সকালে স্ট্রোকের ঝুঁকিতে কারা বেশি? যে ৫ লক্ষণ চিনবেন
নিজস্ব প্রতিবেদক: স্ট্রোক যেকোনো সময় হতে পারে। তবে ঘুম থেকে ওঠার পর সকালবেলায় শরীরে রক্তচাপ ও হৃদ্স্পন্দনের স্বাভাবিক ছন্দে পরিবর্তন আসে। বিশেষ করে যাদের আগে থেকেই উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা হৃদ্রোগ রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি বাড়তি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুম থেকে ওঠার পর রক্তচাপ দ্রুত বাড়তে পারে। দিনের শুরুর দিকে হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের মতো কিছু গুরুতর ঘটনার প্রবণতাও তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। তবে শুধু সকালেই স্ট্রোক হয়, এমন নয়। দিনের যেকোনো সময় এ জরুরি অবস্থা দেখা দিতে পারে।
সকালে স্ট্রোকের ঝুঁকি বেশি যাদের
কিছু শারীরিক অবস্থা ও অভ্যাস স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। বিশেষ করে নিচের ব্যক্তিদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
১. উচ্চ রক্তচাপের রোগী
উচ্চ রক্তচাপ স্ট্রোকের অন্যতম প্রধান ঝুঁকির কারণ। দীর্ঘদিন রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে মস্তিষ্কের রক্তনালির ক্ষতি হতে পারে। ঘুম থেকে ওঠার পর রক্তচাপের স্বাভাবিক বৃদ্ধি অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের জন্য বাড়তি উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
২. ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি
দীর্ঘদিন রক্তে শর্করা বেশি থাকলে রক্তনালির ক্ষতি হতে পারে। ডায়াবেটিসের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ ও কোলেস্টেরলের সমস্যা থাকলে স্ট্রোকের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
৩. হৃদ্রোগ ও অনিয়মিত হৃদ্স্পন্দন রয়েছে যাদের
বিশেষ করে অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন বা অনিয়মিত হৃদ্স্পন্দনের সমস্যা থাকলে হৃদ্যন্ত্রে রক্ত জমাট বাঁধতে পারে। সেই জমাট রক্ত মস্তিষ্কের রক্তনালিতে পৌঁছে রক্ত চলাচল বন্ধ করে দিতে পারে। এতে ইস্কেমিক স্ট্রোকের আশঙ্কা তৈরি হয়।
৪. রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল বেশি যাদের
রক্তে এলডিএল বা খারাপ কোলেস্টেরল বেশি থাকলে ধমনিতে চর্বি জমে রক্তনালি সরু হয়ে যেতে পারে। এর ফলে মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
৫. বয়স্ক ব্যক্তি ও ধূমপায়ীরা
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে। অন্যদিকে, ধূমপান রক্তনালির ক্ষতি করে এবং রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা বাড়াতে পারে। তাই বয়স্ক ব্যক্তি ও নিয়মিত ধূমপায়ীদেরও সতর্ক থাকা জরুরি।
এ ছাড়া ঘুমের মধ্যে বারবার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসার সমস্যা বা অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া থাকলেও হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্ক থাকতে পারে।
ঘুম থেকে ওঠার পর স্ট্রোকের ঝুঁকি কেন আলোচনায় আসে?
ঘুম ও জেগে ওঠার সময় শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে কিছু পরিবর্তন ঘটে। যেমন—
-
ঘুম থেকে ওঠার আগে ও পরে রক্তচাপ বাড়তে পারে।
-
হৃদ্স্পন্দন ও স্নায়ুতন্ত্রের কার্যক্রমে পরিবর্তন আসে।
-
কর্টিসলসহ কিছু হরমোনের মাত্রায় স্বাভাবিক ওঠানামা হয়।
-
রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়ায় দিনের বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তন ঘটতে পারে।
এসব পরিবর্তন একা স্ট্রোকের কারণ নয়। তবে আগে থেকেই উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা হৃদ্রোগের মতো সমস্যা থাকলে সামগ্রিক ঝুঁকি বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।
ঘুম থেকে উঠে যে ৫টি লক্ষণ অবহেলা করবেন না
স্ট্রোকের লক্ষণ সাধারণত হঠাৎ দেখা দেয়। ঘুম থেকে ওঠার পর নিচের কোনো লক্ষণ দেখা গেলে সেটিকে সাধারণ দুর্বলতা বা ঘুমের ঘোর ভেবে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়।
১. মুখ একদিকে বেঁকে যাওয়া
হাসতে বললে মুখের এক পাশ স্বাভাবিকভাবে না নড়া, ঠোঁট বা মুখের এক অংশ ঝুলে পড়া স্ট্রোকের সতর্কসংকেত হতে পারে।
২. শরীরের এক পাশের হাত-পা দুর্বল হওয়া
হঠাৎ শরীরের এক পাশের হাত বা পা অবশ হয়ে যাওয়া কিংবা শক্তি কমে যাওয়া স্ট্রোকের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। দুই হাত একসঙ্গে তুলতে বললে একটি হাত নিচে নেমে যেতে পারে।
৩. কথা জড়িয়ে যাওয়া বা বুঝতে সমস্যা হওয়া
হঠাৎ কথা অস্পষ্ট হয়ে যাওয়া, পরিচিত কথা বলতে না পারা কিংবা অন্যের কথা বুঝতে অসুবিধা হওয়া স্ট্রোকের লক্ষণ হতে পারে।
৪. হঠাৎ দৃষ্টিশক্তিতে সমস্যা
এক বা দুই চোখে ঝাপসা দেখা, দৃষ্টির একটি অংশ হারিয়ে ফেলা কিংবা হঠাৎ দেখতে সমস্যা হওয়াও স্ট্রোকের সতর্কসংকেত।
৫. মাথা ঘোরা ও ভারসাম্য হারানো
হঠাৎ হাঁটতে অসুবিধা, শরীরের ভারসাম্য রাখতে না পারা, সমন্বয়হীনতা কিংবা অজানা কারণে তীব্র মাথাব্যথা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে কী করবেন?
স্ট্রোকের ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারও মুখ বেঁকে গেলে, হাত-পা দুর্বল হয়ে পড়লে কিংবা কথা জড়িয়ে গেলে অপেক্ষা করবেন না।
১. দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়ার ব্যবস্থা করুন বা অ্যাম্বুলেন্স ডাকুন।
২. লক্ষণ প্রথম কখন দেখা দিয়েছে, সেই সময়টি মনে রাখুন বা লিখে রাখুন।
৩. লক্ষণ কয়েক মিনিট পর সেরে গেলেও চিকিৎসা নিন। এটি সাময়িক রক্তপ্রবাহের বাধা বা ট্রানজিয়েন্ট ইস্কেমিক অ্যাটাক (TIA) হতে পারে, যা ভবিষ্যতে বড় স্ট্রোকের সতর্কসংকেত।
৪. চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে থেকে ওষুধ দেবেন না।
স্ট্রোকের চিকিৎসা দ্রুত শুরু করা গেলে মস্তিষ্কের ক্ষতি কমানো এবং রোগীর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ানো সম্ভব। তাই ঘুম থেকে ওঠার পর হঠাৎ কোনো অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিলে সময় নষ্ট না করে জরুরি চিকিৎসা নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সিদ্দিকা/
