নবম পে স্কেলে ১১তম ও ১২তম গ্রেডের বেতনে কেন উল্টো হিসাব
নিজস্ব প্রতিবেদক:নবম জাতীয় বেতন স্কেল ঘিরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। নতুন বেতন কাঠামোয় মূল বেতন নির্ধারণ বা পে ফিক্সেশন করতে গিয়ে গ্রেডভিত্তিক বেতনের ব্যবধান, উচ্চতর গ্রেডের সুবিধা এবং ভাতা হিসাব নিয়ে জটিলতার কথা উঠে এসেছে। বিশেষ করে ১১তম ও ১২তম গ্রেডের কয়েকটি উদাহরণে দেখা যাচ্ছে, প্রারম্ভিক বেতনে এগিয়ে থাকা কর্মচারীরা নতুন করে বেতন নির্ধারণের পর পিছিয়ে পড়তে পারেন।
প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামোর আওতায় বেতন নির্ধারণ, আগের বেতনের সঙ্গে পার্থক্য এবং বকেয়া পাওনার হিসাব চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। তবে সব মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে এই কার্যক্রম শেষ হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
কবে মিলতে পারে নতুন বেতন ও বকেয়া?
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অক্টোবর মাসের বেতন এবং চার মাসের বকেয়া ১ নভেম্বর দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানা গেছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত ঘোষণা যাচাই করা জরুরি।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী ও ৮ লাখ পেনশনভোগীর মধ্যে সবাই এখনো নতুন বেতন নির্ধারণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারেননি। যাঁদের পে ফিক্সেশন শেষ হয়নি, তাঁরা আপাতত পুরোনো বেতন কাঠামো অনুযায়ী বেতন পেতে পারেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের বকেয়া কীভাবে সমন্বয় করা হবে, সেটিও সংশ্লিষ্ট নির্দেশনার ওপর নির্ভর করবে।
কেন পে ফিক্সেশনে জটিলতা তৈরি হচ্ছে?
নতুন বেতন কাঠামো কার্যকরের প্রক্রিয়ায় কয়েকটি বিষয়ে অসংগতির অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে:
- গ্রেডভিত্তিক বেতনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা
- উচ্চতর গ্রেডের সুবিধা হিসাব করা
- বাড়িভাড়া ভাতাসহ বিভিন্ন ভাতা নির্ধারণ
- আইবাস++ ব্যবস্থায় বেতন নির্ধারণের জটিলতা
কর্মচারীদের অভিযোগ, এসব সমস্যার কারণে কারও প্রাপ্য আর্থিক সুবিধা কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আবার পদোন্নতির পরও কোনো কোনো ক্ষেত্রে মোট বেতন প্রত্যাশার তুলনায় কম হতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা এবং চূড়ান্ত বাস্তবায়ন নির্দেশনা যাচাই করা প্রয়োজন।
১১তম ও ১২তম গ্রেডে বেতনের ব্যবধান কত?
প্রতিবেদনে দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, নবম পে স্কেলে ১১তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ২৫ হাজার টাকা এবং ১২তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ২৪ হাজার ৩০০ টাকা। অর্থাৎ প্রারম্ভিক বেতনে ১১তম গ্রেড ৭০০ টাকা এগিয়ে।
কিন্তু পর্যায়ক্রমে নতুন বেতন কাঠামোর সুবিধা কার্যকরের যে হিসাব প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে, সেখানে চিত্রটি ভিন্ন।
| সুবিধা কার্যকরের পর্যায় | ১১তম গ্রেড | ১২তম গ্রেড | পার্থক্য |
|---|---|---|---|
| প্রথম পর্যায়: ৫০% | ৩১,২৩০ টাকা | ৩১,৫৯০ টাকা | ১২তম গ্রেড ৩৬০ টাকা বেশি |
| দ্বিতীয় পর্যায়: ৭৫% | ৩৫,০১৫ টাকা | ৩৫,৫৯৫ টাকা | ১২তম গ্রেড ৫৮০ টাকা বেশি |
| তৃতীয় পর্যায়: ১০০% | ৪০,৮০০ টাকা | ৪১,৬০০ টাকা | ১২তম গ্রেড ৮০০ টাকা বেশি |
এই হিসাব অনুযায়ী, সুবিধা পর্যায়ক্রমে কার্যকর হলে দুই গ্রেডের বেতনের পার্থক্য উল্টো দিকে যেতে পারে। তবে টেবিলে দেওয়া অঙ্কগুলো সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপন ও চূড়ান্ত পে ফিক্সেশন বিধির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
পে ফিক্সেশনে কীভাবে বদলে যাচ্ছে বেতনের হিসাব?
প্রতিবেদনে ১১তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর ২০১৫ সালের প্রারম্ভিক মূল বেতন ছিল ১২ হাজার ৫০০ টাকা। ২০২৬ সালের ৩০ জুন তাঁর মূল বেতন দাঁড়ায় ২৩ হাজার ৬৬০ টাকা। অর্থাৎ আগের কাঠামোয় মূল বেতন বেড়েছিল ১১ হাজার ১৬০ টাকা।
এই বৃদ্ধির পরিমাণ নতুন কাঠামোর ২৫ হাজার টাকা প্রারম্ভিক বেতনের সঙ্গে যোগ করলে দাঁড়ায় ৩৬ হাজার ১৬০ টাকা। কিন্তু নতুন বেতন কাঠামোয় ওই অঙ্কের নির্দিষ্ট ধাপ না থাকায় পরবর্তী ধাপ ধরে মূল বেতন ৩৭ হাজার টাকা নির্ধারণের কথা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
অন্যদিকে, ১২তম গ্রেডের একজন কর্মচারীর ২০১৫ সালের প্রারম্ভিক মূল বেতন ছিল ১১ হাজার ৩০০ টাকা। ২০২৬ সালের ৩০ জুন তাঁর মূল বেতন দাঁড়ায় ২৩ হাজার ৫৮০ টাকা। আগের কাঠামোয় বেতন বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল ১২ হাজার ২৮০ টাকা।
এই বৃদ্ধির পরিমাণ নতুন কাঠামোর ২৪ হাজার ৩০০ টাকা প্রারম্ভিক বেতনের সঙ্গে যোগ করলে দাঁড়ায় ৩৬ হাজার ৫৮০ টাকা। পরবর্তী ধাপ অনুযায়ী তাঁর নতুন মূল বেতন ৩৭ হাজার ৭০০ টাকা নির্ধারণের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে উদাহরণ দুটিতে দেখা যাচ্ছে, নতুন বেতন নির্ধারণের পর ১১তম গ্রেডের কর্মচারীর মূল বেতন হচ্ছে ৩৭ হাজার টাকা এবং ১২তম গ্রেডের কর্মচারীর ৩৭ হাজার ৭০০ টাকা। অর্থাৎ ১১তম গ্রেডে প্রারম্ভিক বেতন বেশি হলেও এই দুটি উদাহরণে চূড়ান্ত নির্ধারিত বেতন ১২তম গ্রেডে বেশি হচ্ছে।
৫০, ৭৫ ও ১০০ শতাংশ সুবিধা কার্যকরের হিসাব
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নতুন বেতন কাঠামোর সুবিধা পর্যায়ক্রমে কার্যকরের পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে ১ জুলাই ২০২৬ থেকে প্রথম পর্যায়ে ৫০ শতাংশ, ১ জানুয়ারি ২০২৭ থেকে ৭৫ শতাংশ এবং ১ জুলাই ২০২৭ থেকে শতভাগ সুবিধা কার্যকরের কথা বলা হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে নতুন নির্ধারিত বেতন ও আগের বেতনের পার্থক্যের ভিত্তিতে সুবিধা হিসাব করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কোন কর্মচারীর ক্ষেত্রে কীভাবে মূল বেতন নির্ধারণ হবে, তা চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন, প্রযোজ্য বিধি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনার ওপর নির্ভর করবে।
সরকারি কর্মচারীদের জন্য এখন গুরুত্বপূর্ণ কী?
নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে কর্মচারীদের প্রধান উদ্বেগ হলো, পে ফিক্সেশনের সময় যেন গ্রেডভিত্তিক বেতনের স্বাভাবিক ক্রম এবং প্রাপ্য আর্থিক সুবিধা যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়।
এ জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পে ফিক্সেশনের নিয়ম, বেতন ধাপ নির্ধারণ, উচ্চতর গ্রেডের সুবিধা এবং ভাতা হিসাবের বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে, নবম পে স্কেল নিয়ে বেতন নির্ধারণ ও বকেয়া পরিশোধের বিষয়ে সরকারি কর্মচারীদের আগ্রহ থাকলেও চূড়ান্ত বেতন, কার্যকর হওয়ার সময় এবং অর্থ ছাড়ের তারিখ নিশ্চিতভাবে জানতে সরকারি প্রজ্ঞাপন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বিজ্ঞপ্তি অনুসরণ করা প্রয়োজন।
আশা/
