নামজারি আবেদন করার পর এই ৭টি কাজ ভুলবেন না
নিজস্ব প্রতিবেদক: জমি কেনার পর কিংবা ওয়ারিশ সূত্রে জমির মালিকানা পাওয়ার পর অনেকেই অনলাইনে নামজারির আবেদন করেন। কিন্তু আবেদন জমা দেওয়ার পর কী করতে হবে, আবেদনের অবস্থা কীভাবে জানা যাবে, শুনানিতে যেতে হবে কি না কিংবা নামজারি অনুমোদিত হলে খতিয়ান কীভাবে সংগ্রহ করবেন—এসব বিষয়ে অনেকেরই প্রশ্ন থাকে।
নামজারির আবেদন জমা দেওয়াই শেষ ধাপ নয়। আবেদন জমা দেওয়ার পর থেকে নিষ্পত্তি হওয়া পর্যন্ত নিয়মিত অগ্রগতি যাচাই করা এবং ভূমি অফিসের দেওয়া নির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরি। এতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বা তথ্যের ঘাটতি থাকলে সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হয়।
১. প্রথমেই আবেদন নম্বর ও রসিদ সংরক্ষণ করুন
অনলাইনে নামজারির আবেদন জমা দেওয়ার পর পাওয়া আবেদন নম্বর, আবেদনপত্রের কপি এবং ফি পরিশোধের রসিদ সংরক্ষণ করুন। পরবর্তী সময়ে আবেদনের অবস্থা যাচাই, ভূমি অফিসে যোগাযোগ কিংবা কোনো তথ্য সংশোধনের প্রয়োজন হলে এগুলো কাজে লাগবে।
আবেদন জমা দেওয়ার সময় জমির দলিল, খতিয়ান, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ এবং আবেদনকারীর পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য সঠিকভাবে দেওয়া হয়েছে কি না, সেটিও মিলিয়ে নিন।
২. অনলাইনে আবেদনের সর্বশেষ অবস্থা দেখুন
নামজারির আবেদন কোন পর্যায়ে রয়েছে, তা জানতে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সরকারি ই-নামজারি পোর্টাল ব্যবহার করুন।
সরকারি ওয়েবসাইট: https://mutation.land.gov.bd/
আবেদনের অবস্থা যাচাই: https://mutation.land.gov.bd/search-application
পোর্টালে গিয়ে আবেদনের সর্বশেষ অবস্থা দেখার নির্ধারিত অপশন ব্যবহার করুন। আবেদন নম্বরসহ যে তথ্য চাওয়া হবে, তা দিয়ে অনুসন্ধান করুন। পোর্টালে প্রদর্শিত বর্তমান অবস্থা ও নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নিন।
আবেদন প্রক্রিয়াধীন থাকলে বারবার ভূমি অফিসে যাওয়ার পরিবর্তে প্রথমে অনলাইনে অগ্রগতি যাচাই করুন। তবে কোনো নির্দেশনা, শুনানির তারিখ বা কাগজপত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা দেওয়া থাকলে সেটি উপেক্ষা করবেন না।
৩. অতিরিক্ত কাগজপত্র চাওয়া হলে কী করবেন?
আবেদন যাচাইয়ের সময় কোনো তথ্য বা দলিলের ঘাটতি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত কাগজপত্র বা ব্যাখ্যা চাইতে পারে। এ ক্ষেত্রে কোন নথি প্রয়োজন এবং কত দিনের মধ্যে জমা দিতে হবে, তা আদেশ বা নোটিশ থেকে ভালোভাবে বুঝে নিন।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ২০২২ সালের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কাগজপত্রের ঘাটতি থাকলে তা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করে আবেদনকারীকে প্রয়োজনীয় নথি দাখিলের সুযোগ দিতে হবে। নির্দেশনায় সাধারণত সাত কার্যদিবস বা পরিস্থিতি অনুযায়ী যুক্তিসংগত সময় দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তাই অতিরিক্ত কাগজপত্র চাওয়া হলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেগুলো জমা দিন এবং জমা দেওয়ার প্রমাণ সংরক্ষণ করুন। কীভাবে নথি জমা দিতে হবে, সে বিষয়ে পোর্টাল বা সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের নির্দেশনা অনুসরণ করুন।
৪. শুনানির নোটিশ পেলে নির্ধারিত তারিখ অনুসরণ করুন
সব নামজারি আবেদনে যে শুনানি হবেই, এমন নয়। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হলে শুনানি ছাড়াও আবেদন নিষ্পত্তি হতে পারে। তবে কোনো বিষয়ে ব্যাখ্যা বা অতিরিক্ত যাচাই প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ শুনানির নির্দেশ দিতে পারে।
শুনানির নোটিশ পেলে তারিখ, সময়, স্থান অথবা অনলাইন শুনানির লিংক ভালোভাবে যাচাই করুন। জমির মূল দলিল, প্রাসঙ্গিক খতিয়ান, ওয়ারিশ সনদসহ সংশ্লিষ্ট নথি প্রস্তুত রাখুন। কোন কোন কাগজপত্র আনতে হবে, তা নোটিশে উল্লেখিত নির্দেশনা অনুযায়ী নিশ্চিত করুন।
শুনানির তারিখে উপস্থিত হওয়া সম্ভব না হলে নিজের সিদ্ধান্তে তারিখ উপেক্ষা করবেন না। পোর্টালে সম্পূরক আবেদন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী তারিখ পরিবর্তনের সুযোগ আছে কি না, তা জেনে নিন।
৫. নামজারি অনুমোদিত হলেই কি কাজ শেষ?
না। আবেদন অনুমোদিত হয়েছে কি না, আর নামজারি খতিয়ান চূড়ান্ত হয়েছে কি না—দুটি বিষয় আলাদা করে যাচাই করা জরুরি।
আবেদন মঞ্জুর হলে পোর্টালে পরবর্তী করণীয় দেখুন। প্রয়োজনীয় সরকারি ফি বা ডিসিআর (DCR) ফি বাকি থাকলে সরকারি ব্যবস্থায় তা পরিশোধ করতে হবে। খতিয়ান চূড়ান্ত হওয়ার পর পোর্টালের নির্দেশনা অনুযায়ী অনুমোদিত নামজারি খতিয়ানের কপি ডাউনলোড করা যায়।
ফি পরিশোধের আগে পোর্টালে প্রদর্শিত অর্থের পরিমাণ ও নির্দেশনা যাচাই করুন। কোনো ব্যক্তি অতিরিক্ত বা অননুমোদিত টাকা চাইলে তা না দিয়ে সরকারি ফি-সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করুন।
৬. নতুন নামজারি খতিয়ানে কোন তথ্যগুলো মিলিয়ে দেখবেন?
খতিয়ান সংগ্রহ করার পর শুধু নিজের নাম আছে কি না দেখলেই হবে না। নিচের তথ্যগুলোও যাচাই করুন:
-
মালিক বা মালিকদের নামের বানান
-
মৌজার নাম ও জে.এল. নম্বর, যেখানে প্রযোজ্য
-
খতিয়ান ও দাগ নম্বর
-
জমির পরিমাণ ও হিস্যা
-
সংশ্লিষ্ট দলিল বা মালিকানার তথ্যের সঙ্গে রেকর্ডের সামঞ্জস্য
কোনো করণিক ভুল বা তথ্যের অসংগতি চোখে পড়লে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসে যোগাযোগ করুন। প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধন বা পরবর্তী প্রতিকারের সরকারি পদ্ধতি অনুসরণ করুন।
মনে রাখবেন, নামজারি হলো ভূমি রেকর্ড হালনাগাদের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। শুধু নামজারি খতিয়ান থাকলেই জমির মালিকানা নিয়ে সব ধরনের বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়ে যায়—এমন নয়। জমির মালিকানাসংক্রান্ত বিরোধ থাকলে সংশ্লিষ্ট দলিল ও অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে আইনগত পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন হতে পারে।
৭. অনেক দিনেও আবেদন নিষ্পত্তি না হলে কী করবেন?
আবেদন দীর্ঘদিন একই অবস্থায় থাকলে প্রথমে সরকারি পোর্টালে সর্বশেষ অবস্থা ও কোনো নির্দেশনা রয়েছে কি না দেখুন। কাগজপত্রের ঘাটতি বা শুনানির কারণে প্রক্রিয়া আটকে আছে কি না, সেটিও যাচাই করুন।
প্রয়োজন হলে আবেদন নম্বর, আবেদনপত্রের কপি এবং সংশ্লিষ্ট নথি নিয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে যোগাযোগ করুন। ভূমিসেবা-সংক্রান্ত সহায়তার জন্য সরকারি ভূমিসেবা হেল্পলাইন ১৬১২২-এও যোগাযোগ করতে পারেন।
আবেদন নামঞ্জুর হলে সিদ্ধান্তের কারণ ভালোভাবে পড়ুন। প্রয়োজনীয় তথ্য বা দলিলের ঘাটতি থাকলে তা পূরণ করে পুনর্বিবেচনা বা পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ আছে কি না, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জেনে নিন।
নামজারির আবেদন করার পর যে ভুলগুলো এড়িয়ে চলবেন
নামজারির আবেদন জমা দেওয়ার পর কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। আবেদন নম্বর ও রসিদ হারিয়ে ফেলবেন না, সরকারি নির্দেশনা না পড়ে কোনো ধাপ এড়িয়ে যাবেন না এবং অপরিচিত ব্যক্তি বা ওয়েবসাইটে ব্যক্তিগত তথ্য দেবেন না।
এ ছাড়া সরকারি ফি ছাড়া অতিরিক্ত অর্থ দেবেন না এবং আবেদন অনুমোদনের খবর পেলেই খতিয়ান চূড়ান্ত হয়েছে ধরে নেবেন না। প্রয়োজনীয় ফি, চূড়ান্ত খতিয়ান এবং রেকর্ডের তথ্য যাচাই করে তবেই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়েছে বলে নিশ্চিত হোন।
সব মিলিয়ে, অনলাইনে নামজারি আবেদন জমা দেওয়ার পর আবেদন নম্বর সংরক্ষণ, নিয়মিত স্ট্যাটাস যাচাই, প্রয়োজনীয় নথি দাখিল, শুনানির নির্দেশনা অনুসরণ এবং অনুমোদনের পর খতিয়ান সংগ্রহ—এই ধাপগুলোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি ই-নামজারি পোর্টালে প্রদর্শিত নির্দেশনা অনুসরণ করলে আবেদনটির অগ্রগতি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।
সোহাগ/
