নবম পে স্কেলের বকেয়া বেতন পেতে যেভাবে জমা দেবেন বিল
নিজস্ব প্রতিবেদক: নবম জাতীয় পে স্কেল অনুযায়ী নতুন বেতন পাওয়ার পর এবার বকেয়া টাকা উত্তোলনের প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে। তবে নতুন বেতন নির্ধারণ সম্পন্ন হলেই আগের মাসগুলোর বকেয়া অর্থ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যাংক হিসাবে জমা হবে না। বকেয়া পাওনার জন্য আলাদা হিসাব প্রস্তুত করে সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিসে বিল দাখিল করতে হবে।
প্রকাশিত নির্দেশনামূলক তথ্যচিত্র অনুযায়ী, আপাতত নবম পে স্কেলের বকেয়া বিল iBAS++ থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি বা অনলাইনে জমা দেওয়ার ব্যবস্থা নেই। এ জন্য ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বকেয়ার হিসাব আলাদাভাবে প্রস্তুত করতে হবে।
তবে গেজেটেড কর্মকর্তা ও নন-গেজেটেড কর্মচারীদের বিল দাখিলের নিয়ম এক নয়। গেজেটেড কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে TR Form 13 ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে, নন-গেজেটেড কর্মচারীদের বকেয়া বিল প্রস্তুত করবেন সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ড্রয়িং অ্যান্ড ডিসবার্সিং অফিসার বা DDO।
১ নভেম্বর থেকে বকেয়া বিল জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া
প্রকাশিত তথ্যচিত্রে বলা হয়েছে, ১ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে নবম পে স্কেলের প্রথম নিয়মিত বেতন অর্থাৎ অক্টোবর মাসের বেতন EFT-এর মাধ্যমে ব্যাংক হিসাবে জমা হওয়ার পর থেকে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে বকেয়া বিল হিসাবরক্ষণ অফিসে দাখিল করা যাবে।
এখানে নিয়মিত বেতন ও বকেয়া বেতন পরিশোধের বিষয়টি আলাদা করে বুঝতে হবে। নতুন পে স্কেল অনুযায়ী নিয়মিত বেতন iBAS++ ও EFT ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিশোধ করা হলেও আগের সময়ের বকেয়া অর্থের জন্য আলাদা বিল প্রস্তুত করতে হবে বলে তথ্যচিত্রে উল্লেখ রয়েছে।
তবে বিল জমা দেওয়ার অর্থ এই নয় যে সঙ্গে সঙ্গেই ব্যাংক হিসাবে টাকা চলে আসবে। সংশ্লিষ্ট অফিসে বিল যাচাই, প্রয়োজনীয় অনুমোদন এবং অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর বকেয়া অর্থ পরিশোধ করা হবে।
iBAS++ থেকে কি বকেয়া বিল স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হবে?
নতুন পে স্কেলে বেতন নির্ধারণ ও নিয়মিত বেতন পরিশোধের ক্ষেত্রে iBAS++ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই ব্যবস্থায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণ এবং বেতনসংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ করা হয়।
তবে প্রকাশিত তথ্যচিত্র অনুযায়ী, বকেয়া বেতনের বিল আপাতত iBAS++ থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি বা অনলাইনে দাখিল করার সুযোগ নেই। এজন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রাপ্য বকেয়া হিসাব আলাদাভাবে প্রস্তুত করতে হবে।
অর্থাৎ, নতুন পে স্কেলে নিয়মিত বেতন পাওয়া এবং আগের মাসগুলোর বকেয়া অর্থ উত্তোলনের জন্য পৃথক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
প্রত্যেকের বকেয়া হিসাব আলাদা হবে কেন?
সব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বকেয়া বেতনের পরিমাণ এক হবে না। কারণ প্রত্যেকের পদ, গ্রেড, চাকরিতে যোগদানের তারিখ, ইনক্রিমেন্ট, পূর্ববর্তী মূল বেতন এবং প্রযোজ্য ভাতার হিসাব আলাদা হতে পারে।
এ ছাড়া কেউ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পদোন্নতি পেয়েছেন, কেউ চাকরি পরিবর্তন করেছেন, আবার কারও বেতন নির্ধারণে ভিন্নতা থাকতে পারে। ফলে একই গ্রেডে কর্মরত দুজন ব্যক্তির বকেয়া অর্থও এক রকম নাও হতে পারে।
এ কারণে প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য আলাদা বকেয়া হিসাব বিবরণী প্রস্তুত করতে হবে। নতুন পে স্কেল অনুযায়ী প্রাপ্য বেতন এবং সংশ্লিষ্ট সময়ে আগে উত্তোলন করা বেতন-ভাতার পার্থক্য হিসাব করে বকেয়া নির্ধারণ করতে হবে।
গেজেটেড কর্মকর্তাদের বকেয়া বিল জমা দেওয়ার নিয়ম
গেজেটেড সরকারি কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে বকেয়া বিল প্রস্তুতের জন্য TR Form 13 ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের নিজ নিজ আইডি থেকে ম্যানুয়ালি নির্ধারিত ফরম পূরণ করতে হবে। পাশাপাশি বকেয়া বেতনের বিস্তারিত হিসাব বিবরণী প্রস্তুত করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংযুক্ত করতে হবে।
এরপর নির্ধারিত টোকেনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট এজি (AG) অফিস অথবা হিসাবরক্ষণ অফিসে বিল দাখিল করতে হবে।
গেজেটেড কর্মকর্তাদের করণীয়:
১. নিজ নিজ আইডি থেকে TR Form 13 পূরণ করা।
২. নতুন পে স্কেল অনুযায়ী বকেয়া বেতনের হিসাব প্রস্তুত করা।
৩. প্রয়োজনীয় হিসাব বিবরণী ও কাগজপত্র সংযুক্ত করা।
৪. সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী টোকেন সংগ্রহ করা।
৫. নির্ধারিত পদ্ধতিতে হিসাবরক্ষণ অফিসে বিল জমা দেওয়া।
উল্লেখ্য, iBAS++-এর সরকারি ওয়েবসাইটে TR Form 13-এর ফরম রয়েছে। সরকারি ফরমে এটিকে গেজেটেড কর্মকর্তার বেতন বিল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বকেয়া বিলের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সংযুক্তি ও দাখিলের বিস্তারিত নিয়ম সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিসের নির্দেশনা অনুযায়ী নিশ্চিত করতে হবে।
নন-গেজেটেড কর্মচারীদের বকেয়া বিল প্রস্তুত করবেন DDO
নন-গেজেটেড সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে বকেয়া বিল প্রস্তুতের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ড্রয়িং অ্যান্ড ডিসবার্সিং অফিসার বা DDO-এর ওপর থাকবে বলে প্রকাশিত তথ্যচিত্রে জানানো হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট DDO কর্মচারীদের বেতন ও চাকরিসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করে ম্যানুয়ালি বেতন বিল এবং বকেয়া হিসাব বিবরণী প্রস্তুত করবেন। পরে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ বিলটি সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিসে পাঠানো হবে।
অর্থাৎ, নন-গেজেটেড কর্মচারীদের প্রত্যেককে গেজেটেড কর্মকর্তাদের মতো নিজ উদ্যোগে TR Form 13 পূরণ করে বিল জমা দিতে হবে, বিষয়টি এমন নয়। তাঁদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের DDO ও হিসাব শাখার মাধ্যমে বিল প্রস্তুত ও দাখিলের কার্যক্রম সম্পন্ন হবে।
তাই অফিস সহকারী, অফিস সহায়ক, গাড়িচালকসহ বিভিন্ন নন-গেজেটেড পদে কর্মরত কর্মচারীদের নিজ নিজ দপ্তরের হিসাব শাখার সঙ্গে যোগাযোগ রাখা প্রয়োজন।
বকেয়া বিল প্রস্তুতের আগে যেসব তথ্য যাচাই করবেন
বকেয়া বিল দাখিলের আগে কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। কারণ হিসাবের ভুল বা প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ঘাটতি থাকলে বিল যাচাইয়ের সময় সমস্যা হতে পারে।
১. নতুন বেতন নির্ধারণ: নবম পে স্কেল অনুযায়ী নিজের মূল বেতন সঠিকভাবে নির্ধারিত হয়েছে কি না, তা যাচাই করতে হবে।
২. আগের বেতনের তথ্য: বকেয়া সময়ের পুরোনো মূল বেতন ও আগে উত্তোলন করা বেতনের হিসাব মিলিয়ে নিতে হবে।
৩. চাকরির তথ্য: যোগদানের তারিখ, পদ, গ্রেড, ইনক্রিমেন্ট ও পদোন্নতির তথ্য সঠিক আছে কি না, তা দেখতে হবে।
৪. ভাতা ও কর্তন: সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রযোজ্য ভাতা, কর্তন ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধার হিসাব ঠিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
৫. প্রয়োজনীয় ফরম: গেজেটেড কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে TR Form 13 এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কাগজপত্র প্রস্তুত রাখতে হবে।
৬. DDO-এর মাধ্যমে বিল: নন-গেজেটেড কর্মচারীদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট DDO-এর মাধ্যমে বকেয়া হিসাব ও বিল প্রস্তুতের ব্যবস্থা করতে হবে।
বকেয়া বিল জমা দিলেই কি ব্যাংকে টাকা আসবে?
বিল জমা দেওয়ার পর কত দিনের মধ্যে বকেয়া টাকা পাওয়া যাবে, সে বিষয়ে প্রকাশিত তথ্যচিত্রে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা উল্লেখ করা হয়নি।
সাধারণভাবে বিল দাখিলের পর সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিসে কাগজপত্র ও হিসাব যাচাই করতে হবে। প্রয়োজনীয় অনুমোদন এবং অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া শেষ হলে বকেয়া অর্থ পরিশোধ করা সম্ভব হবে।
বিলের হিসাবে ভুল থাকলে, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র অসম্পূর্ণ হলে অথবা তথ্যের মধ্যে অসংগতি পাওয়া গেলে সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে। এতে অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তাই বকেয়া বিল জমা দেওয়ার আগে নিজ নিজ দপ্তরের হিসাব শাখা ও সংশ্লিষ্ট হিসাবরক্ষণ অফিস থেকে সর্বশেষ নির্দেশনা জেনে নেওয়া ভালো।
সরকারি চাকরিজীবীদের এখন করণীয় কী?
নবম পে স্কেলের নিয়মিত বেতন পাওয়ার পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উচিত নিজের বেতন নির্ধারণী বিবরণী ও চাকরিসংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ করা। পাশাপাশি বকেয়া হিসাবের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য আগেই যাচাই করে রাখা।
গেজেটেড কর্মকর্তারা TR Form 13 পূরণ ও বকেয়া হিসাব প্রস্তুতের বিষয়ে নিজ নিজ হিসাবরক্ষণ অফিসের নির্দেশনা অনুসরণ করবেন। অন্যদিকে, নন-গেজেটেড কর্মচারীরা সংশ্লিষ্ট DDO ও হিসাব শাখার সঙ্গে যোগাযোগ রাখবেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বকেয়া বিল জমা দেওয়ার পদ্ধতি, প্রয়োজনীয় সংযুক্তি এবং অর্থ ছাড়ের সময়সীমা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ নির্দেশনাকে চূড়ান্ত হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
সরকারি ফরম: TR Form 13 ডাউনলোড করুন
সোহাগ/
