সোহাগ আহমদে
সিনিয়র রিপোর্টার
সেন্ট মার্টিন ও মার্কিন সামরিক ঘাঁটি: গুজব নাকি ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা
সম্প্রতি চট্টগ্রামে মার্কিন বিমানবাহিনীর দলের আগমন এবং ড. ইউনূসের সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেন্ট মার্টিনে পর্যটক সীমিত করার পদক্ষেপ—এগুলো ঘিরে বঙ্গোপসাগরে আমেরিকার সামরিক ঘাঁটি তৈরির জল্পনা আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। যদিও এখন পর্যন্ত ঘাঁটি সংক্রান্ত কোনো অথেন্টিক তথ্য ফাঁস হয়নি, তবুও একটি মহল বারবার এই গুজব ছড়াচ্ছে। প্রশ্ন হলো: রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টিকারী এই ইস্যুটির নেপথ্যে আসলে কী ধরনের বাস্তবতা রয়েছে?
এই আলোচনায় সেন্ট মার্টিনের কৌশলগত গুরুত্ব, মার্কিন স্বার্থ এবং ঘাঁটি স্থাপনের বাস্তব উপযোগিতা বিশ্লেষণ করা হলো।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ: ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল
বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন তাদের মনোযোগ মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরিয়ে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নিবদ্ধ করেছে। তাদের এই কৌশলের নাম ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি। এই কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো উদীয়মান শক্তি চীনকে নিয়ন্ত্রণ করা।
* চীনের দুর্বলতা: চীনের বাণিজ্যের প্রধান রুট দক্ষিণ চীন সাগর। কিন্তু চীনের পশ্চিম অংশের পণ্য পরিবহনের জন্য সমুদ্রের প্রবেশাধিকার খুবই সীমিত। এই কারণে চীন পাকিস্তান (গদর বন্দর) ও মিয়ানমারের (রাখাইন) মাধ্যমে বিকল্প বাণিজ্যিক পথ তৈরির চেষ্টা করছে।
* মার্কিন লক্ষ্য: চীনের এই বিকল্প পথগুলো (বিশেষত মিয়ানমারের রাখাইন উপকূল) পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য। মিয়ানমারে সরাসরি প্রভাব বিস্তার করতে ব্যর্থ হওয়ায়, যুক্তরাষ্ট্রের থার্ড প্ল্যান হিসেবে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
* সেন্ট মার্টিনের গুরুত্ব: বঙ্গোপসাগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত স্থান হলো সেন্ট মার্টিন দ্বীপ। যদি যুক্তরাষ্ট্র এখানে সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পারে, তবে তারা সহজেই মিয়ানমারের রাখাইন বন্দর ব্যবহার করে চীনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও বাধা প্রদান করতে পারবে।
সেন্ট মার্টিন কি সামরিক ঘাঁটির জন্য উপযুক্ত
কৌশলগত অবস্থান চমৎকার হলেও, একটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের জন্য সেন্ট মার্টিন দ্বীপটি উপযুক্ত নয়। এর পেছনে কয়েকটি বাস্তবিক কারণ রয়েছে:
ছোট আয়তন: দ্বীপটির আয়তন মাত্র ৮ বর্গ কিলোমিটার। ৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ রানওয়েসহ পূর্ণাঙ্গ ঘাঁটির অবকাঠামো তৈরির জন্য এই স্থান যথেষ্ট নয়।
প্রবাল দ্বীপ ও অগভীর সমুদ্র: সেন্ট মার্টিনের চারপাশে সমুদ্রের গভীরতা কম। নৌবাহিনীর বিশাল যুদ্ধজাহাজ ভেড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় ১৫ মিটারের বেশি গভীরতা এখানে নেই। ফলে এখানে ফুল ফোর্সেস নেভাল বেস স্থাপন অসম্ভব।
ঘূর্ণিঝড় প্রবণতা: এই এলাকাটি প্রবল ঘূর্ণিঝড় প্রবণ। প্রতি বছরই জলচ্ছ্বাসে দ্বীপের অধিকাংশ অংশ ডুবে যায়। একটি সামরিক ঘাঁটির মূল্যবান স্থাপনা ও যুদ্ধ সরঞ্জাম এভাবে নিয়মিত ঝুঁকির মুখে ফেলা যৌক্তিক নয়।
প্রতিবেশীর সামরিক শক্তি: সেন্ট মার্টিনের খুব কাছেই ভারত মহাসাগরে ভারতের বিশাল আন্দামান-নিকোবর নেভাল বেস এবং চীনের কোকো দ্বীপে সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। এই দুই বিশাল শক্তির বিপরীতে সেন্ট মার্টিনের একটি ছোট্ট ঘাঁটি খুব বেশি কাজে দেবে না।
সিদ্ধান্ত: বড় আকারের ঘাঁটি (লার্জ স্কেলে বেস) এখানে বানানো অসম্ভব। যদি কিছু হয়, তবে তা হবে শুধু নজরদারির জন্য একটি ছোট স্কেলের অবস্থান, যা নিয়মিত ঘূর্ণিঝড়ের কবলেও পড়বে।
সম্ভাব্য সুবিধা ও অসুবিধা
যদি বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় মার্কিন সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত হয়, তবে তা দেশের জন্য মিশ্র ফল বয়ে আনতে পারে:
অসুবিধা (Challenges)
* চীন ও ভারতের অসন্তুষ্টি: চীন ব্যাপকভাবে অখুশি হবে এবং চীনের বিনিয়োগ ও বাণিজ্যে আঘাত আসতে পারে। ভারতও শত্রুতার মাত্রা বাড়াতে পারে।
* সার্বভৌমত্বের ঝুঁকি: সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করলে অনেক সময় ভিন্ন দেশের সেনাদের নিজস্ব আইনে বিচার করা যায় না, যা দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য আঘাত হতে পারে।
* পর্যটন ও উচ্ছেদ: সেন্ট মার্টিনে ঘাঁটি হলে পর্যটন শিল্প ধ্বংস হবে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের উচ্ছেদ করা লাগতে পারে।
সুবিধা (Opportunities)
* সামরিক আধুনিকীকরণ: উন্নত মার্কিন সামরিক প্রযুক্তির ছোঁয়া বাংলাদেশও পাবে এবং সামরিক বাহিনী শক্তিশালী হবে।
* সম্পর্ক উন্নয়ন: যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন হবে এবং আলোচনার মাধ্যমে বাণিজ্য সুবিধা বা বিনিয়োগ আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
* আঞ্চলিক শক্তি: সঠিক নেগোসিয়েশন করতে পারলে এই ঘাঁটির শক্তি ব্যবহার করে বাংলাদেশ আঞ্চলিক রাজনীতিতে শক্তিশালী অবস্থানে আসতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতি
বর্তমানে সেন্ট মার্টিন বা বঙ্গোপসাগরে মার্কিন ঘাঁটির ব্যাপারে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সম্প্রতি সাংবাদিকেরা দ্বীপ ঘুরে এসেও অবকাঠামোগত কোনো কাজের চিহ্ন দেখাননি। তাই সেন্ট মার্টিন নিয়ে সরকার হস্তান্তর করছে এমন গুঞ্জন সত্য হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায়, এই অঞ্চলে তাদের ঘাঁটি স্থাপন করার অনুমানটি একেবারে ভিত্তিহীন নয়।
দেশের সার্বভৌমত্ব এবং স্বার্থ রক্ষা হয় এমন সিদ্ধান্ত যেন সরকার গ্রহণ করে—সেটাই জনগণের প্রত্যাশা।
সোহাগ/
আপনার জন্য নির্বাচিত নিউজ
- ফেব্রুয়ারিতেই বাড়ছে বেতন, সর্বনিম্ন পাবেন ৪ হাজার টাকা
- আজকের সোনার বাজারদর: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
- টানা ৪৬ দিনের লম্বা ছুটিতে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
- মহার্ঘ ভাতা ঘোষণা: ৪ থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন বাড়ছে
- ভোটার নম্বর কত; জানুন এক ক্লিকে
- দেশে ফিরল প্রবাসীদের ৪ লাখ ৭২ হাজার পোস্টাল ব্যালট: জানুন ফলাফল
- রমজানের আগে কমে গেল এলপিজি গ্যাসের দাম
- নতুন পে-স্কেল নিয়ে গভর্নরের সতর্কবার্তা
- ভোটকেন্দ্রে নেওয়া যাবে মোবাইল, তবে মানতে হবে যেসব শর্ত
- পে-স্কেল ২০২৬: বেতন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন
- আজ এক ভরি ১৮, ২১, ২২ স্বর্ণের দাম
- ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল দেশে; মাত্রা কত
- আজকের সোনার বাজারদর: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
- নির্বাচনের আগেই বাংলাদেশকে অনেক বড় সুখবর দিলেন ট্রাম্প
- বাংলাদেশের বাজারে আজকের স্বর্ণের দাম
