উখিয়ায় গ্যাসের সঙ্গে তেলের সম্ভাবনা, ১৫ দিন পর্যবেক্ষণ
নিজস্ব প্রতিবেদক: কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে গভীর নলকূপ বসানোর সময় ভূগর্ভ থেকে বের হওয়া গ্যাসের উৎসে জ্বালানি তেল বা অন্য কোনো হাইড্রোকার্বন থাকার সম্ভাবনা দেখছেন পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সের কর্মকর্তারা। তবে বিষয়টি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। গ্যাসের প্রকৃতি, উৎস ও মজুদের পরিমাণ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন।
শুক্রবার রাতে উখিয়ার ছোট ইনানীতে মোস্তফা সিকদারের বাড়ির উঠানে গ্যাস নির্গমনের স্থান পরিদর্শন করেন পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সের কর্মকর্তারা। সেখানে গ্যাসে জ্বলতে থাকা আগুন পর্যবেক্ষণের পর তাঁরা জানান, প্রাথমিকভাবে ভূগর্ভে অগভীর গ্যাসের আধার থাকার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।
এর আগে গত ২৭ অক্টোবর সকালে ওই বাড়ির উঠানে গভীর নলকূপ বসানোর জন্য খননকাজ শুরু হলে মাটি থেকে গ্যাস বের হতে থাকে। একপর্যায়ে সেই গ্যাসে আগুন ধরে যায়। এরপর থেকে সেখানে আগুন জ্বলছে।
গ্যাসের প্রকৃতি জানতে ১৫ দিনের পর্যবেক্ষণ
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) মোহাম্মদ শোয়েব জানান, এ ঘটনা নিয়ে গত ২৯ অক্টোবর পেট্রোবাংলায় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত মহাব্যবস্থাপকের অংশগ্রহণে বৈঠক হয়। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে সেখানে গ্যাসটির প্রকৃতি নিয়ে প্রাথমিক ধারণা তুলে ধরা হয়।
কর্মকর্তাদের ধারণা, নির্গত গ্যাসটি বায়োজেনিক উৎসের না হয়ে থার্মোজেনিক প্রকৃতির হতে পারে। তবে এর উৎস, প্রকৃত পরিমাণ এবং ভূগর্ভে কোনো লিকেজ রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হতে প্রায় ১৫ দিন পর্যবেক্ষণ করা হবে।
এই সময়ে আগুনের শিখার উচ্চতা ও গ্যাস নির্গমনের ধরন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। পর্যবেক্ষণের পর আগুনের শিখা অপরিবর্তিত থাকলে বা আরও উঁচু হলে গ্যাসের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে ‘রিলিফ ওয়েল’ বা সহায়ক কূপ খননের বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।
অন্যদিকে, এ সময়ের মধ্যে গ্যাসের প্রবাহ কমে গেলে বা বন্ধ হয়ে গেলে পরিস্থিতি অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন পেট্রোবাংলার পরিচালক।
গ্যাসের মজুদ জানতে হবে থ্রিডি জরিপ
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইনানীর আশপাশের কয়েকটি এলাকাতেও গ্যাস জ্বলতে দেখা গেছে। ভূতাত্ত্বিক গঠনের পরিবর্তনের কারণে এ ধরনের গ্যাস নির্গমন ঘটতে পারে বলে তাঁদের ধারণা।
এলাকাটিতে গ্যাসের মজুদ থাকার সম্ভাবনা যাচাই করতে পরবর্তী সময়ে থ্রিডি ভূতাত্ত্বিক জরিপ চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে বাপেক্সের। জরিপে অর্থনৈতিকভাবে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুদের ইঙ্গিত পাওয়া গেলে নতুন কূপ খননের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
বাপেক্সের ভূতাত্ত্বিক বিভাগের মহাব্যবস্থাপক শামসিয়া মুক্তাদির বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাপেক্সের অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা রয়েছে। নিজস্ব সম্পদ ব্যবহার করেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তবে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থাকায় নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
২০০ মিটারের মধ্যে প্রবেশ নিষিদ্ধ
এদিকে বাড়ির উঠানে টানা কয়েক দিন ধরে গ্যাস জ্বলতে থাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আগুন নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট কাজ শুরু করে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় গত বৃহস্পতিবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে আগুনের উৎসের চারপাশের এলাকাকে কয়েকটি নিরাপত্তা অঞ্চলে ভাগ করে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
পরে উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পান্না আক্তারের স্বাক্ষরিত আদেশে ঘটনাস্থলের ২০০ মিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে সাধারণ মানুষের প্রবেশ ও অবস্থান নিষিদ্ধ করা হয়। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে।
আদেশে ঘটনাস্থল ও আশপাশে আগুন জ্বালানো, ধূমপান, দেশলাই বা লাইটার ব্যবহার এবং স্ফুলিঙ্গ তৈরি হতে পারে এমন যেকোনো কাজ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নির্দেশ অমান্য করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে এলাকায় মাইকিং করা হচ্ছে। পাশাপাশি ঘটনাস্থলের চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া ও লাল নিশান টাঙানো হয়েছে। তবে এসব সতর্কতার পরও ঘটনাস্থলের কাছে উৎসুক মানুষের ভিড় পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি।
গ্যাস নির্গমন ও আগুনের প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে এখন ১৫ দিনের পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। এরপরই বোঝা যাবে, ইনানীর এই গ্যাসের উৎসে কী ধরনের জ্বালানি রয়েছে এবং সেখানে বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য মজুদ পাওয়ার সম্ভাবনা কতটা।
সোহাগ/
