পুরোনো দলিল দিয়ে জমির নামজারি করতে যে ৮ বিষয় যাচাই করবেন
নিজস্ব প্রতিবেদক: অনেকের নামে বছরের পর বছর ধরে জমির পুরোনো দলিল রয়েছে। কিন্তু সেই দলিল দিয়ে নতুন করে নামজারি করতে গেলে নানা প্রশ্ন দেখা দেয়। দলিলের তথ্যের সঙ্গে খতিয়ানের মিল আছে কি না, জমির দাগ ও পরিমাণ ঠিক আছে কি না, আগের মালিকদের কাছ থেকে মালিকানা কীভাবে বর্তমান মালিকের কাছে এসেছে, এসব বিষয় যাচাই করা জরুরি।
তবে মনে রাখতে হবে, দলিল পুরোনো হলেই সেটি অকার্যকর হয়ে যায় না। দলিলের বৈধতা, জমির মালিকানার ধারাবাহিকতা এবং সরকারি রেকর্ডের সঙ্গে তথ্যের সামঞ্জস্যের ওপর নামজারি নির্ভর করে। তাই পুরোনো দলিল দিয়ে নামজারির আবেদন করার আগে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দেখে নেওয়া প্রয়োজন।
১. দলিলের নম্বর, তারিখ ও রেজিস্ট্রির তথ্য মিলিয়ে নিন
প্রথমেই দলিলের নম্বর, রেজিস্ট্রির তারিখ, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের নাম এবং দলিলে থাকা ক্রেতা-বিক্রেতার পরিচয় যাচাই করুন। দলিলটি সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নিবন্ধিত হয়েছিল কি না, প্রয়োজনে সেখান থেকে সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহ করে নিশ্চিত হওয়া যেতে পারে।
পুরোনো দলিলের লেখা অস্পষ্ট, ছেঁড়া বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে শুধু সেই কপির ওপর নির্ভর না করে নিবন্ধন অফিসের সংরক্ষিত নথির সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে নেওয়া ভালো।
২. দলিলের সঙ্গে খতিয়ানের তথ্য মিলিয়ে দেখুন
জমির পুরোনো দলিলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খতিয়ানের তথ্য মিলিয়ে দেখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে জমির মৌজা, খতিয়ান নম্বর, দাগ নম্বর এবং মালিকের নাম যাচাই করতে হবে।
জরিপ পরিবর্তনের কারণে সিএস, এসএ, আরএস বা বিএস খতিয়ানে দাগ নম্বর ও জমির বিবরণে পার্থক্য থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে পুরোনো ও নতুন রেকর্ডের মধ্যে জমির সম্পর্ক বুঝতে প্রয়োজনীয় রেকর্ড ও নকশা যাচাই করতে হবে।
৩. জমির পরিমাণ ও সীমানা ঠিক আছে কি না দেখুন
দলিলে উল্লেখ করা জমির পরিমাণ এবং বাস্তবে জমির অবস্থান মিলিয়ে নেওয়া জরুরি। দলিলের তফসিলে উল্লেখ করা চৌহদ্দি, দাগ নম্বর ও জমির পরিমাণের সঙ্গে খতিয়ান এবং নকশার তথ্য তুলনা করুন।
একই দাগে একাধিক ব্যক্তির জমি থাকলে নিজের কেনা বা মালিকানাধীন অংশ কতটুকু, তা স্পষ্টভাবে শনাক্ত করতে হবে। জমির পরিমাণে অসংগতি থাকলে নামজারি প্রক্রিয়ায় জটিলতা দেখা দিতে পারে।
৪. আগের মালিকদের দলিলের ধারাবাহিকতা যাচাই করুন
পুরোনো দলিলের ক্ষেত্রে এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সর্বশেষ জরিপ বা রেকর্ডের পর জমিটি একাধিকবার বিক্রি, দান বা অন্যভাবে হস্তান্তর হয়ে থাকলে মালিকানার ধারাবাহিকতা প্রমাণের জন্য সংশ্লিষ্ট দলিলগুলো প্রয়োজন হতে পারে।
যেমন, জমিটি প্রথমে একজনের নামে রেকর্ড হয়েছে, পরে তিনি অন্য ব্যক্তির কাছে বিক্রি করেছেন এবং পরবর্তী সময়ে সেই ব্যক্তি আবার বিক্রি করেছেন। এ ক্ষেত্রে বর্তমান আবেদনকারীর মালিকানা কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা দেখানোর জন্য মাঝের হস্তান্তর দলিল বা বায়া দলিল প্রয়োজন হতে পারে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ই-নামজারি নির্দেশনায় সর্বশেষ রেকর্ডের পর প্রথম নামজারির ক্ষেত্রে সেই রেকর্ড থেকে বর্তমান মালিকানা পর্যন্ত হস্তান্তর দলিলের ধারাবাহিক কপি সংযুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। তবে সর্বশেষ নামজারি খতিয়ানের ভিত্তিতে পরবর্তী নামজারির ক্ষেত্রে আগের সব দলিল নতুন করে দাখিলের প্রয়োজন নেই বলে নির্দেশনায় উল্লেখ রয়েছে।
৫. বিক্রেতার জমির মালিকানা ছিল কি না যাচাই করুন
পুরোনো দলিলে যিনি জমি বিক্রি করেছেন, তাঁর ওই জমি বিক্রির আইনগত অধিকার ছিল কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন। তিনি নিজে জমির মালিক ছিলেন, নাকি উত্তরাধিকারসূত্রে বা অন্য কোনো হস্তান্তরের মাধ্যমে মালিক হয়েছেন, সেটিও দেখতে হবে।
বিক্রেতা উত্তরাধিকারসূত্রে জমির মালিক হলে প্রয়োজনে ওয়ারিশ সনদ, মৃত্যু সনদ এবং মালিকানার অন্যান্য প্রমাণপত্র যাচাই করতে হতে পারে। জমির একাধিক ওয়ারিশ থাকলে তাঁদের প্রাপ্য অংশ ও হস্তান্তরের বৈধতাও বিবেচনায় নিতে হবে।
৬. জমির ওপর মামলা, নিষেধাজ্ঞা বা অন্য কোনো জটিলতা আছে কি না দেখুন
জমিটি নিয়ে কোনো দেওয়ানি মামলা, আদালতের নিষেধাজ্ঞা, অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া বা সরকারি স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় রয়েছে কি না, তা যাচাই করা উচিত। একই জমি একাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রি হয়েছে কি না, কিংবা জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ রয়েছে কি না, সেটিও খোঁজ নিতে হবে।
এ ধরনের জটিলতা থাকলে সংশ্লিষ্ট আদালতের আদেশ বা প্রয়োজনীয় নথি বিবেচনায় নিয়ে নামজারির আবেদন নিষ্পত্তি করা হয়।
৭. ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের তথ্য দেখুন
জমির হালনাগাদ ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা পরিশোধ করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করুন। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট দাখিলা সংগ্রহ করুন। জমির হোল্ডিং ও করের তথ্যের সঙ্গে আবেদন করা জমির বিবরণ মিলিয়ে নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
৮. দলিলের মূল কপি না থাকলে কী করবেন?
অনেক সময় দীর্ঘদিন আগের দলিল হারিয়ে যায় বা নষ্ট হয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে দলিলের সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহ করা যেতে পারে। তবে কপি সংগ্রহের পাশাপাশি দলিলের নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্য এবং মালিকানার ধারাবাহিকতা যাচাই করা প্রয়োজন।
শুধু একটি পুরোনো ফটোকপি থাকলেই নামজারি অনুমোদন হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। জমির রেকর্ড ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় প্রমাণও যাচাই করা হবে।
পুরোনো দলিল দিয়ে নামজারির জন্য কী কী কাগজ লাগতে পারে?
জমির মালিকানা ও আবেদনের ধরন অনুযায়ী সাধারণত নিচের নথিগুলো প্রয়োজন হতে পারে:
- পুরোনো রেজিস্ট্রি দলিলের সার্টিফায়েড কপি বা গ্রহণযোগ্য কপি।
- সংশ্লিষ্ট সর্বশেষ খতিয়ানের কপি।
- প্রয়োজন অনুযায়ী আগের মালিকদের বায়া বা পিট দলিল।
- জমির দাগ, পরিমাণ ও চৌহদ্দিসহ বিবরণ।
- আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র।
- ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের দাখিলা।
- উত্তরাধিকারসূত্রে মালিকানা হলে ওয়ারিশ সনদ ও প্রাসঙ্গিক কাগজপত্র।
- আদালতের রায় বা আদেশ থাকলে তার সার্টিফায়েড কপি।
পুরোনো দলিল দিয়ে নামজারির আবেদন করবেন যেভাবে
নামজারির আবেদন অনলাইনে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সরকারি পোর্টাল থেকে করা যায়। এ জন্য "land.gov.bd" (https://land.gov.bd/) ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে ই-নামজারি সেবা নির্বাচন করতে হবে। এরপর জমির অবস্থান, খতিয়ান, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ এবং মালিকানার তথ্য দিয়ে প্রয়োজনীয় দলিলপত্র সংযুক্ত করতে হবে।
আবেদন জমা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস দলিল ও রেকর্ড যাচাই করে। কোনো কাগজপত্রের ঘাটতি থাকলে তা পূরণের জন্য আবেদনকারীকে জানানো হতে পারে। আবেদন অনুমোদিত হলে নির্ধারিত সরকারি ফি পরিশোধের পর নামজারি খতিয়ান সংগ্রহ করা যায়।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, পুরোনো দলিল থাকলেই নামজারি নিশ্চিত হয় না। দলিলের সত্যতা, মালিকানার ধারাবাহিকতা, জমির রেকর্ড এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য যাচাইয়ের পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেয়। তাই আবেদন করার আগে দলিল ও খতিয়ানের তথ্য ভালোভাবে মিলিয়ে নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পদক্ষেপ।
সোহাগ/
