বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কা, মহাঝুঁকিতে যেসব এলাকা
নিজস্ব প্রতিবেদক: বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপকে ঘিরে ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আবহাওয়ার অনুকূল পরিস্থিতি থাকলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে এটি আরও শক্তিশালী হয়ে গভীর নিম্নচাপ এবং পরে ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে। সম্ভাব্য এই ঘূর্ণিঝড় ভারতের পূর্ব উপকূলের দিকে এগোতে পারে বলে প্রাথমিক পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে। তবে এর গতিপথ, শক্তি ও আঘাতের সময় এখনো নিশ্চিত নয়।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং বেসরকারি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ সংস্থা বাংলাদেশ ওয়েদার অবজারভেশন টিমের (বিডব্লিউওটি) পৃথক পূর্বাভাসে বঙ্গোপসাগরের এই পরিস্থিতির কথা উঠে এসেছে।
আগামী ২ থেকে ৩ দিনে ঘূর্ণিঝড়ের আশঙ্কা
বিডব্লিউওটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, মধ্য বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত লঘুচাপটি পরবর্তী ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সুস্পষ্ট লঘুচাপে পরিণত হতে পারে। এরপর আরও শক্তি সঞ্চয় করে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নিম্নচাপ বা গভীর নিম্নচাপে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অনুকূল পরিস্থিতি বজায় থাকলে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে এটি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হতে পারে।
প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড়টি আগামী ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা থেকে ২৮ অক্টোবর সকালের মধ্যে ভারতের পূর্ব উপকূলে আঘাত হানতে পারে। তবে এটি প্রাথমিক পূর্বাভাস। আবহাওয়াব্যবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সম্ভাব্য গতিপথ ও আঘাতের সময়ও বদলে যেতে পারে।
বাংলাদেশে সরাসরি আঘাতের আশঙ্কা কতটা?
প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড়টির সরাসরি বাংলাদেশে আঘাত হানার ঝুঁকি তুলনামূলক কম বলে জানিয়েছে বিডব্লিউওটি। তবে এর অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশ পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত। ঘূর্ণিঝড়ের পরোক্ষ প্রভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টি বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগর উত্তাল হয়ে উঠলে উপকূলীয় এলাকা ও গভীর সাগরে থাকা মাছ ধরার নৌকা এবং ট্রলারের জন্য ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিডব্লিউওটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২৭ ও ২৮ অক্টোবর থেকে ১ ও ২ নভেম্বরের মধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টির একটি শক্তিশালী প্রবণতা দেখা দিতে পারে। বৃষ্টির পরিমাণ ও বিস্তার নির্ভর করবে ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ এবং পরবর্তী আবহাওয়াগত পরিস্থিতির ওপর।
গভীর সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের সতর্ক থাকার পরামর্শ
সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে বঙ্গোপসাগর উত্তাল হয়ে উঠতে পারে। এতে গভীর সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া নৌকা ও ট্রলারের চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে সমুদ্রে অবস্থানরত জেলেদের আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ সতর্কবার্তা অনুসরণ করতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলা এবং আবহাওয়ার পরিস্থিতি বিবেচনা করে নিরাপদ সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।
পাকা ধান নিয়ে দুশ্চিন্তা, কৃষকদের জন্য কী পরামর্শ?
সম্ভাব্য বৃষ্টিপাতের কারণে কৃষি খাতেও ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে যেসব জমিতে ধান পেকে গেছে, সেসব জমিতে বৃষ্টির পানি জমলে ধান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। অতিরিক্ত আর্দ্রতায় ধানে পচন, অঙ্কুরোদ্গম এবং গাছ হেলে পড়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
বিডব্লিউওটির পরামর্শ অনুযায়ী, যেসব জমির ধান কাটার উপযুক্ত হয়েছে, সেগুলো ২৬ অক্টোবরের মধ্যে কেটে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিতে পারেন কৃষকেরা। তবে ধান কাটার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে স্থানীয় আবহাওয়ার অবস্থা ও ফসলের পরিপক্বতা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
নতুন সবজি চাষ ও বীজতলা তৈরিতে সতর্কতা
যেসব কৃষক শীতকালীন সবজি চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছেন অথবা নতুন করে বীজতলা তৈরি করতে চান, তাঁদের বৃষ্টির পূর্বাভাস বিবেচনায় নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। জমিতে অতিরিক্ত পানি জমলে বীজ ও চারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই স্থানীয় আবহাওয়ার পরিস্থিতি বুঝে বীজতলা তৈরির সময় নির্ধারণ করা ভালো।
ইতোমধ্যে যেসব জমিতে রবি ফসল বা সবজি রয়েছে, সেখানে পানি জমে থাকা ঠেকাতে নালা পরিষ্কার রাখা এবং দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা জরুরি। পাশাপাশি বীজ, সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ বৃষ্টির পানি থেকে রক্ষা করতে নিরাপদ স্থানে রাখা উচিত। প্রয়োজন হলে উপযুক্ত আবরণ ব্যবহার করে এসব উপকরণ ঢেকে রাখা যেতে পারে।
এখন কী করবেন?
বঙ্গোপসাগরের লঘুচাপটি শেষ পর্যন্ত কতটা শক্তিশালী হবে, তা পরবর্তী কয়েক দিনের আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করছে। তাই ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাব্য গতিপথ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের হালনাগাদ পূর্বাভাস অনুসরণ করা প্রয়োজন।
জেলেদের সমুদ্রের পরিস্থিতি সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। অন্যদিকে কৃষকদের পাকা ফসল রক্ষা, জমিতে পানি নিষ্কাশন এবং কৃষি উপকরণ নিরাপদে রাখার প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সরকারি আবহাওয়া সতর্কবার্তা ও স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা অনুসরণ করাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
সোহাগ/
