পৈতৃক জমির নামজারিতে বণ্টননামা দলিল কি লাগবে না, জেনে নিন নিয়ম
পৈতৃক জমির নামজারি করতে গিয়ে বণ্টননামা দলিল লাগবে কি না, তা নিয়ে অনেক উত্তরাধিকারীর মধ্যে বিভ্রান্তি রয়েছে। বিশেষ করে বাবা-মা বা পূর্বপুরুষের রেখে যাওয়া জমির একাধিক ওয়ারিশ থাকলে জমির রেকর্ড নিজেদের নামে হালনাগাদ করতে গিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দেয়। তবে সব ক্ষেত্রে বণ্টননামা দলিল বাধ্যতামূলক নয়। জমি যৌথভাবে নামজারি করা হবে, নাকি ভাগ করে পৃথক খতিয়ান তৈরি করা হবে, তার ওপর নির্ভর করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বরের পরিপত্র অনুযায়ী, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির সব ওয়ারিশের নামে যৌথ নামজারির ক্ষেত্রে শুধু বণ্টননামা দলিল নেই, এই কারণে আবেদন নামঞ্জুর করা যাবে না। তবে জমি ভাগ করে পৃথক খতিয়ান তৈরি করতে চাইলে প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী নিবন্ধিত বণ্টননামা দলিল প্রয়োজন হতে পারে।
হ্যাঁ, নির্দিষ্ট শর্তে বণ্টননামা দলিল ছাড়াই পৈতৃক জমির যৌথ নামজারি করা যায়। উত্তরাধিকারসূত্রে জমি পাওয়া সব ওয়ারিশ যদি তাঁদের আইনগত হিস্যা অনুযায়ী একই খতিয়ানে নাম অন্তর্ভুক্ত করতে চান, তাহলে সাধারণভাবে তাঁদের নামে যৌথ নামজারির আবেদন করা সম্ভব।
এ ক্ষেত্রে ওয়ারিশ সনদসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে হয়। ভূমি অফিস আবেদন যাচাই করে ওয়ারিশদের পরিচয়, মালিকানার ধারাবাহিকতা এবং প্রাপ্য হিস্যা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারে।
তবে বণ্টননামা ছাড়াই যৌথ নামজারি করা যায় বলে প্রত্যেক ওয়ারিশ নিজের পছন্দমতো নির্দিষ্ট জমিখণ্ড আলাদাভাবে নিজের নামে নামজারি করতে পারবেন, এমন নয়। জমি ভাগ করে পৃথক খতিয়ান তৈরি করার ক্ষেত্রে আলাদা নিয়ম প্রযোজ্য।
পৈতৃক জমির নামজারি করতে গেলে প্রথমেই বুঝতে হবে, যৌথভাবে জমির রেকর্ড হালনাগাদ করতে চান, নাকি জমি ভাগ করে প্রত্যেকের নামে আলাদা খতিয়ান করতে চান।
১. যৌথ নামজারি
ধরা যাক, কোনো ব্যক্তি ৬০ শতক জমি রেখে মারা গেছেন। তাঁর একাধিক আইনগত ওয়ারিশ রয়েছেন, কিন্তু তাঁরা এখনো জমি নিজেদের মধ্যে ভাগ করেননি।
এ ক্ষেত্রে সব ওয়ারিশের নাম ও প্রযোজ্য হিস্যা একই খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য যৌথ নামজারির আবেদন করা যেতে পারে। শুধু বণ্টননামা দলিল নেই, এই কারণে আবেদন বাতিল করার কথা নয়।
মনে রাখতে হবে, সব ওয়ারিশের অংশ সমান হবে, এমন নয়। প্রত্যেকের প্রাপ্য অংশ নির্ধারিত হবে প্রযোজ্য উত্তরাধিকার আইন ও সংশ্লিষ্ট পারিবারিক পরিস্থিতি অনুযায়ী।
২. পৃথক খতিয়ান বা আলাদা জমাভাগ
ওয়ারিশরা যদি নিজেদের মধ্যে জমি ভাগ করে প্রত্যেকের নামে আলাদা খতিয়ান করতে চান, তাহলে বণ্টনসংক্রান্ত কাগজপত্র গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী নিবন্ধিত বণ্টননামা দলিল প্রয়োজন হতে পারে।
অর্থাৎ, যৌথ নামজারির সুযোগ থাকা আর জমি ভাগ করে পৃথক খতিয়ান তৈরি করা এক বিষয় নয়। আবেদন করার আগে কোন পদ্ধতিতে নামজারি করতে চান, তা নির্ধারণ করা জরুরি।
উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির নামজারির ক্ষেত্রে জমির অবস্থা ও আবেদনের ধরন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ভিন্ন হতে পারে। সাধারণভাবে নিচের নথিগুলো প্রস্তুত রাখা উপকারী:
-
মৃত জমির মালিকের মৃত্যু সনদ
-
ওয়ারিশ সনদ
-
আবেদনকারীদের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য
-
জমির খতিয়ান ও দাগ নম্বরের তথ্য
-
আগের মালিকানার দলিল বা প্রাসঙ্গিক কাগজপত্র
-
ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের দাখিলা, যেখানে প্রয়োজন
-
জমি ভাগ করা হয়ে থাকলে বণ্টননামা দলিল বা বণ্টনসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় প্রমাণ
সব আবেদনে তালিকার প্রতিটি নথি বাধ্যতামূলক হবে, এমন নয়। জমির রেকর্ড, মালিকানার ইতিহাস এবং সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের যাচাই অনুযায়ী অতিরিক্ত কাগজপত্রও চাওয়া হতে পারে।
উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির নামজারি নিয়ে ভূমি মন্ত্রণালয় ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর একটি পরিপত্র জারি করে। ২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত বাসসের প্রতিবেদনে এ-সংক্রান্ত নির্দেশনার বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়।
নির্দেশনার মূল বিষয় হলো, মৃত ব্যক্তির সব ওয়ারিশের নাম একই খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করে যৌথ নামজারি করার ক্ষেত্রে বণ্টননামা দলিল না থাকার কারণে আবেদন নামঞ্জুর করা যাবে না।
অর্থাৎ, ওয়ারিশরা যদি জমি ভাগ না করে যৌথভাবে তাঁদের নাম রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত করতে চান, তাহলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবেদন করতে পারবেন। তবে পৃথক খতিয়ান তৈরির ক্ষেত্রে বণ্টন ও জমাভাগের নিয়ম আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে।
আবেদন করার আগে সর্বশেষ সরকারি নির্দেশনা ও সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের প্রয়োজনীয়তা যাচাই করে নেওয়া ভালো।
পৈতৃক জমির নামজারি করতে চাইলে প্রথমে জমির আগের খতিয়ান, মালিকানার দলিল এবং সব ওয়ারিশের তথ্য সংগ্রহ করুন। এরপর জমি যৌথভাবে নামজারি করবেন, নাকি ভাগ করে পৃথক খতিয়ান করবেন, তা ঠিক করুন।
যৌথ নামজারির ক্ষেত্রে সাধারণত ওয়ারিশ সনদসহ প্রয়োজনীয় নথি জমা দিতে হয়। আবেদন যাচাইয়ের সময় সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস ওয়ারিশদের পরিচয়, মালিকানার ধারাবাহিকতা এবং তাঁদের আইনগত হিস্যা পরীক্ষা করতে পারে।
সরকারি ভূমিসেবা ও প্রাসঙ্গিক নির্দেশনা জানতে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট land.gov.bd দেখা যেতে পারে। আবেদন করার আগে প্রয়োজনীয় নথির তালিকা ও প্রযোজ্য ফি সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে নিন।
পৈতৃক জমির নামজারির আবেদনে সব প্রকৃত ওয়ারিশের তথ্য সঠিকভাবে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ওয়ারিশের নাম বাদ পড়লে পরবর্তী সময়ে জমির মালিকানা ও অংশ নিয়ে বিরোধ দেখা দিতে পারে।
তাই আবেদন করার আগে ওয়ারিশদের পরিচয়, সম্পর্ক এবং প্রাপ্য হিস্যা যাচাই করুন। কোনো ওয়ারিশ আপত্তি জানালে বা জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকলে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানান। জটিল বিরোধের ক্ষেত্রে আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
নামজারি হলো সরকারি ভূমি রেকর্ড হালনাগাদের একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। নামজারি সম্পন্ন হওয়া মানেই জমির মালিকানা নিয়ে সব বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়া নয়।
মালিকানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে দলিল, উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত অধিকার, পূর্ববর্তী খতিয়ান এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ। তাই শুধু নামজারির ওপর নির্ভর না করে জমির মালিকানাসংক্রান্ত সব নথি সংরক্ষণ করা উচিত।
পৈতৃক জমির নামজারি করতে বণ্টননামা দলিল সব পরিস্থিতিতে বাধ্যতামূলক নয়। সব ওয়ারিশের নামে যৌথ নামজারির ক্ষেত্রে নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে বণ্টননামা ছাড়াই আবেদন করা যায়। অন্যদিকে, জমি ভাগ করে পৃথক খতিয়ান করতে চাইলে বণ্টনসংক্রান্ত দলিল ও প্রযোজ্য নিয়ম অনুসরণ করতে হয়।
তাই আবেদন করার আগে জমির ধরন, ওয়ারিশের সংখ্যা, প্রত্যেকের আইনগত হিস্যা এবং কাঙ্ক্ষিত নামজারির পদ্ধতি যাচাই করুন। এতে অপ্রয়োজনীয় ভোগান্তি কমতে পারে এবং জমির রেকর্ড হালনাগাদের প্রক্রিয়া সহজ হতে পারে।
সিদ্দিকা/
