সরকারি কর্মচারীদের বেতন বিল তৈরি সহজ, থাকছে PDF সুবিধা
নিজস্ব প্রতিবেদক: সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাসিক বেতন বিল প্রস্তুতের কাজ সহজ করতে তৈরি করা হয়েছে ‘Staff Salary Automation Calculator’ নামের একটি ওয়েবভিত্তিক টুল। এতে কর্মচারীদের তথ্য, মূল বেতন, প্রযোজ্য ভাতা ও বিভিন্ন কর্তনের অঙ্ক প্রবেশ করালে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মোট বেতন-ভাতা, মোট কর্তন এবং নিট প্রদেয় অর্থের হিসাব পাওয়া যায়। পাশাপাশি বিলের প্রিভিউ দেখা এবং PDF আকারে সংরক্ষণ করে প্রিন্ট করার সুবিধাও রয়েছে।
টুলটির HTML ফাইল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এতে টি.আর. ফরম নং ১৫-এর কাঠামো অনুসরণ করে তিন পৃষ্ঠার বেতন বিল তৈরির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রথম পৃষ্ঠায় বেতন-ভাতা ও কর্তনের সারসংক্ষেপ, দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় প্রত্যয়ন ও স্বাক্ষরের অংশ এবং তৃতীয় পৃষ্ঠায় কর্মচারীভিত্তিক বিস্তারিত হিসাব দেখানো যায়।
তবে এটি মূলত বেতন বিল প্রস্তুত ও হিসাব করার সহায়ক টুল। এর সরকারি অনুমোদন, iBAS++-এর সঙ্গে সরাসরি সংযোগ কিংবা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরকারি কোষাগারে বিল দাখিলের সুবিধা নিশ্চিত করা যায়নি।
Staff Salary Automation Calculator কীভাবে কাজ করে
সাধারণত বেতন বিল তৈরির সময় প্রতিটি কর্মচারীর নাম, পদবি, মূল বেতন, ভাতা, কর্তন এবং অন্যান্য আর্থিক তথ্য আলাদাভাবে সাজাতে হয়। এরপর সব হিসাব মিলিয়ে মোট বেতন ও নিট প্রদেয় অর্থ নির্ধারণ করতে হয়। কর্মচারীর সংখ্যা বেশি হলে এই কাজ আরও সময়সাপেক্ষ হতে পারে।
Staff Salary Automation Calculator-এ এসব তথ্য একটি নির্দিষ্ট ফরমে প্রবেশ করানোর ব্যবস্থা রয়েছে। প্রথমে বিলের মাস, বছর, অফিসের নাম ও অন্যান্য সাধারণ তথ্য দিতে হয়। এরপর কর্মচারীভিত্তিক তথ্য এবং বেতন-ভাতা ও কর্তনের অঙ্ক পূরণ করলে টুলটি নির্ধারিত হিসাব অনুযায়ী মোট অর্থ দেখায়।
এতে একজন কর্মচারীর পৃথক হিসাবের পাশাপাশি পুরো বিলের সম্মিলিত আর্থিক হিসাবও দেখা যায়। ফলে তথ্য সংশোধন, হিসাব যাচাই এবং প্রিন্টের আগে বিলের সারসংক্ষেপ পরীক্ষা করা সহজ হতে পারে।
বেতন বিল তৈরি করতে যেসব তথ্য লাগবে
টুলটিতে বিলের সাধারণ তথ্য এবং কর্মচারীদের ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
বিলের সাধারণ তথ্যের মধ্যে রয়েছে:
-
বেতন বিলের শিরোনাম, মাস ও বছর
-
সংশ্লিষ্ট দপ্তর বা অফিসের নাম
-
প্রাতিষ্ঠানিক বা অপারেশন কোড
-
টোকেন নম্বর ও তারিখ
-
ভাউচার নম্বর ও তারিখ
-
বিলের নির্ধারিত অংশের জন্য প্রয়োজনীয় স্থান ও তারিখ
-
আয়ন কর্মকর্তার নাম ও পদবি
-
তৃতীয় পৃষ্ঠার জন্য কাগজের আকার নির্বাচন
ফরমে প্রতিষ্ঠানের জন্য ছয় ডিজিট এবং বিশেষ কার্যক্রম, প্রকল্প বা স্কিমের জন্য সাত ডিজিটের কোড ব্যবহারের নির্দেশনাও রয়েছে। তবে প্রকৃত কোড সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অনুমোদিত নথি থেকে যাচাই করে দিতে হবে।
কর্মচারীর কোন কোন তথ্য দিতে হবে
প্রতিটি কর্মচারীর জন্য পৃথক তথ্য দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শাখা বা সেরেস্তার তথ্য, নাম, পদবি, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, সাধারণ ভবিষ্য তহবিলের (জিপিএফ) নম্বর এবং ডাক জীবনবিমাসংক্রান্ত তথ্য। প্রয়োজন অনুযায়ী কর্মচারীভিত্তিক মন্তব্যও যোগ করা যায়।
ব্যক্তিগত পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য এবং আর্থিক অঙ্ক নির্ধারিত ঘরে সঠিকভাবে প্রবেশ করানো জরুরি। তথ্য ভুল হলে সফটওয়্যার স্বয়ংক্রিয়ভাবে হিসাব করলেও চূড়ান্ত বেতন বিল ভুল হতে পারে।
মূল বেতন ও ভাতার হিসাব হবে আলাদাভাবে
বেতন বিলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো মূল বেতন ও প্রযোজ্য ভাতার হিসাব। টুলটিতে নিচের খাতগুলো রাখা হয়েছে:
-
মূল বেতন ও ব্যক্তিগত বেতন
-
শিক্ষা ভাতা
-
পাহাড়ি ভাতা
-
বাড়িভাড়া ভাতা
-
চিকিৎসা ভাতা
-
যাতায়াত ভাতা
-
টিফিন ভাতা
-
ঝুঁকি ভাতা
-
পোশাক ভাতা
-
ধোলাই ভাতা
প্রতিটি খাতের জন্য আলাদা টাকার অঙ্ক প্রবেশ করানো যায়। এরপর টুলটি সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর মোট বেতন ও ভাতার হিসাব তৈরি করে।
তবে তালিকায় কোনো ভাতার খাত থাকলেই প্রত্যেক কর্মচারী সেই ভাতা পাওয়ার যোগ্য, এমন নয়। কর্মচারীর পদ, কর্মস্থল, প্রযোজ্য বিধি এবং অনুমোদিত প্রাপ্যতা অনুযায়ী অঙ্ক নির্ধারণ করতে হবে।
জিপিএফসহ বিভিন্ন কর্তনের হিসাবও থাকবে
মোট বেতন-ভাতা থেকে প্রযোজ্য কর্তন বাদ দিয়ে নিট প্রদেয় অর্থ নির্ধারণ করা হয়। এ জন্য টুলটিতে একাধিক কর্তনের খাত রাখা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য খাতগুলো হলো:
-
সাধারণ ভবিষ্য তহবিল (জিপিএফ)
-
ভবিষ্য তহবিলের অগ্রিম ও সুদ আদায়
-
কর্মচারী কল্যাণ তহবিল
-
কর্মচারী যৌথবিমা তহবিল
-
আবাসিক বাড়িভাড়া
-
তিতাস, বাখরাবাদ, জালালাবাদ ও কর্ণফুলী গ্যাস বিল
-
পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন চার্জ
-
গৃহনির্মাণ ঋণ
-
মোটরসাইকেল ও কম্পিউটার ঋণ
-
সরকারি ঋণের সুদ
-
স্থানীয় তহবিল জমা
-
স্ট্যাম্প ডিউটি ও পৌরকর
প্রযোজ্য কর্তনের অঙ্ক কর্মচারীভিত্তিকভাবে প্রবেশ করানো যায়। টুলটি এসব অঙ্ক যোগ করে মোট কর্তনের পরিমাণ দেখায়।
সব কর্মচারীর ক্ষেত্রে সব ধরনের কর্তন প্রযোজ্য হবে না। তাই সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর প্রকৃত দায়, অনুমোদিত হিসাব এবং কার্যকর সরকারি বিধি অনুযায়ী তথ্য দিতে হবে।
মোট বেতন ও নিট প্রদেয় অর্থ নিজে থেকেই হিসাব হবে
টুলটির অন্যতম প্রধান সুবিধা হলো স্বয়ংক্রিয় হিসাব। এর মাধ্যমে মোট বেতন-ভাতা, মোট কর্তন এবং কর্তন বাদে প্রদেয় অর্থ দেখা যায়।
হিসাবের সূত্রটি হলো:
নিট প্রদেয় বিল = মোট বেতন ও ভাতা − মোট কর্তন
উদাহরণ হিসেবে, কোনো কর্মচারীর মোট বেতন ও ভাতা ৩০ হাজার টাকা এবং মোট কর্তন ৩ হাজার টাকা হলে নিট প্রদেয় অর্থ হবে ২৭ হাজার টাকা। এটি শুধু হিসাব বোঝানোর উদাহরণ, কোনো নির্দিষ্ট কর্মচারীর প্রকৃত বেতনের তথ্য নয়।
টুলটিতে প্রতিটি কর্মচারীর পৃথক হিসাবের পাশাপাশি সব কর্মচারীর সম্মিলিত মোট বেতন-ভাতা, মোট কর্তন এবং নিট প্রদেয় অর্থও দেখানোর ব্যবস্থা রয়েছে। এতে পুরো বিলের আর্থিক হিসাব একসঙ্গে যাচাই করা যায়।
একাধিক কর্মচারীর তথ্য যোগ ও সংশোধন করা যাবে
একটি বেতন বিলে একাধিক কর্মচারীর তথ্য অন্তর্ভুক্ত করার জন্য টুলটিতে পৃথক কর্মচারী কার্ড রয়েছে। এর মাধ্যমে ব্যবহারকারী নতুন কর্মচারীর তথ্য যোগ, পুরোনো তথ্য সংশোধন, তথ্যের অনুলিপি তৈরি, তালিকায় অবস্থান পরিবর্তন এবং প্রয়োজন হলে তথ্য মুছে ফেলতে পারবেন।
একই দপ্তরের একাধিক কর্মচারীর বিল প্রস্তুতের ক্ষেত্রে এই সুবিধা সময় বাঁচাতে পারে। তবে আগের কর্মচারীর তথ্য অনুলিপি করে নতুন বিল তৈরি করলে নাম, এনআইডি, বেতন, ভাতা ও কর্তনের অঙ্ক ভালোভাবে যাচাই করতে হবে। অন্যথায় আগের কর্মচারীর তথ্য নতুন বিলেও থেকে যেতে পারে।
তিন পৃষ্ঠার বেতন বিলের প্রিভিউ ও PDF সুবিধা
বিল তৈরির পর সেটি কেমন দেখাবে, তা যাচাই করার জন্য টুলটিতে ‘ফর্ম প্রিভিউ ও প্রিন্ট’ নামে আলাদা অংশ রয়েছে।
তিনটি পৃষ্ঠায় সাধারণত যেসব তথ্য দেখানো হয়:
প্রথম পৃষ্ঠা: বেতন বিলের শিরোনাম, মাস, অফিসের নাম, প্রাতিষ্ঠানিক বা অপারেশন কোড, টোকেন ও ভাউচারের তথ্য এবং বেতন-ভাতা ও কর্তনের সারসংক্ষেপ।
দ্বিতীয় পৃষ্ঠা: বিলসংক্রান্ত প্রত্যয়ন, অনুপস্থিত কর্মচারীদের ফেরত দেওয়া বেতনের বিবরণ এবং আয়ন কর্মকর্তার নাম, পদবি, স্বাক্ষর ও সিলের জন্য নির্ধারিত স্থান।
তৃতীয় পৃষ্ঠা: কর্মচারীদের নাম ও পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য, পৃথক বেতন-ভাতা ও কর্তনের খাত, মোট দাবি, মোট কর্তন এবং নিট প্রদেয় অর্থের বিস্তারিত হিসাব।
টুলটির বর্তমান কোড অনুযায়ী, তৃতীয় পৃষ্ঠায় প্রতি পৃষ্ঠায় সর্বোচ্চ ১২ জন কর্মচারীর জন্য সারি নির্ধারিত রয়েছে। কর্মচারীর সংখ্যা বেশি হলে প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত পৃষ্ঠা তৈরি হয়।
প্রিভিউ যাচাই করে PDF তৈরি ও প্রিন্ট করা যায়। তবে PDF তৈরি হওয়া মানেই বিলটি দাপ্তরিকভাবে জমা হয়েছে বা অনুমোদন পেয়েছে, এমন নয়।
ব্যবহারের আগে যেসব বিষয় যাচাই করবেন
বেতন বিল প্রস্তুতের এই টুল ব্যবহারের আগে কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
প্রথমত, কর্মচারীর পরিচয় ও চাকরিসংক্রান্ত তথ্য সঠিকভাবে দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, মূল বেতন, ভাতা এবং কর্তনের অঙ্ক অনুমোদিত নথির সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হবে। তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক কোড, টোকেন ও ভাউচারের তথ্য যাচাই করতে হবে। সবশেষে PDF তৈরি করার পর প্রতিটি পৃষ্ঠা পরীক্ষা করা উচিত।
এনআইডি, জিপিএফ নম্বর এবং বেতনের মতো ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে তথ্যের নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ। অপরিচিত ওয়েবসাইটে এসব তথ্য প্রবেশ করানোর আগে তথ্য কীভাবে সংরক্ষিত হচ্ছে, তা যাচাই করুন।
এটি কি সরকারি বেতন ব্যবস্থার বিকল্প?
Staff Salary Automation Calculator বেতন বিলের তথ্য সাজানো, হিসাব করা, প্রিভিউ দেখা এবং PDF তৈরিতে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু সরবরাহ করা HTML ফাইল থেকে এর সরকারি অনুমোদন, iBAS++-এর সঙ্গে সরাসরি সংযোগ কিংবা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরকারি কোষাগারে বিল দাখিলের সুবিধা নিশ্চিত করা যায়নি।
তাই এটিকে আপাতত বেতন বিল প্রস্তুতের সহায়ক টুল হিসেবে বিবেচনা করা যুক্তিযুক্ত। সরকারি দপ্তরের অনুমোদিত ব্যবস্থা বা নির্ধারিত ফরমের বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা যাচাই করা প্রয়োজন।
Staff Salary Automation Calculator-এ কর্মচারীর তথ্য প্রবেশ করিয়ে বেতন-ভাতা ও কর্তনের হিসাব, সম্মিলিত নিট প্রদেয় অর্থ এবং তিন পৃষ্ঠার PDF তৈরির সুবিধা রয়েছে। একাধিক কর্মচারীর তথ্য ব্যবস্থাপনা ও হিসাব যাচাইয়ের ক্ষেত্রে এটি সহায়ক হতে পারে।
তবে সঠিক ফলাফলের জন্য তথ্যের নির্ভুলতা, প্রযোজ্য সরকারি বিধি এবং অনুমোদিত আর্থিক হিসাব অনুসরণ করা জরুরি। সরকারি অনুমোদন নিশ্চিত না করে এই টুলকে সরকারি বেতন ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
সোহাগ/
