জীবনের বরকত কমে যাওয়ার পেছনে থাকতে পারে যে ৪ ভুল
নিজস্ব প্রতিবেদক: জীবনে অর্থ-সম্পদ থাকলেই যে শান্তি ও তৃপ্তি থাকবে, এমন নয়। অনেকের উপার্জন ভালো হলেও সংসারে অশান্তি, কাজে অস্থিরতা কিংবা মনে প্রশান্তির অভাব দেখা যায়। ইসলামের দৃষ্টিতে জীবনের বরকত শুধু সম্পদের পরিমাণ দিয়ে বিচার করা হয় না। বরং অল্প সম্পদে তৃপ্তি, সময়ের সঠিক ব্যবহার, পরিবারে শান্তি এবং ভালো কাজে সফলতাও বরকতের অংশ।
ইসলামি শিক্ষায় এমন কিছু কাজের কথা বলা হয়েছে, যেগুলো মানুষের জীবনের বরকত নষ্ট হওয়ার কারণ হতে পারে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ চারটি বিষয় হলো মিথ্যা ও প্রতারণা, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা, সুদ ও হারাম উপার্জন এবং দিনের প্রথম ভাগ অবহেলায় কাটানো।
১. মিথ্যা ও প্রতারণা করে লেনদেন করা
ব্যবসা-বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেনে সততা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। পণ্যের দোষ গোপন করা, মিথ্যা তথ্য দেওয়া কিংবা ক্রেতাকে ঠকিয়ে বেশি লাভ করার চেষ্টা সাময়িকভাবে লাভজনক মনে হতে পারে। কিন্তু ইসলামে এ ধরনের অসতসতাকে বরকত নষ্ট হওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ক্রেতা ও বিক্রেতা যদি সত্য কথা বলে এবং পণ্যের দোষ-ত্রুটি স্পষ্ট করে, তাহলে তাদের লেনদেনে বরকত দেওয়া হয়। আর যদি তারা মিথ্যা বলে এবং দোষ গোপন করে, তাহলে তাদের লেনদেনের বরকত মুছে ফেলা হয়। (সহিহ বুখারি: ২০৭৯)
তাই ব্যবসা কিংবা ব্যক্তিগত লেনদেন, সব ক্ষেত্রেই সত্যবাদিতা ও আমানতদারি বজায় রাখা জরুরি।
২. আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা
আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পারিবারিক বিরোধ, সম্পত্তি নিয়ে বিবাদ কিংবা ব্যক্তিগত অভিমানের কারণে অনেক সময় মানুষ আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। অথচ আত্মীয়তার বন্ধন বজায় রাখার প্রতি ইসলাম বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি চায় তার রিজিক প্রশস্ত হোক এবং তার আয়ুতে বরকত দেওয়া হোক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে। (সহিহ বুখারি: ৫৯৮৬)
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা রিজিকে বরকত লাভের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই মতবিরোধ থাকলেও সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন না করে সমঝোতার চেষ্টা করা উচিত।
৩. সুদ ও হারাম উপার্জনের সঙ্গে জড়িত থাকা
ইসলামে হালাল উপার্জনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সুদ, ঘুষ, প্রতারণা, জালিয়াতি কিংবা অন্যের অধিকার নষ্ট করে অর্থ উপার্জন করা নিষিদ্ধ। এসব পথে সম্পদ বাড়লেও তা প্রকৃত কল্যাণ ও মানসিক প্রশান্তির কারণ হয় না।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং সদকাকে বৃদ্ধি করেন।’ (সুরা আল-বাকারা: ২৭৬)
তাই উপার্জনের পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি আয়ের উৎস হালাল কি না, সেটিও বিবেচনা করা জরুরি। অন্যের হক নষ্ট করে অর্জিত সম্পদ থেকে বিরত থাকা এবং ভুল হলে তা সংশোধনের চেষ্টা করা একজন মুসলমানের দায়িত্ব।
৪. দিনের প্রথম ভাগ অলসতায় কাটানো
দিনের শুরুটা মানুষের কাজের গতি ও সময় ব্যবহারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অথচ অনেকেই ফজরের নামাজের পর আবার দীর্ঘ সময় ঘুমিয়ে কিংবা অপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যস্ত থেকে সকালের সময় নষ্ট করেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর উম্মতের জন্য দিনের প্রথম ভাগে বরকতের দোয়া করেছেন। হাদিসে এসেছে, তিনি বলেছেন, ‘হে আল্লাহ! আমার উম্মতের জন্য দিনের প্রথম ভাগে বরকত দান করুন।’ (সুনানে আবু দাউদ: ২৬০৬)
তাই ফজরের পরের সময় ইবাদত, কোরআন তিলাওয়াত, জ্ঞানার্জন, পড়াশোনা কিংবা জীবিকার কাজে ব্যয় করা যেতে পারে। দিনের শুরুতে সময়ের সদ্ব্যবহার করলে দৈনন্দিন কাজেও শৃঙ্খলা আসে।
জীবনে বরকত ধরে রাখতে করণীয়
ইসলামি স্কলার মুফতি রেজাউল করীম আবরারের বক্তব্য অনুযায়ী, বরকত অর্থ দিয়ে কেনা যায় না; এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ। তাই জীবনে বরকত কামনা করতে হলে মিথ্যা ও প্রতারণা থেকে দূরে থাকা, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, সুদ ও হারাম উপার্জন বর্জন করা এবং সময়ের সঠিক ব্যবহার করা জরুরি।
মনে রাখতে হবে, জীবনের বরকত শুধু বেশি অর্থ উপার্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং হালাল রিজিক, মানসিক প্রশান্তি, পরিবারে ভালোবাসা, সুস্থ সম্পর্ক এবং ভালো কাজে সময় দিতে পারাও বরকতময় জীবনের অংশ।
আশা/
