নভেম্বর থেকে স্মার্টকার্ড ছাপানোর পরিকল্পনা
নিজস্ব প্রতিবেদক: জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) স্মার্টকার্ড ছাপানোর কার্যক্রম আবারও পুরোদমে শুরু করার উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ব্ল্যাংক কার্ডের সংকট ও প্রিন্টিং মেশিনের সমস্যার কারণে দীর্ঘদিন ধরে বাধাগ্রস্ত হওয়া এই কার্যক্রম আগামী নভেম্বর থেকে পূর্ণ সক্ষমতায় চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে এতে স্মার্টকার্ড পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা বিপুলসংখ্যক ভোটারের জন্য অগ্রগতি হতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত আঞ্চলিক কার্যালয়গুলোতে ৮ কোটি ৭৫ লাখের বেশি স্মার্টকার্ড পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে প্রায় ৭ কোটি ৩৬ লাখ কার্ড। বিতরণের অপেক্ষায় রয়েছে আরও প্রায় ১ কোটি ৩৯ লাখ কার্ড।
তবে দেশের মোট ভোটারের তুলনায় স্মার্টকার্ড বিতরণ এখনো অসম্পূর্ণ। ইসির গত জুন পর্যন্ত তৈরি করা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৪ কোটির বেশি ভোটার এখনো উন্নতমানের জাতীয় পরিচয়পত্র হাতে পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।
কেন বন্ধ ছিল স্মার্টকার্ড ছাপানোর কার্যক্রম?
স্মার্টকার্ড ছাপানোর কাজে দীর্ঘদিন ধরে ব্ল্যাংক কার্ডের ঘাটতি ছিল। পাশাপাশি কার্ডে নাগরিকদের তথ্য সংযোজনের জন্য ব্যবহৃত প্রিন্টিং বা পার্সোনালাইজেশন মেশিনেও সমস্যা দেখা দিয়েছিল।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, ব্ল্যাংক কার্ড সরবরাহের জন্য দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে চুক্তি করা হলেও নির্ধারিত সময়ে প্রয়োজনীয় কার্ড সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। ফলে স্মার্টকার্ড তৈরি ও বিতরণ কার্যক্রমে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়।
সম্প্রতি বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি (বিএমটিএফ) থেকে এক কোটিরও বেশি ব্ল্যাংক কার্ড সংগ্রহ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। বাকি কার্ড সংগ্রহের প্রক্রিয়াও চলছে। একই সঙ্গে প্রিন্টিং মেশিনের সমস্যার সমাধান হওয়ায় কার্যক্রম আবারও গতিশীল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নভেম্বর থেকে কীভাবে এগোবে স্মার্টকার্ড ছাপানো?
নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী নভেম্বর থেকে পার্সোনালাইজেশন সেন্টারে পূর্ণ সক্ষমতায় স্মার্টকার্ড ছাপানোর কার্যক্রম চালানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানিয়েছেন, পার্সোনালাইজেশন সেন্টার নিয়ে যে সমস্যা ছিল, তা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী মাস থেকে সেখানে পূর্ণ সক্ষমতায় স্মার্টকার্ড প্রিন্ট করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে ছাপানো শুরু হওয়ার পর কোন এলাকায় কত দ্রুত কার্ড বিতরণ করা হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সময়সূচি প্রকাশিত না হলে সব ভোটার একই সময়ে কার্ড পাবেন, এমনটি ধরে নেওয়া যাবে না।
কোন কোন এলাকায় স্মার্টকার্ড বিতরণ সম্পন্ন হয়েছে?
ইসি কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, নওগাঁ, গাইবান্ধা, পঞ্চগড়, গোপালগঞ্জ, চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, মাগুরা, মেহেরপুর, নড়াইল, ঝিনাইদহ, বরগুনা, ঝালকাঠি ও পিরোজপুর জেলার সব উপজেলায় স্মার্টকার্ড বিতরণ সম্পন্ন হয়েছে।
অন্যদিকে, দেশের ৪০৪টি নির্বাচনী থানা বা উপজেলার মধ্যে ১১৫টিতে এখনো স্মার্টকার্ড বিতরণ শুরু হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বাকি এলাকাগুলোর কিছু জায়গায় বিতরণ কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
ফলে স্মার্টকার্ড ছাপানোর কার্যক্রম পুরোদমে চালু হলেও সংশ্লিষ্ট এলাকার কার্ড প্রস্তুত, পরিবহন ও বিতরণের ওপর নির্ভর করবে ভোটারদের হাতে কার্ড পৌঁছানোর সময়।
কীভাবে শুরু হয়েছিল স্মার্টকার্ড প্রকল্প?
বাংলাদেশে ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা তৈরির কার্যক্রম শুরু হয় ২০০৮ সালে। পরে ভোটার তালিকার তথ্যের ভিত্তিতে নাগরিকদের উন্নতমানের জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এই লক্ষ্য সামনে রেখে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ২০১১ সালে আইডিইএ বা স্মার্টকার্ড প্রকল্প গ্রহণ করে নির্বাচন কমিশন। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে ফ্রান্সের প্রতিষ্ঠান অবার্থার টেকনোলজিসের সঙ্গে ৯ কোটি স্মার্টকার্ড সরবরাহের চুক্তি করা হয়। এরপর ২০১৬ সালের ৩ অক্টোবর স্মার্টকার্ড বিতরণ শুরু হয়।
তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চুক্তি অনুযায়ী কার্ড সরবরাহ করতে না পারায় ২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি বাতিল করা হয়। পরে দেশীয় প্রতিষ্ঠান বিএমটিএফের কাছ থেকে স্মার্টকার্ড সংগ্রহের উদ্যোগ নেয় নির্বাচন কমিশন।
ব্ল্যাংক কার্ড কেনার জন্য নেওয়া হয় নতুন উদ্যোগ
আইডিইএ প্রকল্পের পর ২০২০ সালের ২৪ নভেম্বর আইডিইএ দ্বিতীয় প্রকল্প গ্রহণ করে নির্বাচন কমিশন। এ প্রকল্পের আওতায় বিএমটিএফের কাছ থেকে ৩ কোটি ব্ল্যাংক স্মার্টকার্ড সরবরাহের পরিকল্পনা ছিল।
তবে করোনা মহামারির পর বৈশ্বিক আর্থিক সংকট ও ডলারের বিনিময়মূল্য বেড়ে যাওয়ায় চুক্তিতে পরিবর্তন আনা হয়। মূল পরিকল্পনার পরিবর্তে কার্ডপ্রতি ১৭২ টাকা দরে ২ কোটি ৩৬ লাখ কার্ড সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই সরবরাহ থেকে সম্প্রতি এক কোটিরও বেশি ব্ল্যাংক কার্ড সংগ্রহ করা হয়েছে। বাকি কার্ড সংগ্রহের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
স্মার্টকার্ড পেতে ভোটারদের কী জানা প্রয়োজন?
নভেম্বর থেকে স্মার্টকার্ড ছাপানোর কার্যক্রম পূর্ণ সক্ষমতায় চালুর পরিকল্পনা থাকলেও নির্দিষ্ট এলাকায় কবে বিতরণ শুরু হবে, তা জানতে নির্বাচন কমিশনের পরবর্তী ঘোষণা ও স্থানীয় নির্বাচন অফিসের তথ্য অনুসরণ করা প্রয়োজন।
যাঁরা এখনো স্মার্টকার্ড পাননি, তাঁরা নিজেদের এলাকার নির্বাচন অফিসে যোগাযোগ করে কার্ড বিতরণের বর্তমান অবস্থা জানতে পারেন। শুধু প্রিন্টিং কার্যক্রম শুরু হলেই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সবার হাতে কার্ড পৌঁছে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
সব মিলিয়ে, ব্ল্যাংক কার্ড সংগ্রহ এবং প্রিন্টিং মেশিনের সমস্যা সমাধানের পর স্মার্টকার্ড কার্যক্রম আবারও গতিশীল করার উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। পরিকল্পনা অনুযায়ী নভেম্বর থেকে পূর্ণ সক্ষমতায় ছাপানো শুরু হলে দীর্ঘদিন অপেক্ষায় থাকা ভোটারদের কার্ড বিতরণে অগ্রগতি হতে পারে। তবে প্রকৃত অগ্রগতি নির্ভর করবে কার্ড উৎপাদন ও বিতরণের ধারাবাহিকতার ওপর।
সোহাগ/
