৩ হাজার লাউ বিক্রির টাকায় মিলছে না ১ কেজি গরুর মাংস
নিজস্ব প্রতিবেদক: পঞ্চগড়ের আটোয়ারীতে লাউয়ের বাম্পার ফলন হলেও ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না কৃষকেরা। উৎপাদন খরচ তুলতে না পেরে অনেকেই বাগানের পরিচর্যা বন্ধ করে দিয়েছেন। কেউ গাছ কেটে ফেলছেন, আবার কেউ গবাদিপশুকে খাওয়াচ্ছেন জমিতে উৎপাদিত লাউ। কৃষকদের দাবি, মাঠপর্যায়ে লাউয়ের দাম এতটাই কম যে দুই থেকে তিন হাজার লাউ বিক্রি করেও এক কেজি গরুর মাংস কেনার টাকা জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাজারে প্রতি কেজি গরুর মাংসের দাম ৭৫০ টাকা। অথচ উৎপাদন খরচ, সার-কীটনাশক এবং শ্রমিকের মজুরি মেটানোর পর লাউ বিক্রি করে তাদের হাতে তেমন অর্থ থাকছে না। অন্যদিকে খুচরা বাজারে প্রতি পিস লাউ ২০ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কৃষকেরা।
৪০ শতক জমিতে খরচ ৭০ হাজার, বিক্রি মাত্র ৩ হাজার টাকা
আটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের তেলিপাড়া এলাকার কৃষক দুলাল ইসলাম ৪০ শতক জমিতে লাউ চাষ করেছিলেন। এই চাষে তাঁর খরচ হয়েছে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা। কিন্তু উৎপাদিত লাউ বিক্রি করে সব মিলিয়ে পেয়েছেন মাত্র ৩ হাজার টাকা।
দুলাল ইসলামের ভাষ্য, এই সামান্য আয় দিয়ে শ্রমিকের মজুরিও পরিশোধ করা সম্ভব নয়। লোকসানের চাপ সহ্য করতে না পেরে তিনি শেষ পর্যন্ত লাউয়ের বাগান কেটে ফেলেছেন। কিছু লাউ গবাদিপশুকে খাওয়াচ্ছেন।
তিনি বলেন, “ভাবতে পারেন, আমরা কৃষকরা লাউ আবাদ করে কতটা লোকসানে আছি। দুই থেকে তিন হাজার পিস লাউ বিক্রি করেও এক কেজি গরুর মাংস কেনা যায় না। তাই মনের কষ্টে বাগান কেটে ফেলেছি। লাউ গরুকে খাওয়াচ্ছি।”
দুলালের অভিযোগ, কৃষকেরা মাঠে লাউয়ের ন্যায্য দাম না পেলেও খুচরা বাজারে ক্রেতাদের প্রতি পিস লাউ ২০ থেকে ৩০ টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে।
১০ দিন ধরে বাগানের পরিচর্যা বন্ধ
একই উপজেলার ঝলঝলি উলারচাপ এলাকার লাউচাষি আনসারুল ইসলামও লোকসানের মুখে পড়েছেন। তিনি জানান, গত ১০ দিন ধরে লাউয়ের বাগানে কোনো পরিচর্যা করছেন না। সার ও কীটনাশকের দাম বৃদ্ধি এবং শ্রমিকের মজুরি তাঁর উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে।
আনসারুল ইসলামের তথ্য অনুযায়ী, শ্রমিকদের প্রতিদিন ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা মজুরি দিতে হয়। অথচ এবার লাউয়ের সর্বোচ্চ দাম পেয়েছেন প্রতি পিস মাত্র ৫ টাকা। এই দামে উৎপাদন খরচ তোলা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, “এভাবে কষ্টের ফসলের দাম না পেলে মানুষ কৃষি ছেড়ে দেবে।”
কৃষকদের আশঙ্কা, উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারদর দীর্ঘদিন কম থাকলে আগামীতে অনেকেই লাউ চাষে আগ্রহ হারাতে পারেন।
বাজারে লাউয়ের দাম কমার কারণ কী?
স্থানীয় ব্যবসায়ী সলেমান আলীর মতে, এবার আটোয়ারীতে লাউয়ের আবাদ ও ফলন দুটিই ভালো হয়েছে। কিন্তু উৎপাদন বেশি হওয়ায় বাজারে সরবরাহ বেড়েছে। সেই তুলনায় চাহিদা না থাকায় কৃষকেরা কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছেন না।
তিনি জানান, বাইরের বাজারেও লাউয়ের ভালো দাম না থাকায় স্থানীয় কৃষকদের উৎপাদিত লাউ বেশি দামে বিক্রির সুযোগ তৈরি হচ্ছে না।
কৃষিপণ্যের উৎপাদন বেশি হলেও সংরক্ষণ, পরিবহন এবং বাজারজাতের পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকলে কৃষকেরা অনেক সময় ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হন। লাউয়ের মতো দ্রুত পচনশীল সবজির ক্ষেত্রে সময়মতো বিক্রি করতে না পারলে লোকসানের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
খুচরা বাজারে দাম বেশি, কৃষকের হাতে টাকা কম
আটোয়ারীর লাউচাষিদের অভিযোগ, মাঠপর্যায়ে তাঁরা প্রতি পিস লাউ সর্বোচ্চ ৫ টাকায় বিক্রি করছেন, অথচ খুচরা বাজারে একই লাউ ২০ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এই দামের ব্যবধানের কারণ জানতে স্থানীয় বাজারব্যবস্থা, পরিবহন খরচ এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রয়োজন।
তবে কৃষকদের বর্তমান পরিস্থিতি তাঁদের উৎপাদন ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্যের বিষয়টি সামনে এনেছে। জমি প্রস্তুত, সার, কীটনাশক, পরিচর্যা ও শ্রমিকের মজুরি দেওয়ার পর বিক্রির টাকা দিয়ে খরচ তুলতে না পারলে পরবর্তী মৌসুমে চাষাবাদ চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
কৃষকদের লোকসান, প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ
লাউচাষিদের দাবি, উৎপাদিত সবজির ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে বাজারজাতের সুযোগ বাড়ানো এবং কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি পণ্য কেনার ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বিভিন্ন বাজারে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা গেলে কৃষকদের লোকসান কমাতে সহায়তা হতে পারে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে আটোয়ারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোস্তাক আহমেদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।
ফলে এ বিষয়ে কৃষি বিভাগের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ ও ব্যবসায়ীদের বক্তব্যে আটোয়ারীতে লাউয়ের অতিরিক্ত উৎপাদন এবং কম দাম নিয়ে যে সংকটের চিত্র উঠে এসেছে, তা কৃষকের আয় ও ভবিষ্যৎ চাষাবাদ নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
সোহাগ/
