টানা ৬৯ দিন সূর্য ডোবে না, তবু ঘড়ির সময় মানেন কেন
নিজস্ব প্রতিবেদক: পৃথিবীর এমন একটি দ্বীপ রয়েছে, যেখানে বছরের প্রায় ৬৯ দিন সূর্য অস্ত যায় না। গভীর রাতেও আকাশে দেখা যায় সূর্য, চারপাশ থাকে দিনের মতো আলোকিত। ফলে সেখানে দিন ও রাতের স্বাভাবিক পার্থক্য বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। নরওয়ের আর্কটিক অঞ্চলে অবস্থিত ছোট্ট দ্বীপটির নাম সোমারয় (Sommarøy)। তবে সূর্য না ডোবার এই দ্বীপের বাসিন্দারা কি সত্যিই ঘড়ির নিয়ম ছাড়াই জীবনযাপন করেন?
বাস্তব চিত্র অবশ্য প্রচারণার চেয়ে কিছুটা আলাদা। দ্বীপটিকে একসময় বিশ্বের প্রথম ‘সময়মুক্ত অঞ্চল’ হিসেবে গড়ে তোলার খবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেখানকার মানুষ ঘড়ির নিয়ম বাতিল করেননি। হোটেল, রেস্তোরাঁ, দোকানপাট ও স্কুল এখনো নির্ধারিত সময় মেনেই চলে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কীভাবে সূর্য না ডোবার এই দ্বীপকে ঘিরে ‘সময়মুক্ত জীবন’-এর ধারণা ছড়িয়ে পড়ে এবং বাস্তবে সেখানকার মানুষের জীবন কেমন।
নরওয়ের ট্রমসো শহর থেকে প্রায় ৫৬ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত সোমারয়। মাছ ধরার জন্য পরিচিত এই দ্বীপে প্রায় ৩০০ মানুষের বসবাস। চারপাশে পাহাড়, সমুদ্রের খাঁড়ি, ছোট বন্দর আর রঙিন বাড়িঘর দ্বীপটিকে দিয়েছে আলাদা সৌন্দর্য। গ্রীষ্মকালে প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করতে এখানে পর্যটকদের আনাগোনাও বাড়ে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আর্কটিক বৃত্তের উত্তরে অবস্থিত সোমারয়ে সাধারণত ১৮ মে থেকে ২৬ জুলাই পর্যন্ত সূর্য অস্ত যায় না। এই সময় মধ্যরাতেও আকাশে সূর্যের আলো দেখা যায়। ফলে ঘড়ির সময় আর আকাশের আলো মিলিয়ে দৈনন্দিন সময় অনুমান করা অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে শীতকালে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিপরীত। তখন দীর্ঘ সময় সূর্যের দেখা মেলে না। দিনের বেলাতেও দ্বীপের বাসিন্দাদের অন্ধকারের মধ্যে থাকতে হয়।
২০১৯ সালে সোমারয়কে ঘিরে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। তখন প্রচার করা হয়েছিল, দ্বীপটির বাসিন্দারা প্রচলিত ঘড়িনির্ভর জীবন থেকে বেরিয়ে আসতে চান। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে সূর্য অস্ত না যাওয়ায় তাঁরা নির্দিষ্ট সময়ের বাধ্যবাধকতা ছাড়াই জীবনযাপনের ধারণাকে সামনে আনেন।
এই প্রচারণার অংশ হিসেবে দ্বীপের কাছের একটি সেতুর রেলিংয়ে বেশ কিছু হাতঘড়ি ঝুলিয়ে রাখা হয়। স্থানীয় এক হোটেলমালিক বাসিন্দাদের স্বাক্ষরসংবলিত একটি আবেদনপত্র নরওয়ের পার্লামেন্টের এক সদস্যের কাছেও জমা দেন।
কিন্তু পরে জানা যায়, উদ্যোগটির পেছনে ছিল নরওয়ের সরকারি পর্যটন উন্নয়ন সংস্থা ইনোভেশন নরওয়ে। মূলত পর্যটকদের আকৃষ্ট করার উদ্দেশ্যেই এই প্রচারণা চালানো হয়েছিল। দ্বীপের কয়েকজন বাসিন্দা এতে যুক্ত থাকলেও অনেকেই বিষয়টি সম্পর্কে জানতেন না।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর সংস্থাটির প্রধানকে ক্ষমা চাইতে হয়। পরে সেতুতে ঝুলিয়ে রাখা ঘড়িগুলোও সরিয়ে নেওয়া হয়। অর্থাৎ, সোমারয় আনুষ্ঠানিকভাবে সময়মুক্ত অঞ্চল হয়ে ওঠেনি।
দ্বীপে বেড়াতে যাওয়া পর্যটকদের অভিজ্ঞতা বলছে, প্রকৃতির আলো-অন্ধকারের ব্যতিক্রমী চিত্র থাকলেও দৈনন্দিন জীবনে সময়ের গুরুত্ব এখনো রয়েছে।
পোলিশ পর্যটক এভা কাচিনস্কি বিবিসিকে জানান, সময়মুক্ত অঞ্চলের প্রচারণা শুনেই সোমারয়ে যাওয়ার আগ্রহ তৈরি হয়েছিল তাঁর। ব্যস্ত জীবন থেকে কয়েক দিনের জন্য ঘড়ির হিসাব ভুলে থাকতে চেয়েছিলেন তিনি।
কিন্তু দ্বীপে পৌঁছে দেখেন, সেখানকার দোকান ও রেস্তোরাঁও নির্দিষ্ট সময়ে বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি হোটেলের অভ্যর্থনাকক্ষও সারা রাত খোলা থাকে না। এতে প্রথমে কিছুটা হতাশ হয়েছিলেন তিনি।
পরে অবশ্য ফোন বন্ধ রেখে প্রকৃতির মধ্যে সময় কাটিয়ে স্বস্তি পান এভা। তাঁর মনে হয়েছে, সোমারয়ে সময়ের চাপ অন্য অনেক জায়গার তুলনায় কিছুটা কম।
ডাচ পর্যটক ওয়াউটার দে উইটের অভিজ্ঞতাও ছিল ব্যতিক্রমী। বিবিসিকে তিনি জানান, মধ্যরাতে সমুদ্রে সাঁতার কাটতে নেমেছিলেন তিনি। তখনো আকাশে সূর্য উজ্জ্বল ছিল। ঘড়ি না থাকলে সময় বোঝাই কঠিন হয়ে পড়ত।
সোমারয়ের বাসিন্দাদের অনেকেই ‘সময়মুক্ত অঞ্চল’ ধারণা নিয়ে খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না। তাঁদের মতে, দৈনন্দিন কাজকর্ম পরিচালনার জন্য সময়ের হিসাব প্রয়োজন।
তবে গ্রীষ্মকালে দ্বীপের জীবনযাত্রায় কিছুটা শিথিলতা দেখা যায়। স্থানীয় এক হোটেলকর্মীর ভাষ্য অনুযায়ী, দোকানে ক্রেতা না থাকলে মালিক মাছ ধরতে চলে যেতে পারেন। পরদিন স্কুল বন্ধ থাকলে শিশুরাও রাত পর্যন্ত জেগে থাকে। ছুটির সময় অনেকে নিজের সুবিধামতো কাজ করেন বলে জীবনযাত্রার গতিও কিছুটা ধীর হয়ে আসে।
কিন্তু এই স্বাভাবিক জীবনযাপনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক প্রচারণা শুরু হওয়ার পর বাসিন্দাদের অনেকে অস্বস্তিতে পড়েছিলেন। পর্যটকেরা দ্বীপের প্রকৃতি ও সংস্কৃতির পাশাপাশি ‘সময়মুক্ত অঞ্চল’ নিয়েও বেশি জানতে চাইতেন।
কয়েক বছর পর পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হয়েছে বলে ওই হোটেলকর্মী জানিয়েছেন। তবে প্রচারণার ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছে সোমারয়ের পরিচিতি বেড়েছে।
সোমারয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দৃশ্যগুলোর একটি হলো গভীর রাতে সূর্যের আলো। আকাশ উজ্জ্বল থাকলেও অনেক সময় রাস্তাঘাট প্রায় জনশূন্য থাকে। বাড়িঘর নীরব হয়ে আসে, যানবাহনের চলাচলও কমে যায়। ফলে আকাশের আলো দেখে সময় অনুমান করা কঠিন হয়ে পড়ে।
সব মিলিয়ে, সোমারয় বিশ্বের প্রথম আনুষ্ঠানিক ‘সময়মুক্ত অঞ্চল’ হয়ে ওঠেনি। দ্বীপের বাসিন্দারাও ঘড়ির নিয়ম বাতিল করেননি। কিন্তু বছরের প্রায় ৬৯ দিন সূর্য অস্ত না যাওয়ার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য সেখানে দিন-রাতের প্রচলিত ধারণাকে বদলে দেয়।
আর প্রকৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা দ্বীপটির তুলনামূলক ধীরগতির জীবনযাপনই এখনো পর্যটকদের কাছে সোমারয়ের অন্যতম আকর্ষণ।
সিদ্দিকা/
