে সেই প্রত্যাবর্তন ঘটাতে হলে কেবল একজন সুপারস্টারের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। বয়সভিত্তিক ফুটবলের উন্নয়ন, সৃষ্টিশীলতার চর্চা এবং ধারাবাহিকভাবে বিশ্বমানের খেলোয়াড় তৈরি করার সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
ব্রাজিলের ফুটবল ঐতিহ্য এখনো সমৃদ্ধ। কিন্তু অতীতের গৌরব দিয়ে বর্তমানের প্রতিযোগিতা জেতা যায় না। রাফিনিয়া কিংবা নতুন প্রজন্মের কেউ ব্যালন ডি’অর জিতবেন কি না, তা সময়ই বলবে। তার আগে ব্রাজিলকে প্রমাণ করতে হবে, বিশ্ব ফুটবলের প্রতিভা তৈরির কারখানা হিসেবে তারা আবারও নিজেদের পুরোনো অবস্থানে ফিরতে পারে।
আয়শা/
