সরকারি চাকরিতে প্রাপ্য ছুটি নেই, শর্তসাপেক্ষে মিলতে পারে ১২ মাস
সরকারি চাকরিতে কর্মরত অবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা, চিকিৎসা কিংবা বিশেষ প্রয়োজনে ছুটির দরকার হতে পারে। কিন্তু ছুটির হিসাবে পর্যাপ্ত অর্জিত ছুটি না থাকলে কী করবেন? এ পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে সরকারি কর্মচারীদের জন্য রয়েছে প্রাপ্যতাবিহীন ছুটি বা Leave Not Due নেওয়ার বিধান।
নির্ধারিত ছুটি বিধিমালা, ১৯৫৯-এর বিধি ৫ অনুযায়ী, যোগ্য স্থায়ী সরকারি কর্মচারীকে নির্দিষ্ট শর্তে চিকিৎসা সনদের ভিত্তিতে সমগ্র চাকরিজীবনে সর্বোচ্চ ১২ মাস পর্যন্ত প্রাপ্যতাবিহীন ছুটি মঞ্জুর করা যেতে পারে। চিকিৎসা সনদ ছাড়া এ ধরনের ছুটির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সীমা তিন মাস।
তবে এই ছুটি চাইলেই পাওয়া যায় না। কর্মচারীর চাকরির স্থায়িত্ব, ছুটির কারণ, প্রযোজ্য বিধিমালা এবং অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর ছুটি মঞ্জুরের বিষয়টি নির্ভর করে।
প্রাপ্যতাবিহীন ছুটি হলো এমন এক ধরনের ছুটি, যা নির্দিষ্ট বিধান ও শর্ত পূরণ সাপেক্ষে ছুটির হিসাবে পর্যাপ্ত ছুটি না থাকলেও মঞ্জুর করা যেতে পারে। এটি সাধারণ অর্জিত ছুটির মতো নয়। অনেকেই একে অগ্রিম ছুটি বা অ্যাডভান্স লিভ বলে থাকেন।
সহজভাবে বললে, কোনো সরকারি কর্মচারীর ছুটির হিসাবের জমা ছুটি শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু বিশেষ প্রয়োজনে আরও ছুটির দরকার। এমন পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী প্রাপ্যতাবিহীন ছুটির আবেদন করা যেতে পারে।
তবে আবেদন করলেই ছুটি অনুমোদিত হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ছুটির প্রয়োজনীয়তা, কর্মচারীর যোগ্যতা এবং ছুটি শেষে কাজে ফিরে দায়িত্ব পালনের সম্ভাবনাসহ প্রাসঙ্গিক বিষয় বিবেচনা করা হয়।
নির্ধারিত ছুটি বিধিমালা, ১৯৫৯-এর বিধি ৫-এর সাধারণ বিধান অনুযায়ী, যোগ্য স্থায়ী সরকারি কর্মচারীকে চিকিৎসা সনদের ভিত্তিতে সমগ্র চাকরিজীবনে সর্বোচ্চ ১২ মাস পর্যন্ত প্রাপ্যতাবিহীন ছুটি মঞ্জুর করা যেতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা বা চিকিৎসার প্রয়োজনে অর্জিত ছুটি অপর্যাপ্ত হলে এ বিধান প্রাসঙ্গিক হতে পারে। তবে এ জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সনদ ও অন্যান্য নথি জমা দিতে হতে পারে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ১২ মাস ছুটি পাওয়ার কথা বলা হলেও এটি স্বয়ংক্রিয় অধিকার নয়। সংশ্লিষ্ট কর্মচারী বিধির আওতাভুক্ত কি না এবং তাঁর আবেদন অনুমোদনযোগ্য কি না, তা যাচাই করতে হবে।
এ ছাড়া ১২ মাসের সীমা সমগ্র চাকরিজীবনের সর্বোচ্চ সীমা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবার আবেদনে নতুন করে ১২ মাস ছুটি পাওয়া যাবে, এমন নয়।
একই বিধির সাধারণ বিধান অনুযায়ী, চিকিৎসা সনদ ছাড়া প্রাপ্যতাবিহীন ছুটির ক্ষেত্রে সমগ্র চাকরিজীবনে সর্বোচ্চ তিন মাসের সীমা প্রযোজ্য।
অর্থাৎ, যোগ্য সরকারি কর্মচারী নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে চিকিৎসা সনদ ছাড়াও সীমিত মেয়াদে এ ধরনের ছুটির আবেদন করতে পারেন। তবে আবেদনকারীর পরিস্থিতি, ছুটির কারণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
মনে রাখতে হবে, তিন মাসও সর্বোচ্চ সীমা, নিশ্চিতভাবে মঞ্জুরযোগ্য ছুটির পরিমাণ নয়।
নির্ধারিত ছুটি বিধিমালা, ১৯৫৯-এর বিধি ৫ অনুযায়ী, অবসর-উত্তর ছুটির ক্ষেত্র বাদে নির্দিষ্ট শর্তে স্থায়ী সরকারি কর্মচারীকে প্রাপ্যতাবিহীন ছুটি মঞ্জুর করা যেতে পারে।
তাই শুধু দীর্ঘদিন সরকারি চাকরি করলেই কোনো কর্মচারী স্বয়ংক্রিয়ভাবে এ ছুটির যোগ্য হয়ে যাবেন, এমন ধারণা সঠিক নয়। চাকরি স্থায়ী হয়েছে কি না, সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর ক্ষেত্রে কোন বিধিমালা প্রযোজ্য এবং ছুটির জন্য নির্ধারিত শর্ত পূরণ হয়েছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
আবেদনের আগে নিজ দপ্তরের প্রশাসন শাখা বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছ থেকে যোগ্যতা নিশ্চিত করে নেওয়া ভালো।
প্রাপ্যতাবিহীন ছুটি সাধারণত অর্ধ-গড় বেতনে মঞ্জুর করার বিধান রয়েছে। তবে অর্ধ-গড় বেতনে ছুটি মানেই সব ক্ষেত্রে কর্মচারীর হাতে পাওয়া মোট অর্থ সরাসরি অর্ধেক হয়ে যাবে, এমন নয়। ছুটিকালীন বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী হিসাব করতে হয়।
এ কারণে ছুটির আবেদন করার আগে দপ্তরের হিসাব শাখা থেকে ছুটিকালীন বেতন এবং প্রযোজ্য অন্যান্য আর্থিক সুবিধার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া উচিত।
প্রাপ্যতাবিহীন ছুটির ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে ছুটি অর্জনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। নির্ধারিত ছুটি বিধিমালা, ১৯৫৯-এর বিধি ৫ অনুসারে, এ ধরনের ছুটি ভোগের পর কাজে ফিরে ভোগ করা ছুটির সমপরিমাণ ছুটি পুনরায় অর্জন না করা পর্যন্ত নতুন করে ছুটি পাওয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ প্রযোজ্য হতে পারে।
ধরা যাক, একজন কর্মচারী তিন মাস প্রাপ্যতাবিহীন ছুটি নিয়েছেন। ছুটি শেষে কাজে যোগ দেওয়ার পর তাঁকে প্রযোজ্য বিধি অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করে ভোগ করা ছুটির সমপরিমাণ ছুটি পুনরায় অর্জনের বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে।
কত দিন দায়িত্ব পালন করলে প্রয়োজনীয় ছুটি অর্জিত হবে, তা সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছুটি অর্জনের হার ও বিধির ওপর নির্ভর করবে।
প্রাপ্যতাবিহীন ছুটি মঞ্জুরের ক্ষেত্রে শুধু ছুটির হিসাব নয়, আরও কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে রয়েছে কর্মচারীর চাকরির ধরন, ছুটির কারণ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং ছুটি শেষে কাজে ফিরে আসার সম্ভাবনা।
কর্তৃপক্ষকে প্রযোজ্য বিধি অনুযায়ী সন্তুষ্ট হতে হয় যে কর্মচারী ছুটি শেষে দায়িত্বে ফিরবেন এবং ভবিষ্যতে দায়িত্ব পালন করে প্রয়োজনীয় ছুটি অর্জন করতে পারবেন।
তাই ব্যক্তিগত প্রয়োজন উল্লেখ করে আবেদন করলেই ছুটি অনুমোদিত হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। আবেদন যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে জমা দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় নথি সংযুক্ত করা জরুরি।
প্রাপ্যতাবিহীন ছুটি ভোগ করলে পেনশনযোগ্য চাকরিকাল বা অন্যান্য অবসর সুবিধার হিসাব কীভাবে হবে, তা সংশ্লিষ্ট বিধি ও চাকরির পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করতে পারে। একইভাবে, এ ধরনের ছুটি চলাকালে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণের আবেদন করলেও প্রাসঙ্গিক বিধান যাচাই করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে অনুমান করে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। অবসর গ্রহণের আগে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রশাসন ও হিসাব শাখা এবং প্রয়োজন হলে পেনশন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নিজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নিয়ম লিখিতভাবে জেনে নেওয়া ভালো।
প্রাপ্যতাবিহীন ছুটির আবেদন করার আগে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করুন:
১. আপনার চাকরি স্থায়ী হয়েছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট বিধিতে এ ছুটির যোগ্যতা রয়েছে কি না।
২. ছুটির হিসাবে কত দিন অর্জিত ছুটি অবশিষ্ট রয়েছে।
৩. চিকিৎসাজনিত কারণে আবেদন করলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সনদ ও অন্যান্য নথি প্রস্তুত আছে কি না।
৪. আগে প্রাপ্যতাবিহীন ছুটি নিয়ে থাকলে সমগ্র চাকরিজীবনের সর্বোচ্চ সীমার কতটুকু ব্যবহৃত হয়েছে।
৫. ছুটিকালীন বেতন এবং ছুটি শেষে নতুন করে ছুটি অর্জনের শর্ত কী।
৬. ছুটি পেনশনযোগ্য চাকরিকাল বা অবসর সুবিধায় প্রভাব ফেলতে পারে কি না।
৭. আবেদনটি যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হচ্ছে কি না।
সরকারি চাকরিতে ছুটির হিসাবে পর্যাপ্ত অর্জিত ছুটি না থাকলেও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে প্রাপ্যতাবিহীন ছুটির সুযোগ থাকতে পারে। নির্ধারিত ছুটি বিধিমালা, ১৯৫৯-এর বিধি ৫-এর সাধারণ বিধান অনুযায়ী, যোগ্য স্থায়ী সরকারি কর্মচারীর ক্ষেত্রে চিকিৎসা সনদসহ সর্বোচ্চ ১২ মাস এবং চিকিৎসা সনদ ছাড়া সর্বোচ্চ তিন মাসের সীমা প্রাসঙ্গিক।
তবে এই সীমা সব সরকারি কর্মচারীর জন্য একইভাবে প্রযোজ্য, এমন নয়। ছুটির ধরন, চাকরির অবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর ক্ষেত্রে কার্যকর বিধিমালা যাচাই করা জরুরি।
তাই আবেদন করার আগে নিজ দপ্তরের প্রশাসন শাখা বা হিসাব শাখা থেকে নিয়ম নিশ্চিত করে নিন। এতে ছুটি, বেতন ও ভবিষ্যৎ অবসর সুবিধা নিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত জটিলতা এড়ানো সহজ হবে।
সোহাগ/
