৮৩ লাখ পরিবারে এলপিজির চাপ, দাম বাড়ানোর প্রস্তাব ৩০০ টাকা
নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশে রান্নার কাজে এলপিজি ব্যবহার করেন প্রায় ৮৩ লাখ পরিবার। অথচ বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে অনেক ভোক্তাকে। আমদানিকারক ও বিক্রেতাদের একাংশের প্রভাব, সিলিন্ডার সরবরাহের ঘাটতি এবং মূল্য নির্ধারণের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্নের মধ্যে আবারও এলপিজির দাম সমন্বয়ের দাবি উঠেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করা হলেও অনেক এলাকায় তা ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এতে রান্নার গ্যাসের খরচ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ পরিবারগুলো।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রাজধানীর বিয়াম মিলনায়তনে এলপিজির মূল্য সমন্বয় নিয়ে গণশুনানি আয়োজন করেছে বিইআরসি। তবে শুনানি আয়োজনের অর্থ দাম বাড়ানো নিশ্চিত নয় বলে জানিয়েছেন কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য ও কাগজপত্র পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
চার কোম্পানির হাতে এলপিজি বাজারের বড় অংশ
বিইআরসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে এলপিজি খাতে ২৯টি কোম্পানি চালু থাকলেও সেপ্টেম্বরে আমদানি করেছে মাত্র ১০টি প্রতিষ্ঠান। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চারটি কোম্পানি—ওমেরা, পেট্রোম্যাক্স, মেঘনা ও যমুনা—মিলে দেশের এলপিজি বাজারের প্রায় ৬৮ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে।
এ ছাড়া বিএম এনার্জি, ইউনাইটেড আইগ্যাস, ডেল্টা, জেএমআই ও প্রিমিয়াম এলপিজিসহ অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোও বাজারে অংশীদারত্ব ধরে রেখেছে। বাজারের বড় অংশ সীমিতসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে থাকায় প্রতিযোগিতা ও সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে বাজারের অংশীদারত্ব বেশি হওয়া নিজে থেকেই অনিয়মের প্রমাণ নয়। সরবরাহ আটকে রাখা, কৃত্রিম সংকট তৈরি করা বা মূল্য কারসাজির অভিযোগ প্রমাণ করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন।
নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি কেন সিলিন্ডার কিনছেন ভোক্তারা?
বিইআরসি প্রতি মাসে এলপিজির সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে। কিন্তু নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার না পাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১২ কেজির সিলিন্ডার অনেক জায়গায় ঘোষিত ১ হাজার ৮৩৭ টাকার বদলে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এলপিজির দাম ও সরবরাহের এই ব্যবধানের পেছনে কী কারণ রয়েছে, তা নিয়ে ব্যবসায়ী, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলোর বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, আমদানি থেকে খুচরা বিক্রি পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে খরচ বেড়েছে এবং বিইআরসির মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি সব সময় প্রকৃত ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অন্যদিকে ভোক্তা অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, বাজারে কার্যকর নজরদারি না থাকায় নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি অর্থ আদায় করা হচ্ছে। ফলে ভোক্তাদের জন্য শুধু দাম নির্ধারণ নয়, সেই দাম বাস্তবে কার্যকর করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৩০০ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এলপিজির দাম সমন্বয়ের জন্য একাধিক প্রতিষ্ঠান বিইআরসির কাছে আবেদন করেছে। এলপিজি অপারেটর্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) পক্ষ থেকেও কমিশনকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
ওমেরা পেট্রোলিয়াম, মেঘনা-ফ্রেশ এলপিজি এবং পেট্রোম্যাক্স এলপিজির পক্ষ থেকে পাঠানো চিঠিতে ব্যয় বৃদ্ধির কথা তুলে ধরে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম প্রায় ২৬৬ থেকে ৩০০ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে সরকারি প্রতিষ্ঠান এলপি গ্যাস লিমিটেডও তাদের সাড়ে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৮২৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ২৩৫ টাকা নির্ধারণের আবেদন জানিয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
তবে এসব আবেদন বা প্রস্তাবের ভিত্তিতে নতুন দাম চূড়ান্ত হয়েছে, এমন তথ্য নেই। বিইআরসি জানিয়েছে, গণশুনানিতে সব পক্ষের বক্তব্য ও নথি পর্যালোচনার পর মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ফলে দাম বাড়বে, কমবে নাকি অপরিবর্তিত থাকবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
সিলিন্ডারের ঘাটতিও কি সংকটের কারণ?
এলপিজি ব্যবসায়ীদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম, জাহাজ ভাড়া ও অন্যান্য ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি সিলিন্ডারের ঘাটতিও সরবরাহে চাপ তৈরি করছে।
প্রতিবেদনে ব্যবসায়ীদের বরাতে বলা হয়েছে, আগস্টে দেশে প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার টন এবং সেপ্টেম্বরে ১ লাখ ৫৬ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। তাঁদের দাবি, আমদানি অব্যাহত থাকলেও সব এলাকায় নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
ব্যবসায়ীদের বক্তব্য অনুযায়ী, দেশে বিভিন্ন কোম্পানির প্রায় ৫ কোটি ৩০ লাখ সিলিন্ডার থাকলেও বর্তমানে সক্রিয় সরবরাহব্যবস্থায় রয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৭ লাখ সিলিন্ডার। অনেক কোম্পানি আমদানি বন্ধ রাখায় সিলিন্ডারের একটি অংশ নিয়মিত সরবরাহের বাইরে রয়েছে বলেও তাঁদের দাবি।
এ ছাড়া ব্যাংক থেকে ঋণপত্র (এলসি) খোলার জটিলতা ও আর্থিক দায়ের কারণে কিছু প্রতিষ্ঠান আমদানি করতে পারছে না বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।
তবে সিলিন্ডারের ঘাটতি কতটা এবং কোন এলাকায় এর প্রভাব বেশি, তা নির্ধারণে সরবরাহ, মজুত ও বিক্রির তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন। আমদানি স্বাভাবিক থাকলেই যে সব এলাকায় খুচরা সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে, এমন নয়; পরিবহন, সিলিন্ডার ফেরত আসা এবং বিতরণব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।
এলপিজি বাজারে সরকারি প্রতিষ্ঠানের অংশ খুবই কম
দেশের এলপিজি বাজারের বড় অংশ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি প্রতিষ্ঠান এলপি গ্যাস লিমিটেডের বাজার অংশীদারত্ব ২ শতাংশেরও কম। সীমিত মজুত সক্ষমতাকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সরকারি প্রতিষ্ঠানের মজুত ও বটলিং সক্ষমতা বাড়াতে নতুন অবকাঠামো তৈরির পরিকল্পনার কথাও প্রতিবেদনে রয়েছে। বাগেরহাটের মোংলায় ৬ দশমিক ৩৭ একর জমিতে ৮ হাজার ২০০ টন এলপিজি মজুতের ট্যাংক নির্মাণের প্রস্তুতি এবং টাঙ্গাইলের কালিহাতী ও রাজাবাড়ীতে মজুত ও বটলিং প্ল্যান্ট স্থাপনের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ধরনের অবকাঠামো বাস্তবায়িত হলে সরকারি প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ সক্ষমতা বাড়তে পারে। তবে প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি, চালুর সময় এবং বাজারে সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হালনাগাদ তথ্য যাচাই করা জরুরি।
কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ, তদন্তের দাবি
এলপিজির সরবরাহ ও দাম নিয়ে অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে। প্রতিবেদনে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার একটি প্রতিবেদনের বরাতে বলা হয়েছে, সরবরাহ আটকে রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরির মাধ্যমে দাম বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করা হতে পারে। সেখানে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম সন্দেহের তালিকায় এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে সন্দেহের তালিকায় নাম থাকা অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার সমান নয়। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে তদন্তের ফলাফল, নথিপত্র এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই যাচাই করা প্রমাণ ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানকে অনিয়মের জন্য দায়ী হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত নয়।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বাজারে কার্যকর নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়ে থাকলে তা তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
ব্যবসায়ীদের বক্তব্য: মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতিতে সমস্যা রয়েছে
লোয়াবের সাধারণ সম্পাদক আহসানুল জব্বার ভোক্তাদের কাছ থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে বাড়তি অর্থ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তাঁর দাবি, বিইআরসির মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি এবং আমদানি থেকে খুচরা বিক্রি পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ের প্রকৃত ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান রয়েছে।
ব্যবসায়ীদের বক্তব্য অনুযায়ী, আমদানিকারক, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতার ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে সময়োপযোগী মূল্য নির্ধারণ করা প্রয়োজন। তবে ঘোষিত মূল্য কার্যকর না হওয়ার অভিযোগের বিষয়ে ব্যবসায়ী ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি যেমন পর্যালোচনা করা দরকার, তেমনি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে কি না, সেটিও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
বিইআরসি কী বলছে?
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, এলপিজির আমদানি কমেনি বলে সরবরাহে সংকট থাকার কথা নয়। যেসব প্রতিষ্ঠান আমদানি করতে সমস্যায় পড়ছে, তাদের ঋণপত্র খোলার জটিলতা কমানোর বিষয়ে জ্বালানি বিভাগকে চিঠি দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গণশুনানি মানেই দাম বাড়ানো নয়। কমিশন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য ও নথিপত্র পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে। সে অনুযায়ী দাম বাড়তে পারে, কমতেও পারে।
সিলিন্ডার সংগ্রহ ও সরবরাহের বিষয়েও শুনানিতে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। পাশাপাশি বিইআরসি, প্রতিযোগিতা কমিশন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং বিএসটিআইসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার নজরদারি বাড়ানোর কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভোক্তাদের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কী?
এলপিজি ব্যবহারকারী পরিবারগুলোর জন্য মূল উদ্বেগ হলো নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার পাওয়া। দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, মূল্যতালিকা কার্যকর করা এবং অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
গণশুনানিতে আমদানিকারক, পরিবেশক, খুচরা বিক্রেতা ও ভোক্তা প্রতিনিধিদের বক্তব্যের ভিত্তিতে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে মূল্য কারসাজি বা কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ থাকলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তা যাচাই করতে হবে।
সব মিলিয়ে, এলপিজি বাজারে দাম ও সরবরাহ নিয়ে তৈরি হওয়া চাপের প্রভাব সরাসরি পড়ছে সাধারণ পরিবারের ব্যয়ে। বিইআরসির গণশুনানি থেকে কী সিদ্ধান্ত আসে, তার পাশাপাশি ঘোষিত দাম কার্যকর করা এবং সিলিন্ডারের নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করা যায় কি না, সেটিই এখন ভোক্তাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সোহাগ/
