প্রজ্ঞার জায়গায় নৌকা দাঁড়িপাল্লার ছবি, ফেরত নেওয়া হচ্ছে ৩০ লাখ পাঠ্যবই
নিজস্ব প্রতিবেদক: ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের ষষ্ঠ শ্রেণির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বইয়ে প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে মস্তিষ্কের বদলে দাঁড়িপাল্লার ছবি ব্যবহারের ঘটনায় সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। ইতোমধ্যে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পাঠানো বই ফিরিয়ে এনে দাঁড়িপাল্লার পরিবর্তে মস্তিষ্কের ছবি যুক্ত করে পুনরায় ছাপানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ কাজে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ১৭ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। সংশোধিত বই আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে ফেরত নেওয়া বইয়ের সঠিক সংখ্যা ও অতিরিক্ত ব্যয়ের হিসাব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মূল তথ্য দিয়ে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
কেন ফেরত নেওয়া হচ্ছে পাঠ্যবই?
ষষ্ঠ শ্রেণির আইসিটি বইয়ের ‘উপাত্ত ও তথ্য’ অধ্যায়ে জ্ঞানের পিরামিডের চারটি স্তর দেখানো হয়েছে। স্তরগুলো হলো উপাত্ত, তথ্য, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা। বইটির নকশায় উপাত্ত, তথ্য ও জ্ঞানের জন্য বিভিন্ন প্রতীক ব্যবহারের পাশাপাশি সর্বোচ্চ স্তর প্রজ্ঞা বোঝাতে দাঁড়িপাল্লার ছবি রাখা হয়েছিল।
দাঁড়িপাল্লা বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক দলের নিবন্ধিত নির্বাচনি প্রতীক হওয়ায় পাঠ্যবইয়ে এর ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। এরপর ছবিটি পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয় এনসিটিবি।
সংস্থাটির দাবি, ২০২৫ সালের বইয়ের পুরোনো নকশা ভুলক্রমে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বইয়েও যুক্ত হয়েছে। সংশোধিত সংস্করণে ‘প্রজ্ঞা’ শব্দটি অপরিবর্তিত রেখে সেখানে মস্তিষ্কের ছবি ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
জেলা-উপজেলায় পাঠানো বই ফেরত নেওয়ার উদ্যোগ
এনসিটিবি সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ষষ্ঠ শ্রেণির আইসিটি বইয়ের মুদ্রণকাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে এবং বইয়ের একটি বড় অংশ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পাঠানো হয়েছে।
নকশায় ত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পর শুক্রবারের একটি অনলাইন সভায় বইগুলো ফিরিয়ে এনে সংশোধনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ জন্য মাঠপর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
এনসিটিবির লক্ষ্য, সংশোধিত বই ৩০ নভেম্বরের মধ্যে সরবরাহ করা। তবে বই সংগ্রহ, ছবি পরিবর্তন, পুনর্মুদ্রণ, বাঁধাই ও পরিবহনের পুরো প্রক্রিয়া নির্ধারিত সময়ে শেষ করা সংস্থাটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
পুনর্মুদ্রণে বাড়তি ব্যয় কত?
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ষষ্ঠ শ্রেণির আইসিটি বই প্রায় ৩৮ লাখ কপি ছাপানো হচ্ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বইয়ের মুদ্রণকাজ শেষ হয়েছে। মাঠপর্যায়ে পাঠানো বইয়ের সংখ্যা নিয়ে প্রতিবেদনে ২০ লাখ থেকে ৩০ লাখের বিভিন্ন হিসাব এসেছে।
প্রতিটি পাঠ্যবই ছাপাতে আনুমানিক ৫৭ টাকা খরচের তথ্য ধরে ৩০ লাখ বই পুনর্মুদ্রণ করতে প্রায় ১৭ কোটি ১০ লাখ টাকা লাগতে পারে। তবে এটি প্রতি বইয়ের উল্লিখিত মুদ্রণব্যয় ধরে করা আনুমানিক হিসাব। প্রকৃত অতিরিক্ত ব্যয় নির্ভর করবে কতটি বই ফেরত নেওয়া হবে এবং সংশোধন ও পুনর্মুদ্রণে মোট কত টাকা লাগবে, তার ওপর।
২০২৭ শিক্ষাবর্ষে ছাপা হচ্ছে প্রায় ৩১ কোটি বই
আগামী শিক্ষাবর্ষে প্রাক্-প্রাথমিক থেকে নবম-দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ৩১ কোটি পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ চলছে। এর মধ্যে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্যও বই রয়েছে।
প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মাধ্যমিক স্তরে ২২ কোটির বেশি এবং প্রাথমিক স্তরে প্রায় ৮ কোটি ২১ লাখ ৬৭ হাজার বই ছাপানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সব মিলিয়ে বই ছাপানোর সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা।
এনসিটিবির তথ্যের বরাতে আরও বলা হয়েছে, প্রাথমিক স্তরের বই ছাপানোর কাজ শুরুর প্রায় এক মাস পর মাধ্যমিক স্তরের বই ছাপানো শুরু হয়। ফলে মাধ্যমিকের বই সংশোধন ও পুনর্মুদ্রণের ক্ষেত্রে সময় ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নতুন শিক্ষাবর্ষে যুক্ত হচ্ছে চারটি নতুন বই
২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে বিভিন্ন বিষয়ে পরিবর্তনের পাশাপাশি চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে দুটি করে মোট চারটি নতুন বই যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
চতুর্থ শ্রেণির নতুন বই দুটি হলো ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ ও ‘খেলাধুলা’। ষষ্ঠ শ্রেণির জন্য পরিকল্পিত বই দুটি হলো ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ ও ‘আনন্দময় শিক্ষা’।
প্রতিবেদনে এনসিটিবির এক কর্মকর্তার বরাতে বলা হয়েছে, রোববার (২৫ অক্টোবর) জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসিসি) সভা ডাকা হয়েছে। সেখানে অনুমোদন পাওয়া গেলে নতুন বইগুলোর মুদ্রণ কার্যাদেশ দেওয়ার কথা রয়েছে।
এ ছাড়া নবম-দশম শ্রেণির বাংলা বইয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা ‘স্বাধীনতাযুদ্ধের স্মৃতি’ নিবন্ধ যুক্ত করার পরিকল্পনা এবং মুক্তিযুদ্ধসহ ইতিহাসের বিভিন্ন বিষয়ে পরিবর্তনের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পাঠ্যবইয়ের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন
পাঠ্যবইয়ে রাজনৈতিক দলের নির্বাচনি প্রতীকের ব্যবহার নিয়ে বিতর্কের পর বই প্রণয়ন ও সম্পাদনার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শিক্ষাবিদদের মতে, পাঠ্যবইয়ে এমন কোনো প্রতীক বা উপাদান থাকা উচিত নয়, যা শিক্ষার বস্তুনিষ্ঠতা নিয়ে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক তৈরি করে।
তাদের মতে, কীভাবে পুরোনো নকশাটি নতুন সংস্করণে ফিরে এল, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। পাশাপাশি ভবিষ্যতে পাঠ্যবইয়ের লেখা, ছবি ও নকশা চূড়ান্ত করার আগে আরও সতর্ক যাচাইব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
সব মিলিয়ে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের ষষ্ঠ শ্রেণির আইসিটি বইয়ের ছবি পরিবর্তনের উদ্যোগে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দ্রুত সংশোধন শেষ করা, অতিরিক্ত ব্যয়ের সঠিক হিসাব নির্ধারণ এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শিক্ষার্থীদের হাতে নির্ভুল পাঠ্যবই পৌঁছে দেওয়া।
আশা/
