রাসুলের প্রিয় ইয়েমেন আজ কেন সৌদি আরবের মাথাব্যথা
নিজস্ব প্রতিবেদক: ইসলামের ইতিহাসে ইয়েমেনের রয়েছে বিশেষ পরিচিতি। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর হাদিসে ইয়েমেনের মানুষের কোমল হৃদয়, ধর্মীয় প্রজ্ঞা ও জ্ঞানের প্রশংসা এসেছে। অথচ সেই ইয়েমেন আজ দীর্ঘ সংঘাত, রাজনৈতিক বিভক্তি, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং ভয়াবহ মানবিক সংকটে জর্জরিত। দেশটির সংঘাত এখন শুধু অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এর প্রভাব পড়ছে সৌদি আরবের নিরাপত্তা, আঞ্চলিক রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথেও।
প্রশ্ন হলো, আরব উপদ্বীপের দক্ষিণে অবস্থিত ইয়েমেন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে? কেন দেশটির হুতি আন্দোলন সৌদি আরবের জন্য বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে?
ইয়েমেন সম্পর্কে মহানবী (সা.)-এর হাদিসে কী বলা হয়েছে?
সহিহ বুখারির একটি হাদিসে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, ইয়েমেনের মানুষের কোমল হৃদয় ও নম্রতার কথা উল্লেখ করে মহানবী (সা.) বলেছেন, ধর্মীয় জ্ঞান ও প্রজ্ঞা ইয়েমেনের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই বর্ণনা ইসলামী ঐতিহ্যে ইয়েমেনের বিশেষ মর্যাদার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে।
তবে হাদিসের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। আধুনিক সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ বা বর্তমান রাজনৈতিক সংঘাতের সঙ্গে অতীতের ধর্মীয় বর্ণনাকে সরাসরি মিলিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। এ বিষয়ে বিভিন্ন আলেমের ব্যাখ্যা রয়েছে। ধর্মীয় বর্ণনা এবং আধুনিক ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণকে আলাদা করে দেখাই যুক্তিযুক্ত।
হুতি কারা, তাদের সঙ্গে সৌদি আরবের বিরোধ কেন?
ইয়েমেনের হুতি আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক নাম আনসার আল্লাহ। এটি দেশটির উত্তরাঞ্চলে গড়ে ওঠা একটি রাজনৈতিক ও সশস্ত্র আন্দোলন। আন্দোলনটির শিকড় জাইদি শিয়া সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের সঙ্গে সম্পর্কিত। ১৯৯০-এর দশকে সংগঠিত হওয়ার পর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি ইয়েমেনের রাজনীতিতে প্রভাবশালী শক্তিতে পরিণত হয়।
২০১৪ সালে হুতিরা রাজধানী সানা দখল করে। এর পরপরই দেশটির রাজনৈতিক সংকট আরও গভীর হয়। ২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিয়ে সামরিক অভিযান শুরু করে। সংঘাতের পেছনে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াইয়ের পাশাপাশি সৌদি আরব ও ইরানের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তবে ইয়েমেনের সব অঞ্চল হুতিদের নিয়ন্ত্রণে নেই। দেশটির বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামরিক গোষ্ঠীর প্রভাব রয়েছে। তাই ইয়েমেনকে একক কোনো পক্ষের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বর্ণনা করা বাস্তব পরিস্থিতিকে সরল করে দেখানো হবে।
সৌদি আরবের জন্য ইয়েমেন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
এর অন্যতম কারণ ভৌগোলিক অবস্থান। ইয়েমেনের উত্তরে সৌদি আরব এবং পশ্চিমে লোহিত সাগর। দক্ষিণে এডেন উপসাগর। দেশটির কাছেই বাব আল-মান্দেব প্রণালি, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের অংশ।
এই অঞ্চলে সংঘাত বাড়লে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হতে পারে, পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে এবং জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। সৌদি আরবের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশটির নিরাপত্তা ও অর্থনীতির সঙ্গে জ্বালানি অবকাঠামো ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা গভীরভাবে জড়িত।
ইয়েমেনের সঙ্গে সৌদি আরবের দীর্ঘ সীমান্ত থাকায় দেশটিতে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতিকেও রিয়াদ নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে দেখে।
ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র কীভাবে বদলে দিচ্ছে সংঘাতের হিসাব?
আধুনিক যুদ্ধের অন্যতম বড় পরিবর্তন হলো তুলনামূলক কম খরচের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার। এসব অস্ত্রের সাহায্যে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সামরিক স্থাপনা, বিমানবন্দর, জ্বালানি অবকাঠামো কিংবা সমুদ্রপথে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
সৌদি আরবের মতো সমৃদ্ধ রাষ্ট্রের কাছে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকলেও প্রতিটি ধরনের হুমকি ঠেকানো সহজ নয়। আক্রমণকারী অস্ত্রের ধরন, উড্ডয়নের উচ্চতা, গতি, সংখ্যার পাশাপাশি শনাক্তকরণ ও প্রতিরোধের খরচও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
তবে কোনো নির্দিষ্ট হামলায় কোন অস্ত্র ব্যবহার হয়েছে, সেটি কোথা থেকে এসেছে কিংবা কারা সরবরাহ করেছে—এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ছাড়া নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। হুতিদের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে ইরানের সহায়তার অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হলেও নির্দিষ্ট ঘটনার দায় ও অস্ত্রের উৎস আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
২০২৬ সালে কেন নতুন করে উত্তেজনা বাড়ছে?
২০২৬ সালের অক্টোবরের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতে ইয়েমেন ও সৌদি আরবের মধ্যে নতুন করে সংঘাত তীব্র হওয়ার খবর এসেছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, হুতিদের সামরিক তৎপরতা এবং সংঘাতের বিস্তার ইয়েমেনের মানবিক পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনেও সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা এবং ইয়েমেনে পাল্টা সামরিক অভিযানের কথা উঠে এসেছে।
এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের উদ্বেগ শুধু সীমান্ত নিরাপত্তায় সীমাবদ্ধ নয়। জ্বালানি অবকাঠামো, বিমান চলাচল, বাণিজ্যিক যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে সংঘাত দীর্ঘ হলে সাধারণ মানুষের জীবন, খাদ্য ও চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত সব দাবি—যেমন নির্দিষ্ট কোনো বিমানবন্দর পুরোপুরি অচল হয়ে যাওয়া, কোনো দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হওয়া কিংবা কোনো রাষ্ট্রের গোপন সামরিক চুক্তির বিবরণ—স্বাধীনভাবে যাচাই না করে সংবাদ হিসেবে প্রকাশ করা উচিত নয়।
ইয়েমেন সংকটের পেছনে শুধু সৌদি আরব ও হুতি নয়
ইয়েমেনের বর্তমান পরিস্থিতি বুঝতে দেশটির দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসও জানা দরকার। ২০১১ সালের আরব বসন্তের সময় তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়। পরবর্তী রাজনৈতিক রূপান্তর স্থিতিশীল রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। ২০১৪ সালে হুতিদের সানা দখল এবং ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সামরিক হস্তক্ষেপ সংঘাতকে আরও জটিল করে তোলে।
এরপর থেকে দেশটির বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে ক্ষমতা, ভূখণ্ড ও সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ চলেছে। আঞ্চলিক শক্তিগুলোর হস্তক্ষেপও সংকটকে দীর্ঘায়িত করেছে। ফলে ইয়েমেনের যুদ্ধকে কেবল ধর্মীয় বিরোধ কিংবা শুধু সৌদি আরব–ইরান প্রতিদ্বন্দ্বিতা দিয়ে ব্যাখ্যা করলে গুরুত্বপূর্ণ অনেক দিক বাদ পড়ে যায়।
ইয়েমেনের সংকটে সবচেয়ে বেশি ভুগছেন কারা?
দীর্ঘ যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয়েছে সাধারণ ইয়েমেনিদের। সংঘাতের কারণে বহু মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়েছেন, জীবিকা হারিয়েছেন এবং খাদ্য, চিকিৎসা ও নিরাপদ আশ্রয়ের সংকটে পড়েছেন। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে নতুন করে বাস্তুচ্যুতি এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর বাধার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
তাই ইয়েমেনকে শুধু ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, সামরিক জোট ও আঞ্চলিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার দৃষ্টিতে দেখলে সংকটের মানবিক দিকটি আড়ালে পড়ে যায়।
শেষ কথা: ইয়েমেন কেন মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক কেন্দ্র?
ইয়েমেনের গুরুত্বের পেছনে রয়েছে এর কৌশলগত অবস্থান, বাব আল-মান্দেব প্রণালির নৈকট্য, জ্বালানি ও বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা। দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটের সঙ্গে এসব বিষয় যুক্ত হয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
ইসলামী ইতিহাসে ইয়েমেনের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। কিন্তু বর্তমান সংঘাতের কারণ খুঁজতে হলে ইতিহাসের পাশাপাশি আধুনিক রাজনীতি, সামরিক প্রযুক্তি, ভূগোল ও অর্থনীতিও বিশ্লেষণ করতে হবে। ইয়েমেনের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা শুধু দেশটির মানুষের জন্য নয়, পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
সোহাগ/
