পবিত্র কোরআনে উল্লেখিত ৬টি বরকতময় ফল, জানুন কোনগুলো
নিজস্ব প্রতিবেদক: পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহর অসংখ্য নেয়ামত ও সৃষ্টির নিদর্শনের কথা তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ফলের উল্লেখ, যেগুলো মানুষের খাদ্য ও জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। খেজুর, জলপাই, ডুমুর, ডালিম, আঙুর ও কলার মতো ফলের কথা কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে এসেছে। কোনো ফলের উল্লেখ রয়েছে আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন হিসেবে, আবার কোনোটি এসেছে জান্নাতের নেয়ামতের বর্ণনায়।
কোরআনে উল্লেখিত এসব ফলের ধর্মীয় তাৎপর্য যেমন রয়েছে, তেমনি অনেক ফল পুষ্টিগুণের জন্যও পরিচিত। চলুন জেনে নেওয়া যাক, পবিত্র কোরআনে উল্লেখিত ছয়টি ফল এবং কোন কোন সূরায় সেগুলোর কথা বলা হয়েছে।
১. খেজুর: মরিয়ম (আ.)-এর ঘটনায় বিশেষ উল্লেখ
খেজুর আরবি ভাষায় ‘নাখল’ বা খেজুরগাছের সঙ্গে সম্পর্কিত শব্দে উল্লেখ করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে খেজুরগাছ ও খেজুরের প্রসঙ্গ একাধিক স্থানে এসেছে।
সুরা মরিয়মের ২৫ নম্বর আয়াতে মরিয়ম (আ.)-কে উদ্দেশ করে বলা হয়েছে, তিনি যেন খেজুরগাছের কাণ্ড নাড়েন, তাহলে তাঁর ওপর তাজা পাকা খেজুর ঝরে পড়বে। এই আয়াতটি খেজুরের উল্লেখযোগ্য কোরআনিক প্রসঙ্গগুলোর একটি।
খেজুর প্রাকৃতিক শর্করা, আঁশ ও বিভিন্ন খনিজ উপাদানের উৎস। তাই এটি দ্রুত শক্তি জোগাতে সহায়ক হতে পারে। তবে খেজুরের পুষ্টিগুণ ও ধর্মীয় তাৎপর্য বর্ণনা করার সময় চিকিৎসাসংক্রান্ত অতিরঞ্জিত দাবি এড়িয়ে চলা জরুরি।
সহিহ বুখারিতে আজওয়া খেজুরের বিশেষ ফজিলত সম্পর্কেও হাদিস বর্ণিত হয়েছে। এ কারণে মুসলিমদের কাছে খেজুরের ধর্মীয় ও ঐতিহ্যগত গুরুত্ব রয়েছে।
২. জলপাই: কোরআনে বরকতময় গাছের উল্লেখ
জলপাই বা জয়তুনের কথা পবিত্র কোরআনের একাধিক স্থানে এসেছে। সুরা নুরের ৩৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহর নুরের উপমা দিতে গিয়ে এমন একটি বরকতময় জলপাইগাছের তেলের কথা বলা হয়েছে, যা পূর্বেরও নয়, পশ্চিমেরও নয়।
এ ছাড়া সুরা তিনের প্রথম আয়াতে ডুমুরের সঙ্গে জলপাইয়ের শপথের উল্লেখ রয়েছে।
জলপাই থেকে পাওয়া তেলে প্রধানত অসম্পৃক্ত চর্বি থাকে। পরিমিত পরিমাণে জলপাইয়ের তেল সুষম খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে। তবে কোনো নির্দিষ্ট রোগ সারানোর ওষুধ হিসেবে এটি ব্যবহার করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
৩. ডুমুর: যে ফলের নামে একটি সূরা
পবিত্র কোরআনের ৯৫তম সূরার নাম সুরা তিন। আরবি ‘তিন’ শব্দের অর্থ ডুমুর। এই সূরার প্রথম আয়াতে ডুমুর ও জলপাইয়ের শপথ করা হয়েছে।
ডুমুরের উল্লেখের কারণে ফলটি মুসলিমদের কাছে বিশেষ পরিচিত। তাজা ও শুকনো দুই ধরনের ডুমুরই খাওয়া যায়। এতে খাদ্যআঁশসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান রয়েছে।
ডুমুরের খাদ্যআঁশ হজমপ্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করতে পারে। তবে ডুমুর সম্পর্কে প্রচলিত সব স্বাস্থ্যসংক্রান্ত দাবির পক্ষে সমান মাত্রার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
৪. ডালিম: জান্নাতের ফলের বর্ণনায় উল্লেখ
ডালিম বা আনার আরবি ভাষায় ‘রুম্মান’ নামে পরিচিত। পবিত্র কোরআনের সুরা রহমানের ৬৮ নম্বর আয়াতে ফলমূল, খেজুর ও ডালিমের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া সুরা আনআমের ৯৯ নম্বর আয়াতে ডালিমসহ বিভিন্ন ফলের কথা তুলে ধরে আল্লাহর সৃষ্টির নিদর্শন নিয়ে চিন্তা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ডালিমে ভিটামিন, খাদ্যআঁশ এবং বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ উপাদান রয়েছে। ফলটি সুষম খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে। তবে ডালিমকে সরাসরি রক্তবর্ধক ওষুধ বা হৃদ্রোগের চিকিৎসা হিসেবে দাবি করা ঠিক নয়।
৫. আঙুর: দুনিয়া ও জান্নাতের নেয়ামতের প্রসঙ্গ
আঙুর পবিত্র কোরআনে একাধিকবার উল্লেখ করা হয়েছে। সুরা নাবার ৩১ ও ৩২ নম্বর আয়াতে আল্লাহভীরুদের জন্য সফলতা, বাগান এবং আঙুরের কথা বলা হয়েছে।
কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে আঙুরকে আল্লাহর দেওয়া খাদ্য ও ফলমূলের নিদর্শনের অংশ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।
আঙুরে প্রাকৃতিক শর্করা, পানি ও বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ উপাদান রয়েছে। তাজা আঙুরের পাশাপাশি শুকনো আঙুর বা কিশমিশও খাওয়া হয়। তবে কিশমিশে শর্করা ঘন অবস্থায় থাকে বলে পরিমাণের দিকে খেয়াল রাখা ভালো।
৬. কলা: জান্নাতের বর্ণনায় ‘তালহ’ শব্দ
পবিত্র কোরআনের সুরা ওয়াকিয়াহর ২৮ ও ২৯ নম্বর আয়াতে জান্নাতের নেয়ামতের বর্ণনায় কাঁটাবিহীন কুলগাছ এবং স্তরে স্তরে সাজানো ‘তালহ’ গাছের কথা এসেছে।
অনেক তাফসিরকার ‘তালহ’ শব্দের অর্থ কলাগাছ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। এ কারণে কোরআনে উল্লেখিত ফলের আলোচনায় কলার নামও প্রায়ই উঠে আসে।
কলা পটাশিয়াম, কার্বোহাইড্রেট ও খাদ্যআঁশের উৎস। এটি দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় শক্তি জোগাতে সহায়ক হতে পারে। তবে সুরা ওয়াকিয়াহর আয়াতে ‘তালহ’ শব্দের ব্যাখ্যা উল্লেখ করার সময় তাফসিরভিত্তিক মতটি স্পষ্ট করে বলা প্রয়োজন।
কোরআনে ফলের উল্লেখ থেকে কী জানা যায়?
পবিত্র কোরআনে বিভিন্ন ফলের উল্লেখ শুধু খাদ্য হিসেবে নয়, বরং আল্লাহর সৃষ্টি, নেয়ামত ও ক্ষমতার নিদর্শন হিসেবেও এসেছে। খেজুর, জলপাই, ডুমুর, ডালিম, আঙুর ও কলা নিয়ে আলোচনায় ধর্মীয় ব্যাখ্যার পাশাপাশি এসব ফলের পুষ্টিগুণ সম্পর্কেও জানা যায়।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি: কোরআনে কোনো ফলের উল্লেখ থাকলেই সেটি সব রোগের চিকিৎসা বা নিশ্চিত রোগমুক্তির উপায় হয়ে যায় না। ধর্মীয় তাৎপর্যকে সম্মান করার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্যের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
কোরআনে বর্ণিত এসব ফলের কথা জানা আমাদের ধর্মীয় জ্ঞান বাড়াতে পারে এবং সৃষ্টির নেয়ামত সম্পর্কে ভাবতে উৎসাহিত করতে পারে।
আশা/
