এলপিজির দাম বাড়ানোর প্রস্তাব, ভোক্তার অতিরিক্ত দাম নিয়ে প্রশ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশে এলপিজি বা তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের দাম নির্ধারণ নিয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) গণশুনানিতে ব্যবসায়ীদের খরচ ও কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব গুরুত্ব পেলেও ভোক্তাদের ভোগান্তির বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। নির্ধারিত দামের চেয়ে ১২ কেজির সিলিন্ডার ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ থাকলেও এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভোক্তা অধিকারকর্মীরা।
প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর পর এলপিজির দাম ও সংশ্লিষ্ট খরচ পুনর্নির্ধারণ নিয়ে এই গণশুনানির আয়োজন করে বিইআরসি। শুনানিতে আমদানিকারক, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতারা নিজেদের পরিচালন ব্যয়, পরিবহন খরচ এবং কমিশন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। অন্যদিকে ভোক্তাদের পক্ষ থেকে আগে নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার বিক্রি নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
বিইআরসির সর্বশেষ নির্ধারিত দাম অনুযায়ী, ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের মূল্য ১ হাজার ৮৫৭ টাকা। তবে বাজারের বিভিন্ন স্থানে এই সিলিন্ডার ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা বা তারও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি নেওয়ার অভিযোগ
ভোক্তাদের অভিযোগ, সরকার নির্ধারিত দাম থাকলেও অনেক খুচরা বিক্রেতা নিজেদের ইচ্ছামতো এলপিজির দাম নিচ্ছেন। কোথাও ১২ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার ২০০ টাকা, কোথাও ২ হাজার ৫০০ টাকা বা তারও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে ভোক্তাদের অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হলেও কেন বাজারে নির্ধারিত দাম কার্যকর করা যাচ্ছে না, সেই প্রশ্ন উঠেছে গণশুনানিতে।
জ্বালানি খাত বিশেষজ্ঞ ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম এই শুনানিকে একতরফা বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে, ব্যবসায়ীদের খরচ ও কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হলেও ভোক্তাদের স্বার্থ যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
শামসুল আলম বলেন, প্রস্তাবিত চার্জ ও কমিশনের পক্ষে যথাযথ ব্যাখ্যা এবং যৌক্তিকতা তুলে ধরা হয়নি। কোনো নির্দিষ্ট অঙ্কের চার্জ কেন ন্যায্য, তা প্রমাণের দায়িত্ব প্রস্তাবকারীদের। তাঁর মতে, অযৌক্তিক প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা বিইআরসির দায়িত্ব।
ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষায় ক্যাবের সাত দাবি
গণশুনানিতে ক্যাবের সদস্য খলিলুর রহমান বলেন, গ্রাহকদের সুবিধা-অসুবিধা দেখা বিইআরসির দায়িত্ব। ভোক্তাদের স্বার্থ বিবেচনায় না নিলে গণশুনানির উদ্দেশ্য পূরণ হবে না।
সংগঠনটি এলপিজির দাম ও সংশ্লিষ্ট চার্জ না বাড়িয়ে বিইআরসির নির্ধারিত মূল্যেই সিলিন্ডার বিক্রি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।
ক্যাবের অন্যান্য দাবির মধ্যে রয়েছে:
-
কৃত্রিম সংকট ও মজুত গোপনের অভিযোগ তদন্ত করা।
-
নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি নেওয়ার ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।
-
অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া।
-
নিরীক্ষিত হিসাবের ভিত্তিতে ব্যবসায়ীদের ব্যয় বৃদ্ধির যৌক্তিকতা যাচাই করা।
-
আমদানি, সংরক্ষণ, বোতলজাতকরণ ও বিতরণ ব্যয়ের পৃথক হিসাব প্রকাশ করা।
-
একই ব্যয় একাধিকবার মূল্য কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত না করা।
তবে এসব দাবির বিষয়ে অপারেটর ও ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৯৭৬ টাকা করার সুপারিশ
গণশুনানিতে বিইআরসির কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৭ দশমিক ৬ শতাংশ বাড়িয়ে ১ হাজার ৯৭৬ টাকা করার সুপারিশ করেছে। এতে প্রতি সিলিন্ডারের দাম ১৩৯ টাকা বাড়তে পারে।
কমিটির প্রস্তাবে শুধু সিলিন্ডারের দাম নয়, সংরক্ষণ, বোতলজাতকরণ এবং পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের চার্জ বাড়ানোর বিষয়টিও রয়েছে।
প্রতি ১২ কেজির সিলিন্ডারে বিভিন্ন চার্জের প্রস্তাব হলো:
| খরচের খাত | বর্তমান চার্জ | প্রস্তাবিত চার্জ |
|---|---|---|
| সংরক্ষণ ও বোতলজাতকরণ | ২০১ টাকা | ২৮২ টাকা |
| পরিবেশক চার্জ | ৫০ টাকা | ৮০ টাকা |
| খুচরা বিক্রেতার চার্জ | ৪৫ টাকা | ৭০ টাকা |
অন্যদিকে আমদানিকারকেরা সংরক্ষণ ও বোতলজাতকরণ খাতে ৩৩১ থেকে ৪৪৩ টাকা পর্যন্ত চার্জ দাবি করেছেন। পরিবেশকদের পক্ষ থেকেও সিলিন্ডারপ্রতি ১৫০ টাকা কমিশনের প্রস্তাব এসেছে।
আমদানিকারকদের দাবি, বেড়েছে পরিচালন ব্যয়
এলপিজি আমদানিকারকদের বক্তব্য, সৌদি আরামকোর চুক্তিমূল্য, জাহাজভাড়া, বিমা, ডলারের বিনিময় হার এবং জ্বালানি তেলের দামের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতি মাসে এলপিজির দাম নির্ধারণ করা হয়। তবে গত পাঁচ বছরে অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ও বেড়েছে। এ কারণে চার্জ ও কমিশন পুনর্নির্ধারণ প্রয়োজন বলে মনে করছেন তাঁরা।
শুনানিতে বিভিন্ন কোম্পানির পক্ষ থেকে সিলিন্ডারপ্রতি কমিশন ও খরচ বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়। এর মধ্যে ওমেরা এলপিজি ৪৭৮ টাকা, পেট্রোম্যাক্স ৩৪৯ টাকা, ডেল্টা এলপিজি ৩৬০ টাকা এবং মেঘনা গ্রুপ ৩০০ টাকা কমিশন দাবি করেছে।
তবে এসব প্রস্তাবের পক্ষে নির্দিষ্ট অঙ্কের চার্জ কেন যৌক্তিক, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
মেঘনা ফ্রেশ এলপিজির প্রধান বিপণন কর্মকর্তা আবু সাঈদ রাজা বলেন, এমন যৌক্তিক দাম নির্ধারণ করা উচিত, যাতে বাজারে নির্ধারিত দামের চেয়ে এক টাকাও বেশি নেওয়ার সুযোগ না থাকে। এরপর কেউ নিয়ম ভাঙলে সরকারের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
পরিবেশকদের প্রতিনিধি মেসার্স উজ্জ্বল ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মণি মুক্তা পাল বলেন, তাঁদের পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। পাশাপাশি অব্যবহৃত সিলিন্ডারের খরচও বহন করতে হচ্ছে।
অটোগ্যাস ফিলিং স্টেশন সমিতির সভাপতি সিরাজুল মাওলা দাবি করেন, শহরের কিছু স্টেশন লাভ করলেও অধিকাংশ স্টেশন লোকসানে রয়েছে।
গণশুনানি বয়কটের ঘোষণা অর্থনীতি সমিতির
শুনানির একপর্যায়ে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি বয়কটের ঘোষণা দেয়। সংগঠনটির প্রতিনিধি অধ্যাপক সৈয়দ মিজানুর রহমান দাবি করেন, এক মাসে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি করে ভোক্তাদের কাছ থেকে প্রায় ৬৩০ কোটি টাকা অতিরিক্ত আদায় করা হয়েছে।
তিনি পাঁচটি কোম্পানির বিরুদ্ধে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) প্রতিবেদন এবং এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন।
সমিতির পক্ষ থেকে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি বন্ধে বিইআরসির কার্যকর পদক্ষেপ না থাকার বিষয়েও আপত্তি জানানো হয়।
১ নভেম্বর পর্যন্ত মতামত জমা দেওয়ার সুযোগ
এলপিজির দাম নির্ধারণ নিয়ে এর আগে সর্বশেষ ২০২১ সালের ১২ এপ্রিল গণশুনানি হয়েছিল। এরপর সৌদি আরামকোর ঘোষিত চুক্তিমূল্যের সঙ্গে সমন্বয় করে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে আসছে বিইআরসি।
এবারের শুনানিতে ব্যবসায়ীদের খরচ ও কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাবের পাশাপাশি ভোক্তাদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, গণশুনানির পর ১ নভেম্বর পর্যন্ত লিখিত মতামত ও প্রস্তাব জমা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তবে নতুন দাম চূড়ান্ত হওয়ার আগে ভোক্তাদের প্রধান প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে: নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে?
সিদ্দিকা/
