গর্ভপাতের পর কি মা হতে ছয় মাস অপেক্ষা করতেই হবে?
নিজস্ব প্রতিবেদক: গর্ভপাতের পর আবার সন্তান নেওয়ার চেষ্টা কখন শুরু করা উচিত—এ নিয়ে অনেক দম্পতির মনে প্রশ্ন থাকে। কেউ দ্রুত নতুন করে গর্ভধারণ করতে চান, আবার কারও শারীরিক সুস্থতা ফিরে পেতে এবং মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে আরও সময় প্রয়োজন হয়। এ পরিস্থিতিতে অনেককে ছয় মাস অপেক্ষা করার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে সবার ক্ষেত্রেই কি এত দিন অপেক্ষা করা জরুরি?
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, জটিলতাহীন প্রাথমিক গর্ভপাতের পর সবার জন্য ছয় মাস অপেক্ষা করা বাধ্যতামূলক—এমন প্রমাণ নেই। তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রত্যেক নারীকে দ্রুত গর্ভধারণের চেষ্টা করতে হবে। রক্তপাত ও অন্যান্য উপসর্গ কমেছে কি না, কোনো জটিলতা হয়েছে কি না এবং নারী শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুত কি না—এসব বিষয় বিবেচনা করা জরুরি।
গর্ভপাতের পর ছয় মাস অপেক্ষার পরামর্শ কেন দেওয়া হয়?
গর্ভপাতের পর পরবর্তী গর্ভধারণের আগে নির্দিষ্ট সময় বিরতি রাখার পরামর্শ বহু বছর ধরে প্রচলিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০০৭ সালের সুপারিশেও গর্ভপাতের পর অপেক্ষার কথা বলা হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, জটিলতাহীন প্রাথমিক গর্ভপাতের পর তুলনামূলক দ্রুত গর্ভধারণ করলেই যে গর্ভাবস্থায় জটিলতার ঝুঁকি বেড়ে যায়, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
২০২২ সালে PLOS Medicine সাময়িকীতে প্রকাশিত নরওয়েভিত্তিক একটি গবেষণায় গর্ভপাতের পর পরবর্তী গর্ভধারণের সময় এবং জন্মসংক্রান্ত বিভিন্ন ফলাফল বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষকেরা দেখেন, গর্ভপাতের তিন মাসের মধ্যে গর্ভধারণের সঙ্গে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিকূল ফলাফলের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
গবেষণাটির ফলাফল থেকে বোঝা যায়, প্রাথমিক গর্ভপাতের পর সবার জন্য অন্তত ছয় মাস অপেক্ষা করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে গবেষণাটি সব ধরনের গর্ভপাত, চিকিৎসাজনিত জটিলতা কিংবা পরবর্তী গর্ভধারণের প্রতিটি সম্ভাব্য ঝুঁকির উত্তর দেয় না।
গর্ভপাতের পর কখন আবার গর্ভধারণের চেষ্টা করা যায়?
সময় নির্ভর করে গর্ভপাতের ধরন, চিকিৎসা এবং সুস্থ হয়ে ওঠার ওপর।
জটিলতাহীন প্রাথমিক গর্ভপাতের পর: রক্তপাত ও অন্যান্য উপসর্গ কমে গেলে এবং শারীরিকভাবে সুস্থ বোধ করলে অনেক নারী আবার চেষ্টা করতে পারেন। তবে ব্যক্তিগত পরিস্থিতি অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
D&C বা অস্ত্রোপচারের পর: চিকিৎসক ফলোআপ পরীক্ষা বা অতিরিক্ত পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দিয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে গর্ভপাতের পর: শারীরিক পুনরুদ্ধারে বেশি সময় লাগতে পারে। কখন আবার গর্ভধারণের চেষ্টা করা উপযুক্ত হবে, তা চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত।
একটোপিক প্রেগন্যান্সির পর: গর্ভটি জরায়ুর বাইরে অবস্থান করলে চিকিৎসার ধরন অনুযায়ী অপেক্ষার সময় আলাদা হতে পারে। বিশেষ করে মেথোট্রেক্সেট ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করা হলে পরবর্তী গর্ভধারণের আগে নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষা করার নির্দেশনা থাকতে পারে।
মোলার প্রেগন্যান্সির পর: hCG হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিক হয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করে পর্যবেক্ষণ চালাতে হয়। কখন আবার চেষ্টা করা নিরাপদ, তা চিকিৎসক নির্ধারণ করবেন।
সংক্রমণ বা অতিরিক্ত রক্তপাত হলে: প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সম্পন্ন করে সুস্থতা নিশ্চিত করার পরই পরবর্তী গর্ভধারণের পরিকল্পনা করা উচিত।
অতএব, সব পরিস্থিতির জন্য একই সময়সীমা প্রযোজ্য নয়। বিশেষ করে জটিলতা বা বিশেষ চিকিৎসার ইতিহাস থাকলে চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুসরণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথম মাসিক না হওয়া পর্যন্ত কি অপেক্ষা করতে হবে?
গর্ভপাতের পর প্রথম মাসিক হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলে পরবর্তী গর্ভাবস্থার সময় হিসাব করা সহজ হতে পারে। এ কারণে অনেক সময় চিকিৎসকেরা মাসিক ফিরে আসার পর চেষ্টা করার পরামর্শ দেন। তবে জটিলতাহীন প্রাথমিক গর্ভপাতের পর প্রথম মাসিকের জন্য অপেক্ষা করাই সবার ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক—এমন নয়।
গর্ভপাতের পর মাসিক ফিরে আসতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। এ সময়ের মধ্যেই ডিম্বস্ফোটন হতে পারে, এমনকি প্রথম মাসিক হওয়ার আগেও। ফলে মাসিক না হলেও গর্ভধারণ সম্ভব।
এখনই সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা না থাকলে উপযুক্ত গর্ভনিরোধক ব্যবহার করা জরুরি। অন্যদিকে, গর্ভপাতের পর প্রেগন্যান্সি টেস্ট কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত পজিটিভ থাকতে পারে। এমন হলে বা আগের গর্ভাবস্থার হরমোনের প্রভাব আর নতুন গর্ভধারণের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে অসুবিধা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
আবার মা হওয়ার জন্য প্রস্তুত কি না বুঝবেন কীভাবে?
শুধু শারীরিকভাবে সুস্থ হওয়াই যথেষ্ট নয়; মানসিক প্রস্তুতিও গুরুত্বপূর্ণ। গর্ভপাতের অভিজ্ঞতার পর কেউ দ্রুত আবার চেষ্টা করতে চান, আবার কেউ নতুন করে গর্ভধারণ নিয়ে ভয় বা উদ্বেগ অনুভব করেন। দুটো অনুভূতিই স্বাভাবিক হতে পারে।
পরবর্তী গর্ভধারণের পরিকল্পনার আগে কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করুন:
-
রক্তপাত ও অন্যান্য উপসর্গ কমেছে কি না।
-
জ্বর, তীব্র পেটব্যথা বা দুর্গন্ধযুক্ত স্রাবের মতো সতর্কসংকেত আছে কি না।
-
চিকিৎসক কোনো ফলোআপ পরীক্ষা বা চিকিৎসা নির্ধারণ করেছেন কি না।
-
আপনি ও আপনার সঙ্গী দুজনেই নতুন করে চেষ্টা করার বিষয়ে স্বস্তি বোধ করছেন কি না।
-
মানসিক চাপ বা শোকের সময় পাশে থাকার মতো সহায়তা আছে কি না।
জ্বর, তীব্র বা বাড়তে থাকা ব্যথা, অতিরিক্ত রক্তপাত কিংবা দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
গর্ভপাতের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কী?
গর্ভপাতের পর আবার গর্ভধারণের চেষ্টা করার জন্য সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কোনো একক সময়সীমা নেই। জটিলতাহীন প্রাথমিক গর্ভপাতের পর ছয় মাস অপেক্ষা করতেই হবে—এমন প্রমাণ নেই। তবে একটোপিক বা মোলার প্রেগন্যান্সি, সংক্রমণ, অতিরিক্ত রক্তপাত কিংবা নির্দিষ্ট ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসার ক্ষেত্রে আলাদা নির্দেশনা প্রয়োজন হতে পারে।
তাই কেবল নির্দিষ্ট কয়েক মাস পার হওয়ার অপেক্ষা না করে নিজের শারীরিক অবস্থা, চিকিৎসকের পরামর্শ এবং মানসিক প্রস্তুতিকে গুরুত্ব দিন। আবার চেষ্টা করার আগে দুঃখ বা উদ্বেগ পুরোপুরি চলে যেতেই হবে, এমন নয়। নিজের জন্য উপযুক্ত সময় বেছে নেওয়া এবং প্রয়োজনমতো চিকিৎসা সহায়তা নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সিদ্দিকা/
