অন্যের নামে জমি রেকর্ড হলে নিজের নামে করবেন যেভাবে
নিজস্ব প্রতিবেদক: নিজের কেনা বা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমি অন্য কারও নামে রেকর্ড হয়েছে—এমন ঘটনা জানার পর অনেকেই বুঝতে পারেন না কোথায় আবেদন করবেন, কোন কাগজপত্র লাগবে কিংবা কীভাবে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করবেন। তবে সব ক্ষেত্রে সমাধানের পদ্ধতি এক নয়। রেকর্ডে নামের ভুল, জরিপের ভুল, নামজারির জটিলতা এবং জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধের ধরন অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে হয়।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রথমেই জমির দলিল, খতিয়ান, দাগ নম্বর ও নামজারির নথি যাচাই করা জরুরি। রেকর্ডটি খসড়া পর্যায়ে রয়েছে, নাকি চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত হয়েছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ভুলের ধরন ও রেকর্ডের অবস্থার ওপর নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্তৃপক্ষ বা আদালতের মাধ্যমে প্রতিকার চাইতে হতে পারে।
কেন অন্যের নামে জমি রেকর্ড হতে পারে?
বিভিন্ন কারণে প্রকৃত মালিকের পরিবর্তে অন্য ব্যক্তির নাম ভূমি রেকর্ডে উঠে আসতে পারে। জরিপের সময় তথ্য সংগ্রহে ভুল, নামের বানান ভুল, জমি হস্তান্তরের পর রেকর্ড হালনাগাদ না হওয়া কিংবা উত্তরাধিকারীদের নাম বাদ পড়া এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
কখনো জমি কেনার পর নতুন মালিকের নামে নামজারি সম্পন্ন না হওয়ায় পুরোনো মালিকের নাম রেকর্ডে থেকে যেতে পারে। আবার উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমিতে একাধিক ব্যক্তির অধিকার থাকলেও রেকর্ডে সবার নাম বা প্রাপ্য অংশ সঠিকভাবে উল্লেখ নাও থাকতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ অথবা জাল দলিল ও প্রতারণার অভিযোগও সামনে আসতে পারে। তাই খতিয়ানে অন্যের নাম দেখেই জমির মালিকানা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। দলিল, স্বত্ব অর্জনের ধারাবাহিকতা এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক প্রমাণ যাচাই করা প্রয়োজন।
নিজের নামে জমি রেকর্ড করতে যেসব কাগজপত্র লাগতে পারে
রেকর্ড সংশোধনের আবেদন করার আগে জমির মালিকানার পক্ষে প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করুন। সমস্যার ধরন অনুযায়ী সাধারণত নিচের কাগজপত্র কাজে আসতে পারে—
-
জমির দলিল: জমি কেনা হলে নিবন্ধিত ক্রয়দলিল এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আগের মালিকের দলিল।
-
খতিয়ান: সংশ্লিষ্ট CS, SA, RS, BS বা অন্য প্রযোজ্য জরিপের রেকর্ড।
-
জমির পরিচিতি: মৌজার নাম, দাগ নম্বর, খতিয়ান নম্বর ও জমির পরিমাণের তথ্য।
-
নামজারির নথি: নামজারি হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট মামলার আদেশ ও অন্যান্য কাগজপত্র।
-
উত্তরাধিকারসংক্রান্ত নথি: জমি উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া হলে ওয়ারিশ সনদ এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বণ্টননামা বা অন্যান্য প্রাসঙ্গিক দলিল।
-
ভূমি উন্নয়ন করের রসিদ: জমির কর পরিশোধের তথ্য।
-
মামলার কাগজপত্র: জমি নিয়ে আগে কোনো মামলা হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট আদেশ ও নথি।
সব ক্ষেত্রে সব নথি প্রয়োজন হয় না। জমি কীভাবে অর্জিত হয়েছে এবং রেকর্ডে কী ধরনের ভুল রয়েছে, তার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নির্ধারণ করতে হবে।
রেকর্ডে ভুল হলে কোথায় আবেদন করবেন?
অন্যের নামে জমি রেকর্ড হয়েছে বলে সব ক্ষেত্রে একই অফিসে একই ধরনের আবেদন করলেই সমাধান হবে—এমন নয়। প্রথমে ভুলের ধরন শনাক্ত করতে হবে।
১. নামের বানান বা হিসাবের ভুল হলে
খতিয়ানে নামের বানান, জমির পরিমাণ, হিস্যা বা গাণিতিক হিসাবে ভুল থাকলে সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্তৃপক্ষের কাছে সংশোধনের সুযোগ আছে কি না, তা জানতে হবে। ভুলটি সাধারণ করণিক ত্রুটি কি না এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তা সংশোধনের আইনগত ক্ষমতা রয়েছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
আবেদনের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক দলিল, খতিয়ান ও ভুলের সমর্থনে প্রয়োজনীয় নথি দিতে হতে পারে। তবে রেকর্ডের অবস্থা ও প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী প্রক্রিয়া আলাদা হতে পারে।
২. জরিপের খতিয়ানে অন্যের নাম থাকলে
জরিপের সময় প্রকৃত মালিকের পরিবর্তে অন্য ব্যক্তির নাম রেকর্ড হলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট জরিপের খতিয়ান, দলিল ও অন্যান্য নথি মিলিয়ে দেখতে হবে। খতিয়ানটি খসড়া, নাকি চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত—তা নিশ্চিত করা জরুরি।
চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত সর্বশেষ সংশোধিত রেকর্ড নিয়ে বিরোধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী ভূমি জরিপ ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার থাকতে পারে। রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ১৪৫ক ধারার অধীনে প্রতিষ্ঠিত এই ট্রাইব্যুনাল নির্দিষ্ট ধরনের রেকর্ডসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি করে।
এ ধরনের প্রতিকারের ক্ষেত্রে আইনগত শর্ত ও সময়সীমা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট রেকর্ড ও দলিল দেখিয়ে ভূমি আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া ভালো। সব রেকর্ডসংক্রান্ত সমস্যার সমাধান একই কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে হয় না।
৩. নামজারি অন্যের নামে হলে
জমির নিবন্ধিত দলিল নিজের নামে থাকা সত্ত্বেও নামজারি অন্য ব্যক্তির নামে হয়ে থাকলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট নামজারি মামলার নথি ও আদেশ সংগ্রহ করুন। কোন দলিল বা তথ্যের ভিত্তিতে ওই ব্যক্তির নামে নামজারি করা হয়েছে, তা জানা জরুরি।
নামজারির প্রক্রিয়ায় ভুল থাকলে প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী আপিল, পর্যালোচনা বা সংশোধনের সুযোগ থাকতে পারে। তবে জমির প্রকৃত মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকলে শুধু নামজারি সংশোধন করলেই সব সমস্যার নিষ্পত্তি হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
মনে রাখতে হবে, নামজারি মূলত ভূমি রাজস্বসংক্রান্ত রেকর্ড হালনাগাদের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। নামজারিতে নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়া এবং জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি এক বিষয় নয়।
৪. জাল দলিল বা প্রতারণার মাধ্যমে জমি রেকর্ড হলে
জাল দলিল, মিথ্যা তথ্য বা প্রতারণার মাধ্যমে কেউ জমি নিজের নামে রেকর্ড করিয়ে থাকলে বিষয়টি সাধারণ নামের ভুল হিসেবে দেখা উচিত নয়। এ ক্ষেত্রে মূল দলিল, আগের খতিয়ান এবং অভিযোগের সমর্থনে প্রাসঙ্গিক প্রমাণ সংগ্রহ করতে হবে।
সমস্যার ধরন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্তৃপক্ষ, দেওয়ানি আদালত বা অন্য উপযুক্ত আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতিকার চাইতে হতে পারে। কোন পথে এগোতে হবে, তা নির্ভর করবে রেকর্ডের অবস্থা, বিরোধের প্রকৃতি ও প্রযোজ্য আইনের ওপর।
আবেদন করার আগে যে ৫টি বিষয় যাচাই করবেন
১. জমির পরিচিতি মিলিয়ে নিন: মৌজার নাম, দাগ নম্বর, খতিয়ান নম্বর, জমির পরিমাণ ও চৌহদ্দি যাচাই করুন। কাছাকাছি দাগ নম্বর বা একই নামের একাধিক ব্যক্তি থাকলে বিশেষভাবে সতর্ক থাকুন।
২. মালিকানার ধারাবাহিকতা দেখুন: জমি কেনা, উত্তরাধিকার বা অন্য বৈধ উপায়ে অর্জিত হলে তার পক্ষে প্রয়োজনীয় দলিল ও নথি সংগ্রহ করুন। আগের মালিক থেকে বর্তমান দাবিদার পর্যন্ত হস্তান্তরের তথ্য মিলিয়ে দেখা জরুরি।
৩. রেকর্ডের পর্যায় নিশ্চিত করুন: খতিয়ানটি খসড়া, নাকি চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত—তা জানুন। রেকর্ডের পর্যায় অনুযায়ী সংশোধনের পদ্ধতি ও উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ ভিন্ন হতে পারে।
৪. বিরোধের প্রকৃতি বুঝুন: অন্য ব্যক্তি জমির মালিকানা দাবি করলে উভয় পক্ষের নথি যাচাইয়ের প্রয়োজন হতে পারে। প্রকৃত মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকলে শুধু প্রশাসনিক আবেদন যথেষ্ট নাও হতে পারে।
৫. সময়সীমা উপেক্ষা করবেন না: নির্দিষ্ট ধরনের আইনি প্রতিকারের ক্ষেত্রে সময়সীমা প্রযোজ্য হতে পারে। তাই সমস্যা জানার পর অযথা দেরি না করে প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ ও পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সরকারি ভূমিসেবা কোথায় পাবেন?
জমির রেকর্ড, নামজারি ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সেবা সম্পর্কে তথ্য পেতে নিচের ওয়েবসাইটগুলো ব্যবহার করতে পারেন।
-
ভূমি মন্ত্রণালয়ের পোর্টাল: https://land.gov.bd/
-
ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর: https://dlrs.gov.bd/
-
বাংলাদেশের প্রচলিত আইন: https://bdlaws.minlaw.gov.bd/
প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট উপজেলা ভূমি অফিস, জেলা প্রশাসনের ভূমি শাখা অথবা ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অফিসে যোগাযোগ করা যেতে পারে। জমির মালিকানা নিয়ে জটিল বিরোধ থাকলে প্রয়োজনীয় নথি দেখিয়ে ভূমি আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
অন্যের নামে জমি রেকর্ড হয়ে গেলে নিজের নামে সংশোধনের সুযোগ আছে কি না, তা নির্ভর করে মালিকানার প্রমাণ, ভুলের ধরন এবং রেকর্ডের বর্তমান অবস্থার ওপর। সাধারণ বানান বা হিসাবের ভুল, জরিপের খতিয়ানসংক্রান্ত বিরোধ, নামজারির সমস্যা এবং জালিয়াতির অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রতিকারের পথ এক নয়।
তাই প্রথমে জমির দলিল, খতিয়ান, নামজারি ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করুন। এরপর সমস্যার ধরন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্তৃপক্ষ বা উপযুক্ত আদালতের মাধ্যমে প্রতিকার চাওয়ার ব্যবস্থা নিন। আইনগত সময়সীমা প্রযোজ্য হতে পারে বলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে দেরি না করাই ভালো।
সোহাগ/
