রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুতের দাম কত হতে পারে, ইউনিটপ্রতি ১০ টাকার আলোচনা
নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। তবে এই কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ কিনতে কত টাকা খরচ হবে, তা নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের হিসাবে, প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৮ টাকা ৭৫ পয়সা থেকে ১০ টাকা বা তারও বেশি হতে পারে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এবং প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা চলছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মূল্য চূড়ান্ত হলে বিদ্যুৎ ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি বা পাওয়ার পারচেজ অ্যাগ্রিমেন্ট (পিপিএ) সইয়ের প্রক্রিয়া এগোতে পারে।
রূপপুরের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম কত?
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পিডিবির বিশেষজ্ঞ কমিটির হিসাবে রূপপুরের বিদ্যুতের প্রতি ইউনিটের দাম প্রায় ৭ মার্কিন সেন্ট, অর্থাৎ ৮ টাকা ৭৫ পয়সা হতে পারে। তবে এই হিসাবের সঙ্গে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হিসাবের পার্থক্য রয়েছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কয়েকজনের মতে, বীমা ও অন্যান্য ব্যয় যুক্ত হলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১০ টাকার কম নাও হতে পারে। ফলে বিদ্যুতের চূড়ান্ত মূল্য নির্ধারণে প্রকল্পের মোট ব্যয়, ঋণের সুদ, পরিচালন খরচ এবং অন্যান্য আর্থিক বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এখানে উল্লেখ্য, ৮ টাকা ৭৫ পয়সা বা ১০ টাকা—কোনোটিকেই এখনই চূড়ান্ত বিক্রয়মূল্য হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চুক্তি ও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত এগুলো সম্ভাব্য হিসাব হিসেবেই বিবেচ্য।
কেন বিদ্যুতের দামে পার্থক্য হচ্ছে?
রূপপুর প্রকল্পের বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণে প্রকল্পের আয়ুষ্কাল এবং কোন কোন ব্যয় হিসাবের মধ্যে রাখা হবে, তা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম কেন্দ্রটির আয়ুষ্কাল ৮০ বছর ধরে হিসাব করার সুপারিশ করেছে। অন্যদিকে, পিডিবি ৬০ বছরের উৎপাদনকাল ধরে মূল্যায়ন করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানানো হয়েছে।
কেন্দ্রের আয়ুষ্কাল যত বেশি ধরে ব্যয় হিসাব করা হবে, দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগের খরচ ভাগ করার পদ্ধতিতেও তার প্রভাব পড়তে পারে। তবে প্রকৃত বিদ্যুৎমূল্য নির্ভর করবে চূড়ান্ত আর্থিক হিসাব, পরিচালন ব্যয়, ঋণ পরিশোধের শর্ত এবং চুক্তির অন্যান্য বিধানের ওপর।
রূপপুর প্রকল্পে বিনিয়োগ কত?
প্রতিবেদনে পিডিবির হিসাবের বরাতে প্রকল্পে ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ঋণের ওপর ৪ শতাংশ সুদসহ ২০ বছরে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার পরিশোধের হিসাবও তুলে ধরা হয়েছে।
এই বিপুল বিনিয়োগের অর্থ পরিশোধ এবং কেন্দ্র পরিচালনার ব্যয় বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এ ছাড়া প্রতিবছরের পরিচালন ব্যয়ও সামগ্রিক হিসাবের অংশ।
প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, ঋণ পরিশোধ শেষ হলে ভবিষ্যতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের খরচ কমে প্রায় ৩ মার্কিন সেন্টে নামতে পারে। তবে এটি একটি সম্ভাব্য হিসাব; বাস্তবে এমন মূল্য পাওয়া যাবে কি না, তা নির্ভর করবে ভবিষ্যতের ব্যয়, বিনিময় হার, পরিচালন দক্ষতা এবং অন্যান্য আর্থিক পরিস্থিতির ওপর।
রূপপুর থেকে কত বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে?
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদনক্ষমতা ১,২০০ মেগাওয়াট। প্রতিবেদনে উৎপাদন দক্ষতা ৯০ শতাংশ ধরে হিসাব করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ থাকায় এটি দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে প্রকৃত উৎপাদন নির্ভর করবে কেন্দ্রের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম, নিরাপত্তা অনুমোদন, পরিচালন পরিস্থিতি এবং বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরুর সময়ের ওপর।
ভারতের তুলনায় রূপপুরের বিদ্যুতের দাম বেশি হবে?
প্রতিবেদনে ভারতের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন খরচের সঙ্গে রূপপুরের সম্ভাব্য দামের তুলনা করা হয়েছে। সেখানে ভারতের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের খরচ ২ দশমিক ৫০ থেকে ৪ দশমিক ৫০ রুপি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিপরীতে, রূপপুরের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য খরচ ৮ থেকে ১০ টাকা বা তার বেশি হতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে।
তবে দুই দেশের বিদ্যুতের দাম সরাসরি তুলনা করার আগে হিসাবের পদ্ধতি, প্রকল্পের অর্থায়ন, নির্মাণ ব্যয়, পরিচালন খরচ, কর, বীমা এবং মুদ্রার বিনিময় হার বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। এসব বিষয় এক না হলে শুধু প্রতি ইউনিটের অঙ্ক দেখে প্রকৃত ব্যয়ের তুলনা করা কঠিন।
ডলারের বিনিময় হার বাড়লে বিদেশি মুদ্রায় পরিশোধযোগ্য ব্যয়ের বাংলাদেশি টাকায় মূল্যও বাড়তে পারে। তাই রূপপুরের বিদ্যুতের চূড়ান্ত মূল্য নির্ধারণে বিনিময় হারের প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ।
রূপপুরে পৌঁছেছে পারমাণবিক জ্বালানির আরেকটি চালান
প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়েছে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য পারমাণবিক জ্বালানির আরেকটি চালান প্রকল্প এলাকায় পৌঁছেছে। চালানটি রাশিয়া থেকে বিমানে বাংলাদেশে আনা হয় এবং পরে বিশেষ নিরাপত্তায় প্রকল্প এলাকায় নেওয়া হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চালানটিতে ১২টি টিপিএসে মোট ৪১ টন পারমাণবিক জ্বালানি ছিল। বিমানবন্দরে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের কর্মকর্তারা জ্বালানি বুঝে নেন।
তবে জ্বালানি পৌঁছানো মানেই বিদ্যুৎকেন্দ্রের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়ে গেছে—এমন নয়। উৎপাদন শুরুর জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা, নিরাপত্তা যাচাই ও নিয়ন্ত্রক অনুমোদন সম্পন্ন হওয়া জরুরি।
কবে জানা যাবে রূপপুরের বিদ্যুতের চূড়ান্ত দাম?
রূপপুরের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিক্রির চূড়ান্ত মূল্য নির্ধারণে পিডিবি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎ ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি চূড়ান্ত হলে প্রতি ইউনিটের মূল্য, ব্যয় হিসাবের ভিত্তি এবং অর্থ পরিশোধের শর্ত সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
সব মিলিয়ে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৮ টাকা ৭৫ পয়সা থেকে ১০ টাকা বা তার বেশি হতে পারে বলে বিভিন্ন হিসাব সামনে এসেছে। তবে চূড়ান্ত মূল্য এখনো নিশ্চিত নয়। প্রকল্পের প্রকৃত ব্যয়, ঋণ পরিশোধ, পরিচালন খরচ এবং চুক্তির শর্ত বিবেচনায় নিয়েই শেষ পর্যন্ত বিদ্যুতের দাম নির্ধারিত হবে।
সোহাগ/
