নামজারির আবেদনে ওয়ারিশ সনদ কখন প্রয়োজন হতে পারে
নিজস্ব প্রতিবেদক: জমির নামজারি করতে গিয়ে অনেকেই জানতে চান, আবেদনের সঙ্গে ওয়ারিশ সনদ জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক কি না। আসলে সব ধরনের নামজারির আবেদনে ওয়ারিশ সনদ প্রয়োজন হয় না। জমির মালিকানা কীভাবে অর্জিত হয়েছে, তার ওপর নির্ভর করে এই সনদ লাগবে কি না।
সাধারণত উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমি মৃত মালিকের বৈধ ওয়ারিশদের নামে নামজারি করতে হলে ওয়ারিশ সনদ প্রয়োজন হতে পারে। অন্যদিকে, কেউ সরাসরি রেজিস্ট্রি দলিলের মাধ্যমে জমি কিনলে শুধু ক্রয়সূত্রে নামজারির জন্য তাঁর নিজের ওয়ারিশ সনদ প্রয়োজন হয় না।
উত্তরাধিকারসূত্রে জমি পেলে ওয়ারিশ সনদ লাগবে
জমির মূল মালিক মারা যাওয়ার পর তাঁর বৈধ ওয়ারিশরা জমির মালিকানা দাবি করলে নামজারির আবেদনে ওয়ারিশ সনদ গুরুত্বপূর্ণ নথি হিসেবে বিবেচিত হয়। এর মাধ্যমে মৃত ব্যক্তির ওয়ারিশ কারা, তা শনাক্ত করা যায়।
যেমন, বাবার নামে থাকা জমি তাঁর মৃত্যুর পর সন্তান, স্ত্রী বা অন্যান্য বৈধ ওয়ারিশদের নামে নামজারি করতে হলে সংশ্লিষ্ট ওয়ারিশ সনদ জমা দিতে হতে পারে। একইভাবে মা, স্বামী বা স্ত্রীর নামে থাকা জমি উত্তরাধিকারসূত্রে পেলে নামজারির ক্ষেত্রেও এই সনদ প্রয়োজন হতে পারে।
নামজারির আবেদনে যেসব ক্ষেত্রে ওয়ারিশ সনদ প্রয়োজন হতে পারে
১. বাবা বা মায়ের মৃত্যুর পর জমি নামজারি: বাবা বা মা মারা গেলে তাঁদের নামে থাকা জমি বৈধ ওয়ারিশদের নামে নামজারি করতে ওয়ারিশ সনদ প্রয়োজন হতে পারে।
২. স্বামী বা স্ত্রীর মৃত্যুর পর জমির মালিকানা পরিবর্তন: স্বামী বা স্ত্রী মারা গেলে তাঁর রেখে যাওয়া জমি উত্তরাধিকারীদের নামে নামজারি করতে ওয়ারিশ সনদ লাগতে পারে।
৩. একাধিক ওয়ারিশের নামে যৌথ নামজারি: মৃত ব্যক্তির একাধিক ওয়ারিশ থাকলে তাঁদের সবার পরিচয় ও উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত মালিকানার তথ্য যাচাইয়ের জন্য ওয়ারিশ সনদ প্রয়োজন হতে পারে।
৪. ওয়ারিশদের পৃথক অংশে নামজারি: উত্তরাধিকারীরা নিজেদের প্রাপ্য অংশ অনুযায়ী আলাদা নামজারি করতে চাইলে ওয়ারিশ সনদের পাশাপাশি প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বণ্টননামা বা বণ্টনসংক্রান্ত দলিল প্রয়োজন হতে পারে।
৫. উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমি বিক্রির ক্ষেত্রে: কোনো ব্যক্তি উত্তরাধিকারসূত্রে জমির মালিক হয়ে পরে তা বিক্রি করলে বিক্রেতার মালিকানার ধারাবাহিকতা যাচাইয়ের জন্য ওয়ারিশ সনদসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চাওয়া হতে পারে।
ওয়ারিশ সনদের পাশাপাশি আর কী কী কাগজ লাগবে?
উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির নামজারি করতে শুধু ওয়ারিশ সনদ জমা দিলেই আবেদন সম্পন্ন হয় না। জমির মালিকানা ও উত্তরাধিকার যাচাইয়ের জন্য আরও কিছু নথি প্রয়োজন হতে পারে।
সাধারণত প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের মধ্যে রয়েছে:
-
মৃত জমির মালিকের মৃত্যু সনদ।
-
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দেওয়া ওয়ারিশ সনদ।
-
মৃত ব্যক্তির নামে থাকা সর্বশেষ খতিয়ানের কপি।
-
জমির মালিকানা প্রমাণের জন্য প্রযোজ্য দলিলপত্র।
-
আবেদনকারী ও সংশ্লিষ্ট ওয়ারিশদের জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি।
-
হালনাগাদ ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের দাখিলা।
-
পৃথক অংশে নামজারি করতে হলে প্রযোজ্য বণ্টননামা বা বণ্টনসংক্রান্ত দলিল।
তবে জমির রেকর্ড, মালিকানার ইতিহাস ও আবেদনের ধরন অনুযায়ী অতিরিক্ত কাগজপত্র চাওয়া হতে পারে।
জমি কিনলে কি ওয়ারিশ সনদ লাগে?
সরাসরি ক্রয়সূত্রে জমি কিনে রেজিস্ট্রি দলিলের মাধ্যমে মালিক হলে ক্রেতার নিজের ওয়ারিশ সনদ সাধারণত প্রয়োজন হয় না। এ ক্ষেত্রে দলিল, সর্বশেষ খতিয়ান, ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা, জাতীয় পরিচয়পত্রসহ প্রযোজ্য নথি দিয়ে নামজারির আবেদন করতে হয়।
তবে জমির বিক্রেতা যদি উত্তরাধিকারসূত্রে জমির মালিক হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর মালিকানার ধারাবাহিকতা যাচাইয়ের জন্য ওয়ারিশ সনদ ও অন্যান্য উত্তরাধিকারসংক্রান্ত কাগজপত্র প্রয়োজন হতে পারে।
ওয়ারিশ সনদ কোথা থেকে সংগ্রহ করবেন?
সাধারণত সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র বা নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ওয়ারিশ সনদ সংগ্রহ করা যায়। সনদে মৃত ব্যক্তির নাম এবং বৈধ ওয়ারিশদের পরিচয় সঠিকভাবে উল্লেখ আছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি।
নামজারির আগে যে বিষয়গুলো মনে রাখবেন
ওয়ারিশ সনদ উত্তরাধিকারীদের পরিচয় শনাক্ত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি। তবে শুধু এই সনদ থাকলেই জমির মালিকানা চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয় না। মৃত ব্যক্তির জমির রেকর্ড, মালিকানার ধারাবাহিকতা এবং উত্তরাধিকারীদের আইনগত প্রাপ্য অংশও যাচাই করা হয়।
তাই উত্তরাধিকারসূত্রে জমি পেলে নামজারির আবেদন করার আগে ওয়ারিশ সনদ, মৃত্যু সনদ, খতিয়ান ও প্রয়োজনীয় দলিলপত্র সংগ্রহ করে রাখুন। আবেদন জমা দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট উপজেলা ভূমি অফিস বা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয় থেকে আপনার জমির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের তালিকা জেনে নেওয়া ভালো।
সোহাগ/
