মাতারবাড়ী বন্দর ঘিরে জাপানের পরিকল্পনা, কী বলল ভারত
নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক যোগাযোগ ও শিল্প উন্নয়নের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। জাপানের পরিকল্পনায় বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক সংযোগ বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। এ উদ্যোগের প্রেক্ষাপটে জাপানের সঙ্গে কৌশলগত সহযোগিতা আরও জোরদার করার কথা জানিয়েছে ভারত।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বুধবার (২৮ অক্টোবর) বলেন, জাপানের সঙ্গে ভারতের শক্তিশালী কৌশলগত অংশীদারত্ব রয়েছে। উত্তর-পূর্ব ভারতকে ঘিরে দুই দেশের একাধিক যৌথ উদ্যোগ চলছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে কৌশলগত যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করার কাজ করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে বৃহত্তর শিল্প ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে তোলার সম্ভাবনা দেখছে জাপান। পরিকল্পনাটির লক্ষ্য শুধু বন্দর অবকাঠামো নির্মাণ নয়, বরং বন্দরকে কেন্দ্র করে শিল্প, পণ্য পরিবহন ও আঞ্চলিক বাণিজ্যের সংযোগ বাড়ানো।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু গত ১৮ অক্টোবর জাপানের কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে জানিয়েছিল, মাতারবাড়ীকে ঘিরে একটি ‘শিল্পমূল্য শৃঙ্খল’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
জাপানের দৃষ্টিতে, বন্দর ও শিল্প অবকাঠামো সমন্বিতভাবে কাজে লাগানো গেলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থা ও বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার সুযোগ পেতে পারে।
মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করে জাপানের পরিকল্পনার আলোচনার মধ্যে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্যে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে জাপানের সম্পর্ক বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ভারত ও জাপানের মধ্যে বিভিন্ন যৌথ উদ্যোগ রয়েছে এবং দুই দেশ কৌশলগত সংযোগ আরও শক্তিশালী করার জন্য কাজ করছে। উত্তর-পূর্ব ভারতের বাসিন্দাদের জাপানি ভাষা শেখার প্রতিও উৎসাহিত করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
ভারতের বক্তব্যে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টিও উঠে এসেছে। তবে এই বক্তব্যকে মাতারবাড়ী বন্দর ব্যবহারের বিষয়ে ভারতের আনুষ্ঠানিক সম্মতি বা নির্দিষ্ট কোনো চুক্তির ঘোষণা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বক্তব্যে মূলত ভারত-জাপান সহযোগিতা এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উন্নয়ন নিয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যকে সাধারণভাবে ‘সেভেন সিস্টার্স’ বলা হয়। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ভারতের এই অঞ্চলটির সঙ্গে দেশের অন্যান্য অংশের স্থল যোগাযোগে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এ কারণে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ও বন্দর ব্যবহার করে পণ্য পরিবহনের সম্ভাবনা আঞ্চলিক যোগাযোগ আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের বন্দরগুলোর সঙ্গে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কার্যকর যোগাযোগ গড়ে উঠলে পণ্য পরিবহন ও বাণিজ্যে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশও আঞ্চলিক ট্রানজিট, পরিবহন ও শিল্প কার্যক্রম থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনা করতে পারে।
তবে এসব সুবিধা বাস্তবে অর্জন করতে হলে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, দুই দেশের সমঝোতা, সীমান্ত ও শুল্ক ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকর পরিবহন সংযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশ ও ভারতের আঞ্চলিক যোগাযোগের প্রসঙ্গে ফেনী নদীর ওপর নির্মিত মৈত্রী সেতুর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। সেতুটি ভারতের ত্রিপুরার সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
এই সংযোগ কার্যকরভাবে ব্যবহার করা গেলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল থেকে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চল এবং ভবিষ্যতে মাতারবাড়ী বন্দরের দিকে পণ্য পরিবহনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের টানাপোড়েন ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে সেতুটির কার্যকর ব্যবহার এখনো বাধার মুখে রয়েছে।
সেতু, সড়ক, বন্দর ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনার মধ্যে সমন্বয় না হলে শুধু অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে প্রত্যাশিত বাণিজ্যিক সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বড় জাহাজ পরিচালনা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়তে পারে।
বর্তমানে বড় জাহাজে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কার কলম্বো এবং মালয়েশিয়ার বিভিন্ন বন্দরের মতো আঞ্চলিক কেন্দ্রের ওপর নির্ভর করতে হয়। মাতারবাড়ী বন্দরের সক্ষমতা বাড়লে পণ্য পরিবহনের বিকল্প ও লজিস্টিকস সুবিধা তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে প্রকল্পের চূড়ান্ত সক্ষমতা, পরিচালনব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যে এর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে অবকাঠামোর অগ্রগতি, সংযোগব্যবস্থা ও ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিক চাহিদার ওপর।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাতারবাড়ী প্রকল্পসহ বিভিন্ন উন্নয়ন উদ্যোগ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরের আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে। ২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে জাপানের আর্থিক সহায়তা চাওয়ার পরিকল্পনার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সফরের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে গত আগস্টে প্রধানমন্ত্রী মাতারবাড়ী পরিদর্শন করেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। সেখানে প্রকল্পের পরবর্তী ধাপ ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তাঁকে অবহিত করা হয়।
তবে সফরে ঠিক কোন প্রকল্পে কী ধরনের অর্থায়ন বা চুক্তি চূড়ান্ত হবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিবৃতি প্রকাশিত হলে বিস্তারিত জানা যাবে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় শিল্প ও যোগাযোগ করিডর গড়ে তোলার ক্ষেত্রে জাপানের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। থাইল্যান্ডকে কেন্দ্র করে কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামের সঙ্গে অর্থনৈতিক যোগাযোগ এবং অবকাঠামো উন্নয়নে দেশটি বিভিন্নভাবে সহায়তা করেছে।
জাপানের কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে মাতারবাড়ীকেও এ ধরনের আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কাঠামোর কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য আঞ্চলিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, পরিবহন অবকাঠামো এবং নীতিগত সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ হবে।
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে শিল্প ও যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হলে বাংলাদেশ শুধু আমদানি-রপ্তানি নয়, আঞ্চলিক পণ্য পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ পেতে পারে।
একই সঙ্গে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারের সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগ বাড়ানোর সম্ভাবনাও আলোচনায় রয়েছে। তবে এসব সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে হলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সমঝোতা, প্রকল্পের অগ্রগতি এবং বাস্তবসম্মত বাণিজ্যিক পরিকল্পনা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, মাতারবাড়ী বন্দরকে কেন্দ্র করে জাপানের পরিকল্পনা বাংলাদেশের আঞ্চলিক অর্থনৈতিক গুরুত্ব বাড়ানোর একটি সম্ভাবনা তুলে ধরছে। ভারতের সাম্প্রতিক বক্তব্যে ভারত-জাপান কৌশলগত সহযোগিতার বিষয়টি সামনে এলেও, মাতারবাড়ীকে ঘিরে নির্দিষ্ট কোনো নতুন চুক্তি বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না, তা জানতে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ও প্রকল্পের অগ্রগতির দিকে নজর রাখতে হবে।
সোহাগ/
