বণ্টননামা ছাড়া কি ওয়ারিশদের জমি আলাদা করা যায়
নিজস্ব প্রতিবেদক: পরিবারের কোনো সদস্য মারা যাওয়ার পর তাঁর রেখে যাওয়া জমির মালিক হন আইনগত ওয়ারিশরা। কিন্তু জমির ভাগ-বাটোয়ারা, নামজারি কিংবা পৃথক খতিয়ান তৈরি করতে গিয়ে অনেকেই বুঝতে পারেন না, বণ্টননামা দলিল ছাড়া কী করা সম্ভব আর কী করা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির নামজারির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বণ্টননামা ছাড়াও সব ওয়ারিশের নামে যৌথ নামজারি করা যায়। তবে জমি ভাগ করে প্রত্যেকের নামে পৃথক খতিয়ান তৈরি করতে চাইলে নিবন্ধিত বণ্টননামা প্রয়োজন।
ভূমি মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি এ বিষয়ে একটি পরিপত্রের মাধ্যমে বিষয়টি স্পষ্ট করেছে। ফলে যৌথ নামজারি এবং জমির নির্দিষ্ট অংশ আলাদা করে নেওয়ার নিয়ম এক নয়। কোন ক্ষেত্রে কী করতে হবে, তা জানা থাকলে অপ্রয়োজনীয় হয়রানি ও পারিবারিক বিরোধ এড়ানো সহজ হবে।
বণ্টননামা ছাড়া কি ওয়ারিশদের নামে নামজারি করা যায়?
হ্যাঁ, যায়। মৃত ব্যক্তির সব বৈধ ওয়ারিশ চাইলে বণ্টননামা ছাড়াই তাঁদের নামে যৌথ নামজারির আবেদন করতে পারেন।
এ ক্ষেত্রে প্রত্যেক ওয়ারিশের আইনগত প্রাপ্য অংশ বা হিস্যা উল্লেখ করে একই খতিয়ানে সবার নাম অন্তর্ভুক্ত করা যায়। আবেদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দেওয়া ওয়ারিশ সনদসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে হয়।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের পরিপত্রে বলা হয়েছে, শুধু বণ্টননামা দলিল না থাকার কারণে সব ওয়ারিশের যৌথ নামজারির আবেদন নামঞ্জুর করা যথাযথ নয়।
তবে যৌথ নামজারি হলেই জমির নির্দিষ্ট অংশ আলাদা হয়ে যায় না। এতে সরকারি রেকর্ডে প্রত্যেকের হিস্যা উল্লেখ থাকে, কিন্তু কে কোন দাগের কোন অংশ ব্যবহার করবেন, তা আলাদাভাবে নির্ধারিত হয় না।
জমি আলাদা করে নিতে হলে কি বণ্টননামা লাগবে?
হ্যাঁ। ওয়ারিশরা যদি নিজেদের মধ্যে জমি ভাগ করে প্রত্যেকে আলাদা খতিয়ান করতে চান, তাহলে নিবন্ধিত আপস-বণ্টননামা দলিল প্রয়োজন।
রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ১৪৩খ ধারায় উত্তরাধিকারীদের মধ্যে আপসের ভিত্তিতে সম্পত্তি ভাগ করার পর সংশ্লিষ্ট সবার স্বাক্ষরে বণ্টননামা প্রস্তুত ও নিবন্ধনের বিধান রয়েছে। নিবন্ধিত বণ্টননামা রাজস্ব কর্মকর্তার কাছে উপস্থাপন করা হলে সেই অনুযায়ী খতিয়ান সংশোধনের ব্যবস্থা করা হয়।
এ ছাড়া নিবন্ধন আইন, ১৯০৮-এর ১৭(১)(এফ) ধারায় উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া স্থাবর সম্পত্তির বণ্টননামা নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
অর্থাৎ, শুধু মৌখিকভাবে জমি ভাগ করে নেওয়া বা সাদা কাগজে লিখে রাখার মাধ্যমে সরকারি রেকর্ডে পৃথক খতিয়ান তৈরি করা যায় না।
ওয়ারিশদের জমি ভাগ করার আগে যা করবেন
জমি ভাগ করার আগে প্রথম কাজ হলো মৃত ব্যক্তির সব বৈধ ওয়ারিশ শনাক্ত করা এবং প্রত্যেকের আইনগত প্রাপ্য অংশ নির্ধারণ করা।
মনে রাখতে হবে, সব ওয়ারিশের অংশ সমান হবে, এমন কোনো সাধারণ নিয়ম নেই। মৃত ব্যক্তির ধর্ম, প্রযোজ্য ব্যক্তিগত আইন, জীবিত ওয়ারিশের ধরন এবং পারিবারিক পরিস্থিতি অনুযায়ী উত্তরাধিকার নির্ধারিত হয়।
এ জন্য প্রথমে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশন থেকে ওয়ারিশ সনদ সংগ্রহ করতে হবে। এরপর প্রযোজ্য উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী প্রত্যেকের হিস্যা হিসাব করতে হবে।
অংশ নির্ধারণে জটিলতা থাকলে অনুমানের ভিত্তিতে জমি ভাগ না করে আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া ভালো।
বণ্টননামা তৈরি করতে যেসব কাগজপত্র লাগতে পারে
বণ্টননামা প্রস্তুত ও নিবন্ধনের আগে জমির মালিকানা, পরিচয় এবং উত্তরাধিকারসংক্রান্ত কাগজপত্র যাচাই করা জরুরি। সাধারণত যেসব নথি প্রয়োজন হতে পারে সেগুলো হলো—
-
মৃত ব্যক্তির মৃত্যু সনদ।
-
ওয়ারিশ সনদ।
-
মৃত ব্যক্তির নামে থাকা মূল বা পূর্ববর্তী দলিলের কপি।
-
সংশ্লিষ্ট জমির খতিয়ান, যেমন সিএস, এসএ, আরএস, বিএস বা সর্বশেষ রেকর্ড।
-
জমির দাগ নম্বর, মৌজা ও পরিমাণের তথ্য।
-
সব ওয়ারিশের জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি।
-
ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের হালনাগাদ দাখিলা, যদি থাকে।
-
জমির অবস্থান ও সীমানা বোঝার জন্য মৌজা নকশা বা প্রয়োজনীয় নকশা।
জমি নিয়ে মামলা, বন্ধক, বিক্রয় বা অন্য কোনো দাবি থাকলে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রও যাচাই করতে হবে। জমির অবস্থা ও দলিলের ধরন অনুযায়ী সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে অতিরিক্ত নথি প্রয়োজন হতে পারে।
সব ওয়ারিশ রাজি থাকলে যেভাবে জমি ভাগ করবেন
সব ওয়ারিশের মধ্যে সমঝোতা থাকলে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে জমি ভাগ করে নিবন্ধিত বণ্টননামা তৈরি করা যায়। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করা ভালো।
১. সব জমির মালিকানা ও পরিমাণ যাচাই করুন
মৃত ব্যক্তির নামে থাকা সব জমির তালিকা তৈরি করুন। কোন মৌজায় কত জমি রয়েছে, কোন দাগে কতটুকু জমি, সর্বশেষ খতিয়ানে কার নাম আছে এবং বাস্তবে জমির দখল কার কাছে, তা যাচাই করুন।
শুধু পুরোনো দলিলের ওপর নির্ভর না করে সর্বশেষ খতিয়ান, নামজারি রেকর্ড এবং ভূমি উন্নয়ন করের তথ্যও মিলিয়ে দেখুন।
২. প্রত্যেকের প্রাপ্য অংশ হিসাব করুন
প্রযোজ্য উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী প্রত্যেকের অংশ নির্ধারণ করতে হবে। এরপর জমির অবস্থান, বাজারমূল্য, রাস্তা বা চলাচলের সুবিধা এবং ব্যবহারযোগ্যতা বিবেচনায় কে কোন অংশ পাবেন, তা ঠিক করুন।
প্রয়োজনে অভিজ্ঞ আমিন বা সার্ভেয়ার দিয়ে জমি মাপিয়ে নকশা তৈরি করাতে পারেন। এতে জমির পরিমাণ ও সীমানা নিয়ে ভবিষ্যতে বিরোধের আশঙ্কা কমে।
৩. বণ্টননামা দলিল তৈরি করুন
সমঝোতা অনুযায়ী কোন ওয়ারিশ কোন দাগের কতটুকু জমি পাবেন, তা বণ্টননামায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।
দলিলে জমির মৌজা, খতিয়ান ও দাগ নম্বর, পরিমাণ, সীমানা এবং প্রত্যেকের বরাদ্দ করা অংশ নির্ভুলভাবে লিখতে হবে। সব ওয়ারিশের নাম ও পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যও সঠিকভাবে উল্লেখ করা জরুরি।
৪. সংশ্লিষ্ট সবার স্বাক্ষর নিয়ে দলিল নিবন্ধন করুন
বণ্টননামা চূড়ান্ত হলে সংশ্লিষ্ট সব ওয়ারিশের স্বাক্ষর নিয়ে আইন অনুযায়ী সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল নিবন্ধন করতে হবে।
দলিলের খসড়া তৈরির সময় আইনজীবী বা অভিজ্ঞ দলিল লেখকের সহায়তা নেওয়া ভালো। বিশেষ করে জমির তফসিল, দাগ নম্বর ও সীমানায় ভুল থাকলে পরবর্তী সময়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
বণ্টননামা নিবন্ধনের পর কী করবেন?
বণ্টননামা নিবন্ধন করার পর প্রত্যেক ওয়ারিশকে নিজের বরাদ্দ করা অংশের জন্য পৃথক নামজারির আবেদন করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে নিবন্ধিত বণ্টননামা, ওয়ারিশ সনদ, আগের দলিল ও খতিয়ান, জাতীয় পরিচয়পত্র এবং প্রয়োজনীয় ভূমি উন্নয়ন করের তথ্য জমা দিতে হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে অথবা নির্ধারিত অনলাইন ভূমিসেবা ব্যবস্থায় আবেদন করা যায়। আবেদন যাচাইয়ের সময় ভূমি অফিস প্রয়োজন অনুযায়ী নোটিশ দিতে পারে এবং আপত্তি থাকলে শুনানির ব্যবস্থা করতে পারে।
নামজারি অনুমোদিত হলে বণ্টননামা অনুযায়ী পৃথক খতিয়ান তৈরির ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এরপর প্রত্যেকে নিজের অংশের ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করতে পারবেন।
কোনো ওয়ারিশ রাজি না হলে কী করবেন?
সব ওয়ারিশ জমি ভাগ করতে রাজি না হলে অন্যরা একতরফাভাবে সবার নামে আপস-বণ্টননামা তৈরি করে নিবন্ধন করতে পারবেন না। কারণ আপস-বণ্টননামায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সম্মতি ও স্বাক্ষর প্রয়োজন।
এমন পরিস্থিতিতে দেওয়ানি আদালতে বাটোয়ারা বা পার্টিশন মামলা করার সুযোগ রয়েছে। মামলায় জমির মালিকানা, ওয়ারিশদের পরিচয়, প্রাপ্য অংশ এবং সংশ্লিষ্ট দলিলপত্র আদালতে উপস্থাপন করতে হয়।
আদালত প্রমাণ ও প্রযোজ্য আইন বিবেচনা করে প্রত্যেকের অংশ নির্ধারণ এবং জমি বণ্টনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে পারেন। প্রয়োজন হলে জমি পরিমাপ ও বণ্টনের জন্য কমিশনার নিয়োগ করা হতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে জমির প্রকৃতি, অংশীদারের সংখ্যা বা বিশেষ পরিস্থিতির কারণে জমি সরাসরি ভাগ করা যুক্তিসংগত বা সুবিধাজনক না হলে আদালত বিক্রি করে অর্থ বণ্টনের নির্দেশও দিতে পারেন। তবে এটি সব বাটোয়ারা মামলার স্বাভাবিক ফল নয়। পার্টিশন অ্যাক্ট, ১৮৯৩-এর ২ ধারায় নির্দিষ্ট শর্তে এমন নির্দেশ দেওয়ার বিধান রয়েছে।
জমি ভাগ করার সময় যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকবেন
ওয়ারিশদের মধ্যে জমি ভাগ করার সময় কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে খেয়াল রাখা জরুরি।
-
কোনো বৈধ ওয়ারিশকে বাদ দিয়ে বণ্টননামা তৈরি করবেন না।
-
প্রত্যেকের প্রাপ্য অংশ প্রযোজ্য উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী নির্ধারণ করুন।
-
দলিলে মৌজা, খতিয়ান, দাগ নম্বর ও জমির পরিমাণ নির্ভুলভাবে লিখুন।
-
প্রত্যেকের বরাদ্দ করা জমির সীমানা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করুন।
-
দলিলের তফসিলের সঙ্গে বাস্তবে মাপা জমির পরিমাণ মিলিয়ে নিন।
-
জমি মামলা, বন্ধক বা অন্য কোনো বিরোধের মধ্যে আছে কি না যাচাই করুন।
-
নিবন্ধিত বণ্টননামার কপি ও প্রয়োজনীয় নথি নিরাপদে সংরক্ষণ করুন।
-
বণ্টননামা নিবন্ধনের পর নামজারি ও ভূমি উন্নয়ন করের রেকর্ড হালনাগাদ করুন।
কোনো ওয়ারিশ বিদেশে থাকলে, নাবালক হলে বা আইনগতভাবে নিজে দলিল সম্পাদনে অক্ষম হলে তাঁর পক্ষে বৈধভাবে কে কাজ করবেন, তা আগে নিশ্চিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আইনগত প্রতিনিধিত্ব ও অনুমোদনের বিষয়টি যাচাই না করে দলিল সম্পাদন করা উচিত নয়।
ওয়ারিশদের জমি ভাগ করার ক্ষেত্রে বণ্টননামা ছাড়াই যৌথ নামজারি করা সম্ভব। তবে জমির নির্দিষ্ট অংশ আলাদা করে পৃথক খতিয়ান করতে চাইলে নিবন্ধিত বণ্টননামা প্রয়োজন। আর সব ওয়ারিশের মধ্যে সমঝোতা না হলে আদালতের মাধ্যমে বাটোয়ারার ব্যবস্থা নিতে হয়।
তাই জমি ভাগ করার আগে সব বৈধ ওয়ারিশ শনাক্ত করা, প্রত্যেকের আইনগত অংশ নির্ধারণ এবং জমির দলিল ও রেকর্ড যাচাই করা জরুরি। এতে ভবিষ্যতে জমির মালিকানা, দখল ও নামজারি নিয়ে বিরোধের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। জমির পরিস্থিতি জটিল হলে সংশ্লিষ্ট আইনজীবী ও ভূমি অফিসের পরামর্শ নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়াই ভালো।
সোহাগ/
