সরকারি বেতন স্কেলে জ্যেষ্ঠদের চেয়ে জুনিয়রদের বেতন বেশি, উঠছে প্রশ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন নির্ধারণে জ্যেষ্ঠতা, পদোন্নতি ও বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের হিসাব নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। সরকারি কর্মচারীদের একটি অংশের অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে বেতন স্কেল পরিবর্তন এবং পদোন্নতির পর বেতন নির্ধারণের কারণে কোনো কোনো ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠ কর্মচারীর তুলনায় জুনিয়র কর্মচারীর মূল বেতন বেশি হতে পারে।
তবে এ ধরনের পার্থক্য সব সরকারি কর্মচারীর ক্ষেত্রে ঘটছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। নির্দিষ্ট কর্মচারীর পদ, গ্রেড, পদোন্নতির তারিখ, পূর্ববর্তী মূল বেতন এবং প্রযোজ্য বিধিমালা যাচাই করেই প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণ করা সম্ভব।
বেতন সমতাকরণ নিয়ে কেন প্রশ্ন উঠেছে?
সরকারি চাকরিতে বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু বর্তমান গ্রেড বিবেচনা করা হয় না। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে আগের মূল বেতন, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, পদোন্নতি এবং প্রযোজ্য বেতন নির্ধারণের নিয়ম।
কোনো কর্মচারী পদোন্নতি পেলে তাঁর নতুন মূল বেতন কীভাবে নির্ধারিত হবে, পরবর্তী ইনক্রিমেন্ট কীভাবে যুক্ত হবে এবং নতুন বেতন কাঠামোয় পুরোনো মূল বেতন কীভাবে সমন্বয় করা হবে—এসব বিষয় বেতন নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ।
এসব ধাপে হিসাবের পার্থক্য দেখা দিলে একই পদে বা তুলনীয় পদে কর্মরত জ্যেষ্ঠ ও কনিষ্ঠ কর্মচারীর বেতনের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের একাংশের দাবি।
কমল ও সজলের বেতনের তুলনায় কী দেখা যাচ্ছে?
প্রকাশিত একটি তুলনামূলক হিসাবচিত্রে কমল ও সজল নামে দুই কর্মচারীর বেতন নির্ধারণের উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে।
হিসাবচিত্র অনুযায়ী, কমল ১৫তম গ্রেডে কর্মরত ছিলেন। ২০১৮ সালের ৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত তাঁর মূল বেতন ছিল ১৫ হাজার ৮৭০ টাকা। অন্যদিকে, সজল ২০১৮ সালের ৮ ডিসেম্বর পদোন্নতি পেয়ে ১১তম গ্রেডে উন্নীত হন। পদোন্নতির পর তাঁর মূল বেতন দেখানো হয়েছে ১৫ হাজার ৯৮০ টাকা।
পরবর্তী সময়ের হিসাবেও দুজনের মূল বেতনের পার্থক্য তুলে ধরা হয়েছে।
| সময় | কমলের মূল বেতন | সজলের মূল বেতন |
|---|---|---|
| ২০১৮ সালের ডিসেম্বর | ১৫,৮৭০ টাকা | ১৫,৯৮০ টাকা |
| ২০২৫ সালের ১ জুলাই | ২২,৩৭০ টাকা | ২২,৫৩০ টাকা |
| ২০২৬ সালের ১ জুলাই | ৩৯,০০০ টাকা | ৩৭,০০০ টাকা |
| ২০২৭ সালের ১ জুলাই | ৪১,০০০ টাকা | ৩৮,৮০০ টাকা |
সূত্রে দেওয়া তুলনামূলক হিসাবচিত্রের তথ্য। এগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সরকারি বেতন বিবরণী নয়।
এই হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ জুলাই সজলের মূল বেতন কমলের চেয়ে ১৬০ টাকা বেশি দেখানো হয়েছে। আবার ২০২৬ ও ২০২৭ সালের সম্ভাব্য হিসাবচিত্রে কমলের মূল বেতন বেশি দেখানো হয়েছে।
তবে দুজনের গ্রেড ও পদোন্নতির ইতিহাস আলাদা হওয়ায় শুধু এই অঙ্ক দেখে বেতন নির্ধারণে ভুল হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া যায় না। সংশ্লিষ্ট সরকারি আদেশ, বেতন নির্ধারণী বিবরণী এবং প্রযোজ্য বিধি যাচাই করা প্রয়োজন।
নতুন বেতন কাঠামোয় সমন্বয়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ কেন?
পুরোনো বেতন কাঠামো থেকে নতুন কাঠামোয় যাওয়ার সময় একজন কর্মচারীর বিদ্যমান মূল বেতন নতুন স্কেলের সঙ্গে কীভাবে সমন্বয় করা হবে, তা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নতুন স্কেলে পুরোনো বেতনের সঙ্গে হুবহু মেলে এমন ধাপ না থাকলে প্রযোজ্য বিধি অনুযায়ী বেতন নির্ধারণ করতে হয়।
একই সঙ্গে পদোন্নতির সময় মূল বেতন নির্ধারণ এবং পরবর্তী বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের হিসাবও সঠিকভাবে প্রয়োগ করা জরুরি। এসব ক্ষেত্রে অসংগতি থাকলে তা সংশ্লিষ্ট নথি ও বিধিমালার আলোকে যাচাই করা প্রয়োজন।
তবে ২০০৯, ২০১৫ ও ২০২৬ সালের বেতন কাঠামোর মধ্যে সমন্বয়সংক্রান্ত সমস্যা রয়েছে—এমন কোনো সার্বিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি ও নির্দেশনা যাচাই করা দরকার।
বেতন সমতাকরণে কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে?
সরকারি কর্মচারীদের অভিযোগের প্রকৃত অবস্থা যাচাই এবং সম্ভাব্য অসংগতি সমাধানে কয়েকটি পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
১. বেতন নির্ধারণী নথি যাচাই: একই পদে বা তুলনীয় পদে কর্মরত জ্যেষ্ঠ ও কনিষ্ঠ কর্মচারীদের বেতন নির্ধারণের হিসাব তুলনা করা যেতে পারে।
২. পদোন্নতি ও ইনক্রিমেন্ট পুনঃপর্যালোচনা: পদোন্নতির আগে ও পরে মূল বেতন কীভাবে নির্ধারিত হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট বিধিমালার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
৩. বেতন নির্ধারণের সফটওয়্যার ও তথ্য পরীক্ষা: iBAS++-এ কোনো ক্ষেত্রে তথ্যগত বা প্রক্রিয়াগত অসংগতি পাওয়া গেলে তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় সংশোধনের ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
৪. স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া: কোন পরিস্থিতিতে বেতন সমতাকরণ প্রযোজ্য হবে এবং বেতন নির্ধারণে আপত্তি থাকলে কীভাবে প্রতিকার চাওয়া যাবে, সে বিষয়ে পরিষ্কার নির্দেশনা থাকলে কর্মচারীদের বিভ্রান্তি কমতে পারে।
৫. অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা কার্যকর করা: বেতন নির্ধারণে অসংগতি মনে হলে কর্মচারীরা যাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করে পর্যালোচনার সুযোগ পান, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সরকারি কর্মচারীদের প্রত্যাশা কী?
সরকারি কর্মচারীদের একটি অংশের প্রত্যাশা, বেতন নির্ধারণে জ্যেষ্ঠতা, পদোন্নতি ও বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের প্রভাব যথাযথভাবে বিবেচনা করা হবে। একই সঙ্গে নতুন বেতন কাঠামোয় মূল বেতন স্থানান্তরের ক্ষেত্রে কোনো বিধিগত বা প্রশাসনিক অসংগতি থাকলে তা শনাক্ত করে সমাধান করা হবে।
তবে বেতন সমতাকরণ নিয়ে অভিযোগের প্রকৃত পরিধি এবং কোনো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে কর্মচারী আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কি না, তা নির্ধারণে সরকারি নথি ও প্রযোজ্য বিধি যাচাই অপরিহার্য। অভিযোগের ভিত্তিতে সব কর্মচারীর বেতন নির্ধারণে ত্রুটি রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
আশা/
