সরকারি বেতন বিল তৈরি সহজ, এক ফরমেই হিসাব ও PDF
নিজস্ব প্রতিবেদক: সরকারি কর্মকর্তাদের মাসিক বেতন বিল প্রস্তুতের কাজ সহজ করতে তৈরি করা হয়েছে টি.আর. ফরম নং ১৩-ভিত্তিক একটি ডিজিটাল ফরম। এতে কর্মকর্তার পরিচিতি, মূল বেতন, বিভিন্ন ভাতা ও কর্তনের তথ্য প্রবেশ করালে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মোট বেতন-ভাতা, মোট কর্তন এবং প্রদেয় অর্থের হিসাব দেখা যায়। পাশাপাশি ফরমের প্রিভিউ দেখা, একাধিক কর্মকর্তার তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং প্রিন্টের উপযোগী PDF তৈরির সুবিধাও রয়েছে।
তবে এটি একটি ফরম প্রস্তুতকারী টুল। সরবরাহ করা HTML ফাইল থেকে এর সরকারি অনুমোদন বা সরকারি বেতন ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি সংযোগের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাই দাপ্তরিক কাজে ব্যবহারের আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা যাচাই করা জরুরি।
বেতন বিল তৈরির ফরমে যেসব তথ্য দিতে হবে
ডিজিটাল ফরমটিতে প্রথমে বেতন বিলের সাধারণ তথ্য পূরণ করতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে বিলের মাস ও বছর, দপ্তরের নাম, প্রাতিষ্ঠানিক বা অপারেশন কোড, টোকেন নম্বর ও তারিখ এবং ভাউচার নম্বর ও তারিখ।
এরপর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ও চাকরিসংক্রান্ত তথ্য দিতে হয়। যেমন:
-
কর্মকর্তার নাম ও পদবি
-
জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) নম্বর
-
সাধারণ ভবিষ্য তহবিলের হিসাব নম্বর
-
ডাক জীবনবিমার নম্বর
-
টিআইএন বা ই-টিআইএন নম্বর
-
বাহক, ব্যাংক বা এজেন্টের নাম
-
প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক তারিখ ও অন্যান্য তথ্য
এসব তথ্য নির্ধারিত ঘরে পূরণ করে বেতন-ভাতা ও কর্তনের হিসাব সাজানো যায়। এতে বেতন বিলের প্রয়োজনীয় তথ্য একটি নির্দিষ্ট কাঠামোয় উপস্থাপন করা সম্ভব।
মূল বেতন ও ভাতার হিসাব থাকবে একই ফরমে
বেতন বিল প্রস্তুতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো মূল বেতন ও প্রযোজ্য ভাতার হিসাব। ডিজিটাল ফরমটিতে মূল বেতনের পাশাপাশি শিক্ষা ভাতা, বাড়িভাড়া ভাতা, চিকিৎসা ভাতা, মোবাইল বা সেলফোন ভাতা, মোটরযান রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, দায়িত্ব ভাতা, আপ্যায়ন ভাতা, গৃহ-সহায়তা ভাতা, পাচক ভাতা, নিরাপত্তা ভাতা ও বিচারিক ভাতার মতো বিভিন্ন খাত রাখা হয়েছে।
প্রতিটি খাতের জন্য অর্থনৈতিক কোড, হার ও টাকার অঙ্ক দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। কোনো খাতে প্রাপ্য অর্থের পরিমাণ নির্ধারিত হারের চেয়ে আলাদা হলে সংশ্লিষ্ট অঙ্ক আলাদাভাবে লেখা যায়।
তবে ফরমে কোনো ভাতার খাত থাকলেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা সেই ভাতা পাওয়ার যোগ্য হবেন, এমন নয়। ভাতার প্রাপ্যতা ও পরিমাণ নির্ধারণ করতে হবে প্রযোজ্য সরকারি বিধি এবং দাপ্তরিক নথি অনুযায়ী।
বেতন থেকে কোন কোন কর্তনের হিসাব রাখা যাবে
বেতন বিল তৈরির সময় মোট বেতন নির্ধারণের পাশাপাশি প্রযোজ্য কর্তনের হিসাবও দেখাতে হয়। এ জন্য ফরমটিতে অগ্রিম আয়কর, স্ট্যাম্প ডিউটি, সরকারি ঋণের সুদ, পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন চার্জ, পৌরকর, গৃহনির্মাণ ঋণ, মোটরগাড়ি ঋণ, সুদমুক্ত ঋণ, মোটরসাইকেল ঋণ, কম্পিউটার ঋণ এবং সাধারণ ভবিষ্য তহবিলের মতো খাত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এ ছাড়া তিতাস, বাখরাবাদ, জালালাবাদ ও কর্ণফুলী গ্যাস বিল, কর্মচারী কল্যাণ তহবিল এবং কর্মচারী যৌথবিমা তহবিলের জন্যও খাত রাখা হয়েছে।
ব্যবহারকারীর প্রয়োজন অনুযায়ী বেতন-ভাতা ও কর্তনের অংশে অতিরিক্ত খাত যোগ করার সুবিধাও রয়েছে। এসব খাতে অর্থনৈতিক কোড, বিবরণ, হার ও টাকার অঙ্ক দেওয়া যায়।
মনে রাখতে হবে, ফরমে কোনো কর্তনের খাত থাকলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য হয়ে যায় না। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার প্রকৃত দায় এবং কার্যকর বিধি অনুযায়ী কর্তনের অঙ্ক নির্ধারণ করতে হবে।
এক ক্লিকেই দেখা যাবে মোট বেতন, কর্তন ও প্রদেয় অর্থ
ফরমটির অন্যতম সুবিধা হলো স্বয়ংক্রিয় হিসাব। প্রয়োজনীয় তথ্য প্রবেশ করানোর পর মোট বেতন ও ভাতা, মোট কর্তন এবং কর্তন বাদে প্রদেয় অর্থ দেখা যায়।
হিসাবের মূল কাঠামো হলো:
প্রদেয় বিল = মোট বেতন ও ভাতা − মোট কর্তন
উদাহরণ হিসেবে, কোনো কর্মকর্তার মোট বেতন ও ভাতা ৬০ হাজার টাকা এবং মোট কর্তন ৬ হাজার টাকা হলে প্রদেয় অর্থ হবে ৫৪ হাজার টাকা। এটি শুধু হিসাব বোঝানোর উদাহরণ, কোনো নির্দিষ্ট কর্মকর্তার প্রকৃত বেতনের তথ্য নয়।
স্বয়ংক্রিয় হিসাবের ফলে বিভিন্ন খাতের অঙ্ক হাতে যোগ করার প্রয়োজন কমতে পারে। তবে ভুল তথ্য প্রবেশ করালে ফলাফলও ভুল হতে পারে। তাই বিল চূড়ান্ত করার আগে প্রতিটি অঙ্ক যাচাই করা প্রয়োজন।
বাংলা সংখ্যা ও কথায় টাকার পরিমাণ দেখানোর সুবিধা
ডিজিটাল ফরমটিতে টাকার অঙ্ক বাংলা সংখ্যায় দেখানোর ব্যবস্থা রয়েছে। একই সঙ্গে প্রদেয় অর্থ কথায় লেখার সুবিধাও রাখা হয়েছে।
এতে বেতন বিলের চূড়ান্ত পরিমাণ সংখ্যায় ও কথায় উপস্থাপন করা যায়। তবে দুইভাবে প্রদর্শিত অঙ্ক একই কি না, তা প্রিন্ট করার আগে মিলিয়ে নেওয়া উচিত।
একাধিক কর্মকর্তার বেতন বিল তৈরির সুবিধা
একই দপ্তরে একাধিক কর্মকর্তার বেতন বিল প্রস্তুত করতে হলে কিছু সাধারণ তথ্য বারবার লিখতে হয়। এ কাজ কমানোর জন্য ফরমটিতে একাধিক কর্মকর্তার তথ্য ব্যবস্থাপনার সুবিধা রাখা হয়েছে।
এতে নতুন কর্মকর্তা যুক্ত করা, আগের কর্মকর্তার তথ্যের অনুলিপি তৈরি করা এবং প্রয়োজন হলে কোনো কর্মকর্তার তথ্য মুছে ফেলার ব্যবস্থা রয়েছে।
আগের তথ্য অনুলিপি করলে দপ্তর বা বেতন-ভাতার খাতের মতো কিছু তথ্য রাখা হতে পারে। অন্যদিকে নতুন কর্মকর্তার নাম, পদবি, এনআইডি, ভবিষ্য তহবিল হিসাব নম্বর, ডাক জীবনবিমা নম্বর, টিআইএন এবং টোকেন-ভাউচারের তথ্য নতুন করে পূরণ করতে হয়।
এ সুবিধায় একই তথ্য বারবার লেখার সময় কমতে পারে। তবে নতুন বিল তৈরির পর পুরোনো কর্মকর্তার ব্যক্তিগত তথ্য থেকে গেছে কি না, তা অবশ্যই পরীক্ষা করতে হবে।
দুই পৃষ্ঠার PDF তৈরি ও প্রিন্ট করা যাবে
ফরম পূরণের পর আলাদা প্রিভিউতে বিলটি কেমন দেখাবে, তা যাচাই করার সুযোগ রয়েছে। এতে দুই পৃষ্ঠার ফরম দেখা যায়।
প্রথম পৃষ্ঠায় বিলের সাধারণ তথ্য, কর্মকর্তার পরিচিতি, বেতন-ভাতা, কর্তনের খাত, মোট হিসাব এবং কথায় প্রদেয় অর্থের মতো বিষয় থাকে। দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় বাহক বা ব্যাংকের নাম, তারিখ, কর্মকর্তার স্বাক্ষর ও সিলের জায়গা এবং হিসাবরক্ষণ অফিসের ব্যবহারের অংশ রাখা হয়েছে।
ফরমের কোড অনুযায়ী, ‘প্রিন্টের জন্য PDF নিন’ বাটন ব্যবহার করে A4 আকারের দুই পৃষ্ঠার PDF তৈরি করা যায়। এরপর ফাইলটি সংরক্ষণ বা প্রিন্ট করা সম্ভব।
তবে PDF তৈরি হওয়া মানেই বিলটি সরকারি দপ্তরে জমা হয়েছে, অনুমোদন পেয়েছে কিংবা অর্থ পরিশোধের জন্য পাঠানো হয়েছে, এমন নয়।
একই ব্রাউজারে তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা
ফরমটির কোডে ব্রাউজারের localStorage ব্যবহার করে তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে একই ব্রাউজারে পরে ফাইলটি খুললে আগে প্রবেশ করানো তথ্য ফিরে পাওয়ার সুযোগ থাকতে পারে।
তবে ব্রাউজারের স্থানীয় তথ্য মুছে গেলে, অন্য কম্পিউটার বা ব্রাউজার ব্যবহার করলে কিংবা সংরক্ষণে সমস্যা হলে আগের তথ্য নাও পাওয়া যেতে পারে। তাই গুরুত্বপূর্ণ বেতন বিলের তথ্যের নিরাপদ ব্যাকআপ রাখা উচিত।
এনআইডি, টিআইএন, ভবিষ্য তহবিল হিসাব নম্বর ও বেতনের মতো ব্যক্তিগত আর্থিক তথ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। অনিরাপদ বা অপরিচিত ওয়েবসাইটে এসব তথ্য প্রবেশ করানোর আগে তথ্য কোথায় সংরক্ষিত হচ্ছে, তা যাচাই করা ভালো।
ব্যবহারের আগে যে বিষয়গুলো যাচাই করবেন
ডিজিটাল ফরমটি ব্যবহার করার আগে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত হওয়া জরুরি:
১. কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ও চাকরিসংক্রান্ত তথ্য সঠিক কি না।
২. মূল বেতন, ভাতা এবং কর্তনের হার প্রযোজ্য বিধির সঙ্গে মিলছে কি না।
৩. অর্থনৈতিক কোড ও দাপ্তরিক তথ্য অনুমোদিত নথির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।
৪. মোট বেতন-ভাতা, মোট কর্তন ও প্রদেয় অর্থের হিসাব ঠিক আছে কি না।
৫. PDF-এ পুরোনো কর্মকর্তার তথ্য বা ভুল অঙ্ক রয়ে গেছে কি না।
৬. সংশ্লিষ্ট দপ্তর এই ফরম ব্যবহারের অনুমতি দেয় কি না এবং বিল জমা দেওয়ার নির্ধারিত পদ্ধতি কী।
সরকারি বেতন ব্যবস্থার বিকল্প কি এই ফরম?
সরবরাহ করা HTML ফাইলের ভিত্তিতে বলা যায়, টুলটি বেতন বিলের তথ্য সাজানো, হিসাব করা, প্রিভিউ দেখা ও PDF তৈরিতে সহায়তা করার জন্য তৈরি। কিন্তু সরকারি বেতন ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি সংযোগ, স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিল দাখিল, ব্যাংকে অর্থ পাঠানো বা সরকারি অনুমোদনের বিষয়টি নিশ্চিত করা যায়নি।
তাই এটিকে আপাতত সহায়ক ফরম প্রস্তুতকারী টুল হিসেবে বিবেচনা করাই যুক্তিযুক্ত। সরকারি দপ্তরের অনুমোদিত ব্যবস্থা বা নির্ধারিত ফরমের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা যাচাই করা প্রয়োজন।
টি.আর. ফরম নং ১৩-ভিত্তিক এই ডিজিটাল বেতন বিল ফরমে বেতন-ভাতা ও কর্তনের হিসাব, একাধিক কর্মকর্তার তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং দুই পৃষ্ঠার PDF তৈরির সুবিধা রয়েছে। সঠিক তথ্য ব্যবহার করা হলে এটি বেতন বিল প্রস্তুতের কাজ গুছিয়ে নিতে সহায়ক হতে পারে।
তবে চূড়ান্ত বিল তৈরির আগে সব হিসাব, অর্থনৈতিক কোড ও দাপ্তরিক তথ্য যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে সরকারি অনুমোদন ও ব্যবহারের নিয়ম নিশ্চিত না করে এটিকে অনুমোদিত সরকারি বেতন ব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।
Click Here: Officer Pay bill Form- টি.আর. ফরম ১৩ কর্মকর্তার বেতন বিল
সোহাগ/
